• শিরোনাম

    আমি একা নই – প্রবীণ কলম বন্ধু : চিঠি নং:০৪

    করোনা কালের দিনগুলি: সুরেশ মন্ডল (৭২), কোলকাতা।

    রুমা হালদার | ২৯ জুন ২০২০


    করোনা কালের দিনগুলি: সুরেশ মন্ডল (৭২), কোলকাতা।

    আজকের  চিঠি : চিঠি নং -০৪

    বৌমা বাড়ি থেকে যাবার সময়ে বলেছিলো ১০/১২ দিনের মধ্যে চলে আসবে; আর সেভাবেই রান্না বান্না করে ফ্রিজে রেখে দিয়েছিলো। আমাকে চুলা জ্বালানো শিখিয়েছিলো, শুকনা খাবারের জায়গাগুলোও চিনিয়ে দিয়েছিলো।


    বেশ কিছুদিনের প্রয়োজনীয় জিনিসপ্রত্র ও কিনে দিয়েছিলো। কিন্তু ওরা যাবার দুই দিন পর থেকেই লক ডাউন। আজ তিন মাস হয়ে গেলো ওরা আটকে আছে। বাড়ি ফিরতে পারছে না। এদিকে আমি একা; প্রথম প্রথম খারাপ লাগতো না; এটা সেটা করে দিন পার হতো।

    ভাবতাম করোনা চলে যাবে বাড়ির সবাই ফিরে আসবে। কিন্তু এখন বেশ খারাপ লাগে। যদিও আমি এর মধ্যে অনেক কাজ শিখে গেছি। আম্ফান ঝড়ের পরে আমার মন ভেঙ্গে গেছে।


    দুইদিন খুব কষ্ট হয়েছিলো। সারারাত একা অন্ধকার ঘরে অলো বিহীন খাটের উপর বসে কাটিয়েছি। সেকি ঝড়, এক এক সময় মনে হয়েছিলা এখনই ঘরের চালা উড়িয়ে নেবে। ঘরের মধ্যে যখন জল ঢুকতে শুরু করলো। প্রথম বুঝতে পারিনি।

    ঘরের জিনিস পত্র যখন ভাসতে দেখলাম বুঝলাম ঘরে জল ঢুকেছে। চেষ্টা করলাম উপরে তোলার। যা পেলাম তাই উপরে তুলে দিলাম। প্রতীক্ষয় রইলাম কখন ঝড় থামে। সকাল হলো ঘরের জলতো নামে না। কি করি।


    খাটের উপর বসেই কিছু শুকনা খাবার খেয়ে নিলাম। সকাল পেরিয়ে দুপুর হলো ঘরের জল কমতে শুরু করলো। এবারে চেষ্টা করলাম ঘরের বাইরে যেতে কিন্তু ঝড়ে যে আম গাছ পড়ে গেছে। সব কিছু ঠেলেটুলে বের হলাম।

    গাছপালা সরিয়ে দিলাম। এর মধ্যে কিছু সিদ্ধভাতও রান্না করলাম, খেলাম। কিছক্ষণ পর আমার মেয়ে এলো দেখতে। ঘরের অবস্থা দেখে হাত দিলো পরিস্কার করতে। রান্না করলো। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো, নেটওয়ার্ক নেই। কারো সাথে যোগযোগ করতে পারছিনা। সবাই চিন্তা করছে। বিদ্যুৎও নেই। বাড়ির কিছু জিনিস নষ্ট হয়েছে। বিকালের দিকে ফোনে পেলাম সবাইকে। জানালাম সব। কিন্তু করোনা আমাদের অসহায় করে দিয়েছে।

    তবে আমি কাটিয়ে নিয়েছি সব। এখন আমি খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে হাঁটি কিছুক্ষণ। এখন আর রাস্তায় হাঁটিনা। বাড়িতেই হাঁটাহাঁটি করি। জলখাবার খেয়ে একটু ঘরের কাজ সেরে নিই। এর মধ্যে কোন ফোন এলে কথা বলি।

    কখনো কখনো স্নানটা আগেই সেরে নেই। এরপর প্রাথর্নায় বসি। প্রাথর্না শেষ করে অপেক্ষায় চেয়ে থাকি কখন আসবে আমার বাড়ির সবাই? কবে এই করোনা যাবে? স্ত্রীপুত্রদের জন্য খারাপতো একটু লাগেই।

    আমি বড় ফোন ব্যবহার করতাম না। এক প্রতিবেশীর সহায়তায় প্রিয়জনকে দেখার জন্য একটি বড় ফোন কিনেছি। কিন্তু তা আবার ভালো কাজ করছে না। করোনাকালে আমি এতো অসহায়। সেই ছোট বেলা বাবা মাকে হারিয়েছি।

    একটু বুঝতে যখন শিখেছি তখন ভাই বোনোরা সব আলাদা আলাদা জায়গায় গিয়ে বসতি গড়ে। তখন থেকেই একা আছি। যদিও আমি বাঁধি ঘর এখানে। কিন্তু ছেলে মেয়েরাও কাজের জন্য আজ আলাদা জায়গায়। আবার আমি একা।

    তবে আগের জীবনের চেয়ে আমার জীবন এখন একটু আলাদা। বড়ো সুখের জীবনই ছিলো আমার। কিন্তু এই করোনা এতো ভয় দেখাচ্ছে যে পড়ন্ত বেলায় আমি আজ ঠাকুরের ভরসায় রয়েছি।

    জানিনা কী হবে? তবে তোমাদের মাধ্যমে আমি বলতে চাই। যার যখন সময় হবে সে চলে যাবে। কষ্ট পেয়োনা তোমরা। আমার শেষ সময়ে যদি প্রিয়জন কাছে থাকে আমার ভালো লাগবে।

    আর কিছু চিন্তা করতে চাইনা। তবে প্রকৃতি বড়ো নিষ্ঠুর । যায় দিন ভালো, আসে দিন খারাপ। ও ভালো কথা । আমার ছোট বোন একটি ছোট্ট উপহার চেয়েছিলো আমার কাছে; আমি তাকে তা এখনো দিতে পারিনি। এটা আমার একটু অসম্পূর্তা। আমার সন্তানদের বলতে চাই তোমরা আমার হয়ে দিয়ে দিও। করোনা যদি আমায় সুযোগ দেয় তবে আমিই দেবো।

    আর কি – আমার গাছের লেবু, আম, কলা নিজ হাতে লাগানো সবজি একাই খাই। কোন স্বাদ পাইনা। খারাপ লাগে আমার নাতি নাতনীদের জন্য। তারা কাছে থাকলে খেতে স্বাদ পেতাম। করোনার আগের জীবন ছিলো আমার কাজের মধ্যে ব্যস্ততায় ভরা। আর এখন তা পানসে

    দুইবেলা বসে প্রাথর্না আর খাওয়া ঘুম। এভাবেই কেটে যায় সারাবেলা। তোমরা আমার জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রাথর্না কোর যেন আমি প্রিয়জনদের সাথে নিয়ে শেষবেলা কাটাতে পারি। করোনাকালে সবাই ভালো থাকুক। সুস্থ থাকুক এই কামনা করি। ঈশ্বর মঙ্গলময়, মঙ্গল করুক সবার।

    ***

    এই মানবিক পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে হলে

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২
    ১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
    ২০২১২২২৩২৪২৫২৬
    ২৭২৮২৯৩০৩১