• শিরোনাম

    ছোটগল্প :

    করোনা এবং একজন তোফায়েল মিয়া : রুসেলি কবির

    | ২৬ আগস্ট ২০২০


    করোনা এবং একজন তোফায়েল মিয়া : রুসেলি কবির

    ভাদ্র মাসের তালপাকা গরমে কয়েকদিন ধরেই অবস্থা খারাপ। তার মাঝে সকালে একপশলা বৃষ্টি হয়ে ভ্যাপসা ভাবটা আরো কেমন যেন বাড়িয়ে দিয়েছে। করোনার জন্য এখন আবার মাস্ক পড়া বাধ্যতামূলক।

    মাস্ক বেশিক্ষন পরে থাকলে তোফায়েল মিয়ার দমবন্ধ লাগে। ও, তোফায়েল মিয়ার সাথে আপনাদের তো পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়নি , আজকের গল্পটি তোফায়েল মিয়াকে নিয়ে।


    একটি বেসরকারি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের ক্লিনার সে। করোনার লক ডাউনের কারণে অফিস প্রায় ৪ মাস বন্ধ ছিল।

    ৫ দিন আগে ক্লিনিং সুপারভাইজার ফোন করে জানালেন যে সামনের সপ্তাহে অফিস খুলবে। সত্যি বলতে কি এই খবর শুনে তোফায়েল মিয়ার জানে পানি এসেছে। এমনিতেই গত ৩ মাস বেতন অর্ধেক করে দেয়ায় ৪ জনের সংসার টানতে হিমশিম খেতে হয়েছে। ভাগ্যিস ছেলেটা বড়ো হওয়াতে একটা সুপারশপে কাজ পাওয়ায় তাও কিছুটা সামাল দেয়া গেছে।


    একবার ভেবেছিলো স্ত্রী আর মেয়েটাকে কে গ্রামে পাঠিয়ে দিয়ে ছেলে বাবা ঢাকাতে কেবল একটা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকবে কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর পাঠায়নি অহেতুক বাড়তি চিন্তা করতে হবে ভেবে। ঠিক করেছিল আর কিছুদিন অপেক্ষা করে সে সহ সবাই দেশের বাড়ি গিয়ে কিছুদিন থাকবে। ওখানে তার ছোট্ট একচিলতে জমিতে ৩ খানা ঘর আছে।

    একটা ঘরে তোফায়েল মিয়ার এক বিধবা বোন তার ছেলেকে নিয়ে থাকে। একসময় তাদের বহু জমি জিরেত ছিল কিন্তু তার দাদা ছিল বেহিসেবি তাই জমি বিক্রি করতে করতে আজ অল্প কিছুতে এসে ঠেকেছে। তোফায়েল মিয়া প্রাইমারি স্কুল কোনোরকমে পাশ করে পরে তার এক চাচার সাথে ঢাকা শহরে আসে। চাচা তাকে একটা ওয়ার্কশপে সহকারীর কাজে লাগিয়ে দেয়। অল্প যা কিছু বেতন পেত, কিছু বাড়িতে পাঠাতো আর নিজে একবেলা খেয়ে সামান্য কিছু জমাতে পারতো। প্রায় ১০ বছর ওয়ার্কশপ টিতে সে কাজ করে প্রায় ১ লক্ষ টাকা জমিয়েছিল। পরে বিয়ের সময় খরচ হয়েছে। বিধবা বোনকেও কিছু দিয়েছে।


    তোফায়েল মিয়া খুব এ সৎ এবং কর্মঠ মানুষ। সে জানে , পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। তাই বিয়ের পর সে আরো আয় উন্নতির চেষ্টা করছিলো। হঠাৎ প্রতিবেশী একজন এর মাধ্যমে এই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ৮ বছর আগে ক্লিনার এর কাজ পায়। এখন তার বয়স প্রায় ৫০ ছুঁই ছুঁই। যা বেতন পেত মোটামুটি ভালোই চলছিল। করোনা এসে করলো সব সর্বনাশ। তার মতো আরো ২০ জন ক্লিনার প্রতিষ্ঠানটিতে কাজ করে। ভোর সাড়ে ৬ টায় অফিস এ ঢুকে ক্লিন করতে হয় ২ ঘন্টার মাঝে কারণ অফিস শুরু হয়ে যায় ৯ টায়। তারপর ৫ টায় অফিস শেষে সবাই বের হয়ে গেলে আবার ক্লিন করতে হয়। প্রায় ৮ টা বাজে কাজ শেষ হতে।

