• শিরোনাম

    করোনাকালীন সময়ে নারীর প্রতি সহিংসতা ‘বাস্তব’ বলে গ্রহণ করা উচিৎ ।

    তানজিনা তাজিন | ০৯ আগস্ট ২০২০


    করোনাকালীন সময়ে নারীর প্রতি সহিংসতা ‘বাস্তব’ বলে গ্রহণ করা উচিৎ ।

    এটা বর্তমানে একটা সাধারণ ধারণা যে, মহামারী অথবা যেকোনো জরুরী অবস্থা, পুরুষদের থেকে নারীদের উপর বেশি প্রভাব ফেলে।যখন ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সমস্যা সবার জন্য হুমকি তখন সহিংসতা এবং বৈষম্যতা একটি বাড়তি হুমকি যেটি নারীদের এবং মেয়েদের যেকোনো জরুরী সময়ে ঘরে এবং বাইরে সম্মুখীন হতে হয়।

    বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, যখন নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার প্রাদুর্ভাব বেশি তখন এর হুমকিও নিঃসন্দেহে বেশি হবে।


    এটি আমাদের মাঝে ন্যায়সংগত প্রত্যাশার পরিচালনা করে যে, কোভিড-১৯ এর সময়ে এই হুমকিগুলো নিরসনের লক্ষ্যে জাতীয় প্রতিবেদন কঠোরভাবে গ্রহণ করা হবে।

    এ পর্যন্ত মহামারীকে মোকাবেলার জন্য জাতীয় স্তরে ক্রিয়া ও কৌশল অনুসরণ করা হয়েছে কিন্তু সর্বজনীন প্রাপ্ত তথ্য থেকে মনে হয়, লিঙ্গ-ভিত্তিক সহিংসতার বিষয়ে খুব কম জোর দেয়া হয়েছে।


    এমনকি এই বিষয়ে জনসাধারণের ধারণাও কিছুটা অনুরূপ বলে মনে হয়;নারী ও অন্য লিঙ্গ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সহিংসতার বিষয়গুলি নিম্ন স্তরের বলে বিবেচিত হয়।

    প্রথমত, এটা এমন একটা প্রভাব যা জনস্বাস্থ্যের প্রভাবের বিপরীতে সবসময় দৃশ্যমান নয়।এই মহামারী প্রাদুর্ভাবের কারণে গণমাধ্যম প্রতিবেদন তুলনামূলকভাবে সীমাবদ্ধ ছিল। বিপরীতভাবে, মহামারীর পূর্ব অবস্থায় নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার বিষয়টি সামনে আনার ক্ষেত্রে গণযোগাযোগ মাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। ইতোমধ্যে মহামারী সম্পর্কিত সরকারী প্রতিক্রিয়াগুলি এ বিষয়ে নিযুক্ত সংস্থাগুলিকে ন্যূনতম নির্দেশনা দিয়ে মূলত জনস্বাস্থ্য এবং অর্থনীতির বিষয়গুলিতে মনোনিবেশ করেছে।


    ফলস্বরূপ, যদিও বেশ কয়েকটি উন্নয়নশীল সহযোগী সংস্থা এবং বেসামরিক সমাজ সংগঠন নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতার ঝুঁকি মোকাবিলার প্রয়োজনীয়তার কথা শুনছে তবুও জনসাধারণ এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে নি যে, হুমকিটিকে ‘বাস্তব’ হিসেবে স্বীকার করবে।

    বলা বাহুল্য, আমাদের মহিলা ও শিশুজড়িত বিষয়গুলোর সাথে সম্পর্কিত একটা পৃথক মন্ত্রণালয় রয়েছে যার অধীনে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর, জাতীয় মহিলা সংস্থা এবং লিঙ্গ-ভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে চলমান অনেক প্রকল্প রয়েছে।সহিংসতা প্রতিরোধের জন্য জেলা,উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিটি এবং মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় কারাগার রয়েছে। আইন ও নীতিমালার ক্ষেত্রেও, এটা সর্বাধিক মোকাবেলাকৃত বিষয়গুলোর একটি যেটা নিয়ে আমাদের কয়েকবছর ধরে বেশ কয়েকটি আইন,নীতি ও কর্মপরিকল্পনা রয়েছে। তবে এটি বোধগম্য যে, এই অভূতপূর্ব সংকট রাষ্ট্রের প্রশাসনিক বিভাগের পুরো দৃষ্টিকে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার দিকে নিয়ে গেছে কারণ মার্চ মাসের প্রাদুর্ভাবের পরে যথেষ্ট সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে,এখন অবধি মহিলা ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা রোধে বিদ্যমান বিস্তৃত কাঠামোসমূহ,মহামারীর সময় ক্ষতিগ্রস্থদের জন্য অতিরিক্ত সুরক্ষা এবং প্রতিরোধমূলক সহায়তা দেওয়ার জন্য অন্তত একটি কৌশল অবলম্বন করা উচিত ছিল।

