• শিরোনাম

    সফল মানুষ ঃ

    এক জন প্রণব মুখার্জি

    তানজিনা তাজিন | ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২০


    এক জন প্রণব মুখার্জি

    ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি,বাংলাদেশের এক অতিপ্রিয় বন্ধুর মৃত্যুতে আমরা বিস্মিত এবং গভীরভাবে শোকাহত।

    প্রণব মুখার্জির জন্ম অধুনা পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার কীর্ণাহার শহরের নিকটস্থ মিরাটি গ্রামে। তার পিতার নাম কামদাকিঙ্কর মুখোপাধ্যায় ও মাতার নাম রাজলক্ষ্মী দেবী।

    প্রণব মুখার্জি সিউড়ির বিদ্যাসাগর কলেজের ছাত্র ছিলেন; এই কলেজটি সেই সময়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ছিল।১৯৫৭ সালের ১৩ জুলাই প্রণব মুখোপাধ্যায় পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন শুভ্রা মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে।

    শুভ্রা মুখার্জি বাংলাদেশের নড়াইল জেলার সদর উপজেলার ভদ্রবিলা গ্রামের মেয়ে।

    প্রণব মুখোপাধ্যায় একজন কলেজশিক্ষক রূপে তার কর্মজীবন শুরু করেন। পরে তিনি সাংবাদিকের কাজও করেন কিছুকাল। মাননীয় প্রণব মুখোপাধ্যায় কর্মজীবনে প্রথম দিকে হাওড়া জেলার বাঁকড়ায় অবস্থিত “বাঁকড়া ইসলামিয়া হাইস্কুল”র ২ বছর শিক্ষকতা করেছেন। ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দ হতে ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার আমতলার নিকটস্থ বিদ্যানগর কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ছিলেন।
    প্রণব মুখোপাধ্যায় প্রায় পাঁচ দশক ভারতীয় সংসদের সদস্য।


    ১৯৬৯ সালে তিনি প্রথম বার কংগ্রেস দলের প্রতিনিধিস্বরূপ রাজ্যসভায় নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৭৫, ১৯৮১, ১৯৯৩ ও ১৯৯৯ সালেও তিনি রাজ্যসভায় নির্বাচিত হয়েছিলেন।রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পাওয়ার জন্য প্রণব মুখার্জিকে দীর্ঘ ৬৫ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। কথা শুধু এটুকুই নয়। বাস্তবে রাষ্ট্রপতি বানানোর নামে প্রণব মুখার্জিকে প্রধানমন্ত্রিত্বের ‘রেস’ বা প্রতিযোগিতা থেকেই সুকৌশলে সরিয়ে দিয়েছিল কংগ্রেস।

    ইন্দিরা গান্ধীর সময় থেকে গান্ধী পরিবারের অতি বিশ্বস্ত সেবক হিসেবে ভূমিকা পালন করে এলেও প্রণব মুখার্জি কংগ্রেসের জন্য ‘বার্ডেন’ তথা বোঝা হয়ে উঠেছিলেন। সোনিয়া গান্ধী না তাকে গিলতে পারছিলেন, না পারছিলেন উগলে ফেলতে। সনিয়া গান্ধী অনিচ্ছাসত্ত্বেও রাজনীতিতে যোগদান করতে সম্মত হলে প্রণব মুখোপাধ্যায় তার প্রধান সহায়কের ভূমিকা পালন করেন। বিভিন্ন সমস্যা সনিয়ার শাশুড়ি ইন্দিরা গান্ধী কিভাবে সমাধান করতেন, তার উল্লেখ করে তিনি সনিয়াকে সাহায্য করতেন।


    প্রণব মুখার্জির প্রশ্নাতীত আনুগত্য ও প্রজ্ঞা তাকে সনিয়া গান্ধী ও মনমোহন সিংহের ঘনিষ্ঠ করে তোলে। ২০০৪ সালে দল ক্ষমতায় এলে প্রণব মুখোপাধ্যায় প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের সম্মানজনক দায়িত্বটি পান। মুখার্জি ছিলেন একজন দৃঢ় প্রত্যয়ী রাজনীতিবিদ যাকে রাজনৈতিক দলের সবাই ভালোবাসতেন।তাঁর প্রথম অর্ধ শতবর্ষের দীর্ঘ রাজনৈতিক কার্য চলাকালীন, তিনি ৪৭ বছর বয়সে ভারতের অর্থমন্ত্রীসহ(যা তাকে ভারতের সবচেয়ে কমবয়সী অর্থমন্ত্রী হিসেবে পরিচিতি দিয়েছে)বেশ কয়েকটি পদ দখল করেছিলেন।