    বাসায় আসতে আসতে ৯ টা। সকালে ৯ টার পরে সারাদিন স্ট্যান্ড বাই থাকতে হয় কখন কোথায় ক্লিনিং এর প্রয়োজন হয় এজন্য। সে সহ আরো ৫ জন ক্লিনার সারাদিন স্ট্যান্ড বাই থাকে , তাদের মাসিক বেতন অন্যদের চেয়ে একটু বেশি আর বাকিরা সকালে ক্লিনিং শেষ করে আবার বিকেলে আসে। তাদেরটা একরকম পার্ট টাইম। এই বয়সে তোফায়েল মিয়ার খুব ক্লান্ত লাগে কিন্তু তারপরও সান্ত্বনা এই যে , এই দুঃসময়ে চাকরিটা অন্তত এখনো আছে ।

    বয়সের কারণে আর তার সততার জন্য অফিস এর অনেক স্টাফ ও তাকে চেনে , দেখা হলে হেসে কথা বলে , পরিবারের খবর জিগ্যেস করে , তোফায়েল মিয়াও সবার সাথে সম্মানের সাথে কথা বলে , কাজে ফাঁকি দেয়না। অফিসের বড়ো স্যার ম্যাডাম দের সামনে তার কথা বলতে বড়ো সংকোচ হয়, যদি উনারা ভাবেন যে সে উনাদের থেকে সুবিধা আদায় করতে চাচ্ছে তাহলে বড়ো লজ্জার ব্যাপার হবে। ৬ মাস আগে অফিস এ একজন ম্যাডাম জয়েন করেছেন , উনি খুব রাশভারী। সালাম দিলেও তাকিয়ে হাসেন না। খুব গম্ভীরভাবে চশমার ফাঁক দিয়ে সালামের উত্তর দেন। উনাকে তোফায়েল মিয়া খুবই ভয় পায়। দেখলেই মনেহয় এই বুঝি কোনো কারণে ধমক দেবেন।

    অফিস খোলার ৫ দিন আগে থেকে ক্লিনিং কার্যক্রম শুরু হয়ে গেছে। ম্যানেজমেন্ট এর আদেশ , সবকিছু জীবাণুমুক্ত করে ঝকঝকে তকতকে রাখতে হবে। তাই ক্লিনার রা খুবই ব্যস্ত দিন পার করছে। প্রায় ৯-১০ ঘন্টা করে কাজ করেছে সবাই এই কয়দিন। প্রথম মাসে সবাই একসাথে অফিস এ আসবেনা , পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে রোস্টার ভিত্তিতে আসবে। প্রথম সপ্তাহে মাত্র ১০/১২ জন এসেছে পরীক্ষামূলকভাবে। বেশির ভাগ ওয়ার্ক স্টেশনই খালি।

    কাজ করে ক্লান্ত তোফায়েল মিয়া হঠাৎ একদিন দুপুরে তিনতলার সিঁড়ির মুখে একটা খালি পরিত্যক্ত ওয়ার্কস্টেশন এর সামনের চেয়ার এ একটুখানি বসে। এসি চলতে থাকায় আরামদায়ক ঠান্ডা অনুভূতিতে হঠাৎ তার তন্দ্রমতো এসে যায়। ক্লান্ত শরীরে তার চোখ একটুখানি লেগে গিয়েছিলো , হঠাৎ কর্কশ চিৎকারে তার তন্দ্রা কেটে যায় , ধড়মড় করে সে দাঁড়িয়ে পরে । সিঁড়ি দিয়ে উঠার সময় একজন স্টাফ তাকে চেয়ার এ বসা দেখে চিৎকার করে বলে উঠে, “হাউ ডিসগাস্টিং ! ক্লিনার রা এখানে কেন? তার উপর আবার চেয়ারে বসে ঘুমাচ্ছে? কোন না কোন বস্তি থেকে আসে!! ওহ মাই গড! আই এম ফিলিং সো রিস্কি!!! আমি এখুনি অ্যাডমিন এ লিখিত কমপ্লেইন করবো ”