    দুর্ভাগ্যক্রমে,বেসামরিক সমাজ সংস্থা এবং অধিকার-ভিত্তিক সংগঠনগুলো প্রধানত বর্তমানে লিঙ্গ-ভিত্তিক সহিংসতা বৃদ্ধির বিষয়ে আওয়াজ তুলছে এবং সতর্ক করে চলেছে। তবে সরকারী সংস্থাগুলো এবং এর কর্মীরা এই উদ্যোগগুলোতে সক্রিয়ভাবে নেতৃত্ব না দিলে একাকী সুশীল সমাজের সদস্যদের পক্ষে সহিংসতায় নিহতদের জন্য কার্যকর প্রতিরোধ ও সুরক্ষা পরিষেবা সরবরাহ করা সম্ভব হবে না।

    প্রাদুর্ভব চলাকালে অতিরিক্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য যেকোনো পদক্ষেপ নেয়ার সময়, এই সমস্ত সরকারী সংস্থা এবং সুরক্ষা পরিষেবা প্রকল্পগুলোকে প্রথমে মেনে নিতে হবে যে মহামারী এবং লিঙ্গ-ভিত্তিক সহিংসতার মধ্যে যোগসূত্র রয়েছে। এটিকে গুরুত্বের সাথে নেওয়া এবং হ্রাস করার জন্য পরিকল্পনা করা অসম্ভব হবে যদি ঝুঁকিটির কঠোর তীব্রতা সবাই স্বীকার করে না নেয়।

    সরকার থেকে এই সমস্ত সংস্থার জন্য কার্যপ্রণালীর নির্দেশনা প্রয়োজন এবং জরুরী পরিস্থিতিতে কিভাবে সর্বোত্তমভাবে তারা তাদের লক্ষ্য অর্জন করতে পারে সে বিষয়ে পরিষেবা দেওয়া প্রয়োজন। জাতীয় পর্যায়ের সমস্ত সম্পর্কিত মন্ত্রণালয়, বেসামরিক সমাজ সংস্থা,মহিলা এবং লিঙ্গ-ভিত্তিক অধিকার সংগঠন, দাতা এবং উন্নয়ন সংগঠনসহ সর্বস্তরের জন্য পরামর্শমূলক উদ্যোগ থাকতে হবে।লিঙ্গ-ভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে এই জাতীয় পরামর্শ বিভিন্ন সংস্থার অনুসরণের জন্য একটি সংক্ষিপ্ত তবে কার্যকর ধাপে ধাপে নির্দেশিকা তৈরি করা দরকার।

    উদাহরণস্বরূপ,ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস(ওসিসি) কেন্দ্রগুলোর জন্য,সমস্ত ওসিসিগুলোকে পূর্বনির্ধারিত নয় এমন কাজ না করে কোভিড-১৯ এর সময় কিভাবে তাদের ফলাফল সর্বাধিক করা যায় সে বিষয়ে একটি বিশেষ পদ্ধতিগত নির্দেশনা দেওয়া যেতে পারে। বিশেষত,ধর্ষণ ও অন্যান্য যৌন নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য অতিরিক্ত স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা প্রোটোকল অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

    নিরাপত্তা এবং ভুক্তভোগীদের মুক্তির বিষয়ে সুরক্ষিত কেন্দ্রগুলোতে অনুরূপ অতিরিক্ত প্রোটোকল চালু করা দরকার। লিঙ্গ-ভিত্তিক সহিংসতার শিকারদের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে থানাগুলোতেও বিশেষ নির্দেশনা দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

    সংক্ষেপে,বিদ্যমান ব্যবস্থায় অনেকগুলো নতুন পরিবর্তন প্রয়োজন এবং এই সমস্যা সম্পর্কিত মন্ত্রণালয় এবং কর্তৃপক্ষকে সতর্কতার সাথে পদক্ষেপ নেওয়া দরকার যাতে সংকট চলাকালীন সময়ের সুরক্ষা ব্যবস্থাসমূহ ক্ষতিগ্রস্থ না হয় বা স্থবির না হয়ে পড়ে।
    তবে,এটা সত্য যে কিছু প্রচেষ্টা অবিলম্বে শুরু করা যেতে পারে বিদ্যমান সম্পদ ও গঠনপ্রণালী ব্যবহারের মাধ্যমে। কিছু সংখ্যক অবশ্যম্ভাবী কাজ কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে যদি না বর্ধিত সংস্থান সরবরাহ করা হয়।তবে,ব্যাপক প্রভাব সৃষ্টির লক্ষ্যে সর্বপ্রথম আমাদেরকে স্বীকার করতে হবে যে প্রকৃতপক্ষে সহিংসতার মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা মহিলাদের মধ্যেই বেশি এবং আমাদেরকে শাসনকার্যের সর্বস্তরে এ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে চেষ্টা করতে হবে।

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২
    ১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
    ২০২১২২২৩২৪২৫২৬
    ২৭২৮২৯৩০৩১