    তারপর থেকে তিনি বৈদেশিক বিষয়, প্রতিরক্ষা এবং অর্থনৈতিক বিষয়ের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রণব মুখার্জি রাজনৈতিকভাবে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির অধিকারী হলেও একজন বাস্তববাদী। রিডিফকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে তাকে তার সরকারের দুর্নীতি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে


    তিনি বলেন:“দুর্নীতি একটি ইস্যু। আমাদের ইস্তাহারে এই প্রসঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু দুঃখের সঙ্গেই জানাচ্ছি যে কেলেংকারি কেবল কংগ্রেস বা কংগ্রেস সরকারের মধ্যেই আবদ্ধ নেই। অনেক কেলেংকারি রয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অনেক নেতাই এই ধরনের কেলেংকারির সঙ্গে জড়িত। তাই কংগ্রেস সরকার দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত; এমন কথা বললে বিষয়টি লঘু করে দেখানো হবে।”

    তিনিই প্রথম বিদেশি নাগরিক যিনি ১৫ জুন ১৯৭১, রাজ্যসভার বাজেট অধিবেশন চলাকালীন প্রবাসে বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব করেছিলেন এবং একজন ভারতীয় বাঙ্গালি রাজনীতিবিধ হওয়ায়,বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

    সরকার পরিচালনায় দেশের ক্রান্তিকালে নানান রাজনৈতিক জটিলতার শান্তিপুর্ন সমাধানে সিদ্ধ রাজনীতিতে চানক্য খ্যাত প্রণব মুখার্জী,
    তাঁকে দেয়া অনেক পুরস্কার এবং সম্মাননার মধ্যে রয়েছে ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার, ২০০৮ সালে পদ্মভূষণ,১৯৯৭ সালে সেরা সাংসদ পুরস্কার এবং ২০১১ সালে ভারতের সেরা প্রশাসক পুরস্কার গ্রহণ করেন।২০১৩ সালে, বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান তাঁকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা তুলে দেন।সেই অশান্ত সময়ে তিনি বাংলাদেশকে যে সহায়তা করেছিলেন তা একজন দুর্দান্ত নীতিমালার মানুষ এবং সর্বদাই মানবতার পক্ষে এবং অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করে এমন ব্যক্তি হিসেবে তাঁর চিত্র এঁকেছিল।

    ৯ অগস্ট ২০২০ রাতে নিজের দিল্লির বাড়িতে শৌচাগারে পড়ে গিয়েছিলেন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি। পর দিন সকাল থেকে তাঁর স্নায়ুঘটিত কিছু সমস্যা দেখা দেয়। বাঁ হাত নাড়াচাড়া করতে সমস্যা হচ্ছিল।১০ ই আগস্ট দিল্লীর সেনা হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি প্রণব মুখার্জি। হাসপাতালে তাঁর করোনা রিপোর্ট পজেটিভ আসে। এরপর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ এর কারণে ওনার ইমার্জেন্সী ব্রেন সার্জারি করা হয়।আরেকদিকে, ওনার মৃত্যু নিয়ে প্রায়ই গুজব রটে। যদিও সমস্ত গুজবের জবাব দিয়েছিলেন প্রণব পুত্র এবং কন্যা। অবশেষে ৩১ আগস্ট ২০২০ তিনি জীবন যুদ্ধে হেরে যান। তাঁর মৃত্যু শুধু বাংলাদেশ এবং ভারতের ক্ষতি নয় বরং পুরো বিশ্বের।

    আমরা তাঁর পরিবার এবং ভারতের প্রতি গভীরভাবে সমবেদনা জানাই যারা তাদের সর্বশ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রপতির একজন হারিয়েছে।তাঁর উত্তরাধিকার এবং শিক্ষা চিরকাল বেঁচে থাকবে এবং বাংলাদেশে,তাঁর বন্ধুত্ব সর্বদা লালিত হবে।

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২
    ১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
    ২০২১২২২৩২৪২৫২৬
    ২৭২৮২৯৩০৩১