    তোফায়েল মিয়া ঘটনার আকস্মিকতায় এতটাই হতভম্ব হয়ে পরে যে , কি করবে বুঝতে পারেনা। তার মরমে মরে যেতে ইচ্ছা করে , মনে হতে থাকে মাটি ফাঁক হয়ে সে যেন ভেতরে ঢুকে যায় । সে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। স্টাফটি আরো কি কি যেন চিৎকার করে বলছিলো , তার মাথাতেও ঢুকেনা। নিজের সন্তানের বয়সী কেউ যখন এভাবে অপমান করে কথা বলে , তখন আরো বেশি লজ্জা লাগে। বিকেলে ক্লিনিং সুপারভাইজার তাকে ডেকে পাঠান। বলেন , ” তোফায়েল মিয়া , আপনার বিরুদ্ধে সিরিয়াস কমপ্লেইন এসেছে , আপনি তিনতলার চেয়ার এ নাকি বসে ঘুমাচ্ছিলেন ? আপনাদের এতো করে বলি , দাঁড়িয়ে থাকবেন , কোথাও বসবেন না , তাও শুনেননা , সেজন্য কমপ্লেইন আমাকে শুনতে হয় , আপনার এতো বসার কি দরকার ছিল ? ” তোফায়েল মিয়ার চোখে প্রায় পানি এসে যায় , এই বয়সে এতো লজ্জা আর অপমান ! নিজেকে তার ধিক্কার দিতে ইচ্ছা করছে ,সে এতবছর এখানে কাজ করছে এতো নিষ্ঠার সাথে , কোনোদিন ফাঁকি দেয়নি , এখন বয়স হয়েছে , ক্লান্তি এসে ভিড় করে শরীরে , আর ইদানিং খুব গরম পড়াতে হয়তো তার চোখ হঠাৎ লেগে গিয়েছিলো। কেন যে চেয়ার টায় বসতে গেলো ! তাহলে তো আজ এই অপমানের দায়ভার তাকে নিতে হতোনা। সে মাথা নিচু করে আস্তে করে বলে ,

    “স্যার, আমাকে মাফ করে দেন , আমি আসলে ইচ্ছা করে ঘুমাইনি , হঠাৎ গরমে এসির ঠান্ডা বাতাসে আমার তন্দ্রা লেগে গিয়েছিলো , আর ওই চেয়ার টায় কেউ বসেনা , আমি আজ ভুল করে বসে পড়েছিলাম স্যার, বয়স হয়েছে তো , ভুল হয়ে যায় , মনে রাখতে পারিনা সবকিছু , আর ভুল হবেনা স্যার। ”

    “আপনি কোনো ভুল করেননি তোফায়েল মিয়া। ” হঠাৎ একটা মেয়েলি কণ্ঠ দরজার কাছ থেকে ভেসে আসে , ক্লিনিং সুপারভাইজার তড়াক করে উঠে দাঁড়িয়ে সালাম দেয়।

    “আসসালামু আলাইকুম ম্যাডাম , আপনি এলেন কেন , আমাকে ফোন করে ডেকে পাঠালেই তো পারতেন ” দরজায় সেই রাশভারী ম্যাডাম দাঁড়িয়ে আছেন। উনি সুপারভাইজার কে দৃঢ় স্বরে বললেন , “ডেকে পাঠালে তো এই দৃশ্যটা দেখতে পেতামনা লোকমান সাহেব , আপনি তোফায়েল মিয়া কে চেয়ার এ বসতে নিষেধ করছেন আর নিজে দিব্বি চেয়ার এ বসে আছেন , ওভাবে চিন্তা করলে আপনার ও তো চেয়ার এ বসার কথা না তাইনা? একজন ক্লিনিং সুপারভাইজার হিসেবে আপনার পুরো অফিস এ ঘুরে ঘুরে ক্লিনিং এর কাজ সুপারভাইস করার কথা তাইনা ? আপনি তো তা সারাদিন করেননা , আপনাকে বসার জন্য ম্যানেজমেন্ট ওয়ার্ক স্টেশন ও দিয়েছে যেন আপনি কাজের ফাঁকে মাঝে মাঝে বসে বিশ্রাম নিতে পারেন , তাইনা ? ”

