• শিরোনাম

    করোনা দিনের গল্প :

    একটি মৃত্যু : আ. ন. ম. শাহরিয়ার জাওয়াদ

    | ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০


    একটি মৃত্যু : আ. ন. ম. শাহরিয়ার জাওয়াদ

    মানুষটা মারা গিয়েছে গতকাল সন্ধ্যায়। বেঁচে থাকলে এই গল্পে মানুষটার হয়তো কোন নামের প্রয়োজন হতো।

    কিন্তু মৃত মানুষের কোন নামের প্রয়োজন হয় না। পৃথিবীতে তার সব প্রয়োজন ফুরিয়ে যায় বলেই একটা মানুষ মরে যায়। তবে, মৃত মানুষটার প্রাণহীন নিথর দেহের একটা নাম দেওয়া যেতে পারে- লাশ।

    দুপুর গড়াতে চললো। লাশটা এখনো নোংরা তেল চিটচিটে বিছানায় পড়ে আছে। নিতান্ত অবহেলায়। ঘরের কোন মানুষ লাশের কাছে ঘেষছে না। মাঝে মাঝে ভয় ভয় চোখে তাকাচ্ছে দূর থেকে। ঘরের সবচেয়ে ছোট সদস্যটা কয়েক বার, “দাদাভাই, দাদাভাই!” বলতে বলতে ছুটে যেতে চেয়েছে লাশটার কাছে। সে তার দাদাভাইয়ের নিথর দেহের কাছে যেতে পারে নি।


    মা ছুটে এসে আটকিয়েছে, “বাবা, দাদাভাইয়ের কাছে যেতে হয় না”
    “না মা, আমি দাদাভাইয়ের কাছে যাবো। দাদাভাই সারাদিন ঘুমাচ্ছে কেন?”
    “অমন করে না, সোনা।”
    “প্লিজ, একটু যাই না? আমি কাছে গিয়ে ডাকলেই দাদাভাই উঠে যাবে। আমি ডাকলে দাদাভাই এভাবে ঘুমিয়ে থাকতে পারবে? বলো মা?”
    মা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্য বুঝতে পারে, কিছু একটা গোলমাল হয়েছে। কিছু একটা আর আগের মতো নেই। খুব দুঃখের কিছু একটা হয়েছে।

    দরজার চৌকাঠে মৃত মানুষটার তিনজন ছেলে মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্য হলো বড় ছেলের সন্তান। মেজো ছেলেটা গত বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতকোত্তর শেষ করেছে।


    এখনো সেভাবে কোন চাকরি হয় নি। আর, ছোট ছেলেটা পড়ছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজিতে। অনার্স সেকেন্ড ইয়ার। কিছুক্ষণ পরপর সে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। দরজার পাল্লায় বার কয়েক থাবা দিয়ে আবার ধপ করে বসে পড়ছে। বাবার লাশের জন্য কোন খাটিয়া জোগাড় হয় নি।

    এলাকার দো’তলা মসজিদটার সিঁড়ির নিচে যে স্টিলের খাটিয়াটা থাকে, সেটা নাকি আজ সকাল থেকে কোন অজ্ঞাত কারণে পাওয়া যাচ্ছে না। মসজিদ কর্তৃপক্ষ বলছে, খাটিয়া গতপরশু চুরি হয়ে গিয়েছে।


    পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ, গতকাল আসরের নামাজের সময়ও নাকি পাশের বাড়ির সুরুজ মিয়া খাটিয়াটা দেখেছে। সিঁড়ির নিচে বহাল তবিয়তেই ছিলো। ছেলেরা বাবার লাশ বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটা খাটিয়া যোগাড় করতে পারে নি। কেউ জানাজা পড়াতে রাজি হয় নি। মসজিদের ইমাম দরজাই খুললেন না। ভেতর থেকে বললেন, তিনি অসুস্থ। ছেলেদের শুনিয়ে শুনিয়ে দু’বার কাশলেনও।

    কারা যেন পাথর ছুঁড়ে বসার রুমের জানালার কাঁচ ভেঙ্গে দিয়েছে। সারাঘরে সেই ভাঙ্গা কাচের টুকরো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
    ভেতরের রুম থেকে মৃত মানুষটার বৃদ্ধা স্ত্রীর ঘনঘন কাশির শব্দ ভেসে আসছে। জ্বরও এসেছে বোধ হয়। পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্য তার দাদীর কাছেও যেতে পারছে না। তার ও’ঘরে যাওয়াও বারণ। কঠিনভাবে বারণ।

    তার মা এখনো কাঁদছে। সে চোখ বড় বড় করে মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে। এভাবে তার মাকে কাঁদতে সে কখনোই দেখে নি।

    বিকেল সাড়ে চারটার দিকে থানার ওসি এলেন। সাথে দুইজন কনস্টেবল। প্রত্যেকের মুখে দু’টো করে সার্জিক্যাল মাস্ক। হাতে নীলরঙা গ্লাভস। তাদের সাথে আরো এলেন পাঁচজন লোক। তাদের সারা শরীর রেইনকোটের মতো দেখতে সাদা রঙের কাপড়ে ঢাকা। বাসার সবচেয়ে ছোট মানুষটাও এখন এই কাপড়গুলো চেনে। এগুলো পিপিই।

