• শিরোনাম

    এক কামরার সংসার : মনস্বিতা বুলবুলি

    | ১২ জুলাই ২০২০


    এক কামরার সংসার :  মনস্বিতা বুলবুলি

    রাত পৌনে ৩ টা। এখনও ঘুমতে পারল না রানু। কিছুক্ষন হল বাচ্চাটা ঘুমিয়েছে, ঘুমুচ্ছে তার স্বামী। সবার ঘুম পারাতে পারাতে রানুর ঘুমটা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। শরীরে ও মনে এক অস্বস্তি, যন্ত্রণা, অসহায়ত্ব। যেন মুক্তি নেই। মেয়েটা তার ৬ বছর হল। এই ৬ বছরে ৬ রাতও কি রানু ঠিকমত ঘুমিয়েছে? জন্মের পর থেকে মেয়েটা বেশিরভাগ অসুস্থই থাকলো।

    তবু জীবনের প্রয়োজনে রানুকে কাজে বেরতে হয়েছিল। অফিস কখনো বোঝেনি তার সন্তান অসুস্থ। পরিবার বোঝেনি কখনো রানুর শরীর-মন কি করে ক্ষয়ে যাচ্ছে। মা, বাবা, ভাইবোন, স্বামী, সন্তান কেউ নয়। মাসের এ মাথা ও মাথা ডাক্তার হাসপাতাল, প্রতিটি রাত শেষ করে ঘুমতে যাওয়া। ৫ বছর অবধি সারা রাত বাচ্চাকে আগলে রাখা, তার ঘুম নিশ্চিত করা, গা ঘামছে কিনা, ঠাণ্ডা লাগছে কিনা, এইসব খেয়াল করতে করতে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে রাত পার করে সকাল হতেই সংসারের হাঁকডাক, অফিস যাওয়ার প্রস্তুতি। বাচ্চা দেখার লোক যোগাড় করা, প্রতিনিয়ত সে লোক চলে যাওয়ার ভয়, বাচ্চার অসুখের উদ্বেগ, অফিসে লেট হয়ার ভয়, অফিস থেকে বাসায় ফিরতে দেরি হয়ার ভয়, চাকুরী টা না আবার চলে যায় সেই ভয়, এই সব নিয়েই চলছিল রানুর জীবন।


    এত চেস্টা করেও চাকুরী সে ধরে রাখতে পারে নি সব সময়। কখনো বসের কামনার দৃষ্টি আর তা পুরণ না হওয়ার জিঘাংসা, কখনো অযোগ্য তৈলবাজ সিনিয়রদের মনোরঞ্জন করতে না পারা বা তাদের অবাধ্য হওয়া, কখনো বা গণছাঁটাই এ পরে যাওয়া, এভাবে বেশ কবার চাকুরী খোয়াতে হয় রানুর। শরীর, মন আর নিতে পারছিল না। ভেতরে ভেতরে ঘুণপোকা বাসা বাঁধছিল।। আজ কয়মাস, রানুকে একজন পঙ্গু মানুষের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। সারা গায়ে ব্যাথা, ঠাণ্ডা লেগে থাকছে, আলসারও হল। তাতেই শেষ হল না।

    তার জরায়ূ তে বাসা বেঁধেছে এক অসহ্য যন্ত্রনাদায়ক রোগ।যখন তখন ব্যথা। তবুও সে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিল। ৭ মাস আগে এই অবস্থায়ই লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আবারো নতুন এক কাজে যোগ দিয়েছিল। কিন্তু তার বাসা হতে কর্মস্থল যেন যোজন যোজন দূরে। দুপুর ২ টায় বাসা থেকে বের হয়ে ফিরত সেই রাত দেড় টায়। নতুন কাজ, অনেক চাপ, কর্মস্থলে বিরুপ পরিবেশ; দুমাস পর সে আর পারল না। তীব্র ব্যাথা তাকে ধরাশায়ী করে ফেলল। শুরু হল ডাক্তারের কাছে যাওয়া। কেবল পরীক্ষা নিরীক্ষা, ওষুধ খাওয়া আর ব্যাথার সাথে লড়াই। এরই মাঝে শুরু হল মেয়ের স্কুল। নতুন বছর। গত বছর শেষের দুমাস রানুর অসুস্থতার জন্য মেয়ের স্কুলে যাওয়া হয় নি।