    লোকমান সাহেব একটু থতমত খেয়ে গেলেন , এতটা সরাসরি কথা তিনি ম্যাডামের কাছ থেকে আশা করেননি। একজন ক্লিনার এর সামনে ম্যাডাম তাকে এইভাবে বলবে, এটা সে চিন্তা করেনি। তোফায়েলের দিকে সে আড়চোখে তাকিয়ে দেখে , সে মাথা আরো নিচু করে ফেলেছে। লোকমান ম্যাডাম কে বলে ” ম্যাডাম , একাউন্টস ডিপার্টমেন্টের একজন স্টাফ কমপ্লেইন করেছে , তাই আমি তাকে ডেকে একটু সাবধান করে দিচ্ছিলাম । ”

    “আপনি সাবধান করছিলেননা, তাকে হুমকি দিচ্ছিলেন , শুনুন লোকমান সাহেব , মানুষ কে তার প্রাপ্য সম্মান টা দিতে শিখুন , স্টাফের কমপ্লেইন পাওয়ার পর আপনার আমাকে জানানো উচিত ছিল , আমি বিষয়টা হ্যান্ডেল করতাম , আপনি শুধুমাত্র একটা চেয়ার এ বসার জন্য তোফায়েল মিয়া কে এভাবে বলতে পারেননা। আর আমি তো এটাও জানতামনা ক্লিনার দের বসে বিশ্রাম নেয়ার জন্য কোনো চেয়ার এর ব্যবস্থা নেই। এটা খুবই অমানবিক যে ৮-১০ ঘন্টা একজন মানুষ দাঁড়িয়েই কাটাবে ! আপনাকে যদি বলি , আপনি পারবেন ? ”

    “আমি দুঃখিত ম্যাডাম , আমি আসলে এভাবে কখনো ভেবে দেখিনি , আপনার মতো করে আগে এভাবে কেউ আমাদের ভাবতে শেখায়নি , সত্যিই তো , আমাদের ক্লিনার ভাইরা আপারা এতো কষ্ট করে সারাদিন আমাদের সেফটির জন্য পুরো অফিস ক্লিন করেন , আর আমরা তাদের সামান্য বসার ব্যবস্থা করতে পারিনি! সত্যিই তো , ধন্যবাদ আপনাকে আমার চোখ খুলে দেয়ার জন্য , তোফায়েল ভাই , আপনারা কাল থেকেই কাজ শেষ করে বিশ্রাম যেন নিতে পারেন, এজন্য একটা রুম আলাদা বরাদ্দ রাখবো আমি। ”

    তোফায়েল মিয়া কি বলবে ভেবে পেলোনা , যে আপা কে দেখলে তার কলিজা শুকিয়ে আসতো, শেষে কিনা তার বদৌলতেই তার সম্মান রক্ষা হলো আজ , নাহ পৃথিবী থেকে মানবিকতা , একে ওপরের প্রতি মমত্ববোধ তাহলে একেবারে উঠে যায়নি , তোফায়েল মিয়ার চোখ আবেগে ঝাপসা হয়ে আসে , অনন্য প্রশান্তিতে মন ভরে যায়, ম্যাডাম তার দিকে তাকিয়ে আছেন আজ ও চশমার ফাঁক দিয়ে , কিন্তু আজ সেই চোখ ভাবলেশহীন নয় , সেই চোখে তার জন্য পরম মমতা , সহমর্মিতা।

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২
    ১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
    ২০২১২২২৩২৪২৫২৬
    ২৭২৮২৯৩০৩১