    ওসি সাহেব তার বাবার সাথে কথা বলছেন আর কনস্টেবল দু’জন বাসার মূল ফটকের সামনে ভারী দোনলা বন্দুক কাঁধে পাহারায় দাঁড়িয়েছেন। পিপিই পরা পাঁচজন লোক চুলায় এক হাড়ি পানি গরম করলেন। প্রায় একদিন নিতান্ত অবহেলায় পড়ে থাকা লাশটাকে যত্ন করে গোসল করালেন।

    কাফনের কাপড় দিয়ে ঢেকে প্লাস্টিকের ব্যাগে লাশটাকে মুড়িয়ে বাসার দরজার কাছে যখন নিয়ে আসা হলো, তখন মৃতব্যক্তির বৃদ্ধা স্ত্রী ভেতরের রুম থেকে শব্দ করে কাঁদতে আরম্ভ করলেন। তাঁর শ্বাস বোধহয় আটকে আসছে।

    মৃত্যু পর্যন্ত যে মানুষটার পাশে থাকার অঙ্গীকার তিনি করেছিলেন, তার কতটুকু তিনি পূর্ণ করতে পেরেছেন? মানুষটা আজ একেবারে ঘর ছেড়ে চলে যাচ্ছে অথচ তিনি তাকে শেষ দেখাটাও দেখতে পারছেন না।

    মানুষটার বুকের ওপর মাথা রেখে ব্যাকুল হয়ে কাঁদতে পারছেন না। প্রাণহীন মানুষটার কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলতে পারছেন না, “শুনে যাও, আমি তোমাকে ভালোবাসি!”
    বড় ছেলের স্ত্রী কখন থেকে যেন সুর করে সূরা ইয়াসিন পড়া শুরু করেছে।

    বাসার সামনে একটা ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে৷ ভ্যানের চালক আজগর আলী। ওসি সাহেব, দু’জন কনস্টেবল আর পাঁচজন পিপিই পরা কর্মীর সাথে সেও এসেছে। এরকম আরো চব্বিশটা লাশ সে তার ভ্যানে করে গোরস্থানে নিয়ে গিয়েছে।

    তাদের সবার জানাজা পড়েছে৷ সব মানুষ ভয় পায়। রোগে আক্রান্ত হওয়ার ভয়। মৃত্যুর ভয়। কিন্তু, আজগর আলীর ভয় পেলে চলবে কীভাবে? তাহলে, কে এই অসহায় মানুষগুলোর লাশ গোরস্থানে নিয়ে যাবে?

    আজগর আলীর পরনে পুরোনো রিফু করা একটা লুঙ্গি। ছেঁড়া শার্টের ওপর একটা পুরোনো রেইনকোট। মুখে পুরাতন একটা কাপড়ের মাস্ক। পিপিই তাকে কে দেবে?

    আজগর আলীর ভ্যান এগিয়ে যাচ্ছে। ভাঙ্গা রাস্তার ঝাঁকুনিতে ভ্যানের ওপর তেরছাভাবে শোয়ানো কাফনে ঢাকা, প্লাস্টিকের ব্যাগে মোড়ানো লাশটা একটু পরপর দুলে উঠছে। রাস্তার পাশের দোকানদাররা গলা বাড়িয়ে চোখ বড় বড় করে আজগর আলীকে দেখছে। তার ভ্যানে বয়ে নিয়ে যেতে থাকা কাফনে মোড়া লাশটাকে দেখছে। পথচারীরা দ্রুত রাস্তা থেকে সরে পড়ছে।

    ভ্যানের পেছনে পেছনে একটা ছোট মিছিল গোরস্থানের দিকে যাচ্ছে। সেই মিছিলে এগারোজন মানুষ। থানার ওসি সাহেব, দুইজন কনস্টেবল, পাঁচজন পিপিই পরা মানুষ আর মৃত মানুষটার তিন ছেলে। লাশ দাফনের আগে গোরস্থানের সামনে খোলা জায়গাটাতে জানাজা হবে। জানাজা পড়াবেন ওসি সাহেব।

    নীল রঙের ফুল হাতা শার্ট পরা একটা ছেলে তার সাথে থাকা আরেক ছেলের সাথে কথা বলতে বলতে একদম রাস্তার ওপর উঠে দাঁড়িয়েছে। আজগর আলী ভ্যানের বেল চাপলেন। ছেলেটা হঠাৎই খেয়াল করলো। লাফিয়ে সরে গিয়ে আজগর আলীকে জায়গা করে দিলো।

    আজগর আলীর ভ্যান ঝাঁকি খেতে খেতে গোরস্থানে ঢুকছে। সে কী মনে করে পেছনে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো। নীল রঙা ফুল হাতা শার্ট পরা ছেলেটা বিভ্রান্তের মতো আজগর আলীর দিকে তাকিয়ে আছে। ছেলেটা কি কিছু বলতে চাইছে তাকে?

     

    আ. ন. ম. শাহরিয়ার জাওয়াদ
    তৃতীয় বর্ষ, প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান,
    চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২
    ১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
    ২০২১২২২৩২৪২৫২৬
    ২৭২৮২৯৩০৩১