    এবার বাসার কাছের স্কুলে দেওয়া হল। রানু প্রতিজ্ঞা করেছে যত কিছুই হোক মেয়ের স্কুল সে আর কামাই করতে দেবে না। প্রথম প্রথম এই শরীরেও সে মেয়েকে নিয়ে স্কুলে যেত, অবশ্য তার স্বামী সাহায্য করেছে ব্যাগ বহন করে, মেয়েক কোলে নিয়ে। কদিন যেতেই তাও আর সম্ভব হল না রানুর। শুরু হল রক্ত যাওয়া। আবারো ডাক্তার বদল। তিনটে ডাক্তার দেখানো হল, সবাই বলল অপারেশন করে সব ফেলে দিতে। এ রোগ রানুর ওষুধে সারবে না।

    রাত হলে বাড়ির সামনে কুকুরগুলো দলবেঁধে সুর করে কাঁদে। পাশের বাসার গোয়ালে গরুগুলোও ইদানীং কাঁদছে সন্ধ্যা নামলে। রানুর খুব ভয় করতে থাকে। দুঃস্বপ্নে ভোর হয়। মনে হয় এবার বুঝি সে আর হাসপাতাল থেকে ফিরবে না। তার এত ছোট্ট মেয়েটার কি হবে। সে মনে প্রানে চাইতে থাকে যেন ওষুধে সেরে যায়। নতুন একটি ওষুধে কদিন বেশ ভাল বোধ করছিল সে। ফুরফুরে হয়ে উঠেছিল মন, জীবন ফিরে পেল ভেবে। বাঁচার আশা কত নিষ্ঠুর, ছলনাময়।


    একটু সুখের পরশে সে নেচে উঠেছিল। সইল না। আবারো ব্যাথা, রক্ত। সামনে মেয়ের পরীক্ষা। ওষুধের ডোজ বাড়িয়েও লাভ হল না। অপারেশান টা করতেই হবে। এমনিতেই অপারেশান পেছাতে পেছাতে অনেক দেরি হয়ে গেছে। আর কদিন গেলে নতুন করে আবার অনেক টেস্ট করতে হবে, আবারো অতগুলো টাকা। কিন্তু রানুর প্রচণ্ড কাশি যে সারছে না। আর কাশি না সারলে অপারেশান করা যাচ্ছে না। ডাক্তার রানুকে দুবেলা ঘুমের ওষুধ দিয়েছে। কদিন খেয়ে তা আর খাচ্ছে না রানু।

    মনস্বিতা বুলবুলি

    ঘুমের ওষুধ খেলে অবশ হয়ে আসে সব, বড্ড ঘুম পায়। কিন্তু সে কি করে আরাম করে ঘুমাবে? তার যে এক কামরার সংসার। স্বামী ফেরে রাত ১২ টার পর। মেয়ে বাবা বলতে অজ্ঞান। বাবার সাথে না খেলে সে ঘুমাবে না কিছুতেই। বাবা ফিরবে, ঠাণ্ডা হবে, গোসল করবে, খাবে, তারপর তারা এক সাথে খেলবে, তবেই না ঘুমাবে। একটি বিছানা, একটি টেবিল, একটি টিভি, একটি কম্পিউটার, সবই একটি কামরায়। কি করে ঘুমাবে রানু। বিজলি বাতির আলো, এত শব্দ, হট্টগোল। তারা যখন ক্লান্ত হয়ে ঘুমুতে যায়, ততক্ষনে রানুর ঘুমের রেশ কেটে যায়। শ্বাসকষ্ট, এসিডিটি আর তলপেটে ব্যাথা নিয়ে রানু ঐ একটি কামরায় ছটফট করতে থাকে গভীর রাত্রির নিস্তব্ধ নিঃসঙ্গতায়।

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২
    ১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
    ২০২১২২২৩২৪২৫২৬
    ২৭২৮২৯৩০৩১