• শিরোনাম

    করোনা বিষয়ে কিছু ভুল বা অস্পষ্ট ধারণা এবং উত্তর

    ডা. জলধি রায়, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ | ২৩ মে ২০২০


    করোনা বিষয়ে কিছু ভুল বা অস্পষ্ট ধারণা এবং উত্তর

    করোনা বিষয়ে বেশ কিছু ভুল বা অস্পষ্ট ধারনা আছে। আমি চেষ্টা করেছি সেসবের উত্তর দিতে যেগুলো কেউ ক্লিয়ারলি বলে নি।

    প্রথমে জেনে নিই, এই ভাইরাস যার শরীরে আছে তার শরীর থেকে বাইরে বের হয় সেই মানুষের হাঁচি, কাশি, নিঃশ্বাসের সঙ্গে বা সেই মানুষের কথা বলার সময় বের হওয়া থুথুর কণার সঙ্গে। আর এই ভাইরাস কোনো মানুষের ভেতরে ঢোকে মুখ, নাক ও চোখ দিয়ে।


    ১. করোনা ভাইরাস কি নাক-মুখের উপরেই বেশি জমা হয়, তা না হলে সবাই মাস্কের উপরেই জোর দিচ্ছে কেন?

    ―ভাইরাস শুধু নাক-মুখ নয়, আপনার শরীরের উপর সব জায়গাতেই সমানভাবে জমা হতে পারে। মশার শব্দ আপনি কানে শোনেন বলেই মশারা কান চিনে চিনে ঘোরে এমন নয়, মশা শরীরের সবখানেই সমানভাবে ঘোরে কিন্তু ঘোরার শব্দটা আপনি শুধু কানেই শোনেন। মাস্কের উপর জোর দেয়ার কারণ হলো ভাইরাসটা মুখ, নাক দিয়েই বেশি ঢোকে; চোখ দিয়েও ঢুকতে পারে এজন্য গগলস। অক্ষত চামড়া দিয়ে এই ভাইরাস ঢুকতে পারবে না। তবে আপনি যখন কারও সামনে যান তখন সেই মানুষ যদি হাঁচি, কাশি দেয় বা কথা বলে তাহলে তার ফুসফুস থেকে ভাইরাসটা বের হয়ে আপনার মুখের চতুর্দিকে জমা হবার সম্ভাবনাই বেশি, কারণ, দুইজন মানুষের মাথার উচ্চতা প্রায় সমান।


    মাস্ক পরতে বলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো, যার শরীরে ভাইরাস আছে তার হাঁচি, কাশি, নিঃশ্বাস বা কথার সঙ্গে যেন ভাইরাস বের হয়ে চতুর্দিকে না ছড়ায়।

    ২. আপনি বললেন, ভাইরাসটা শরীরের সবখানেই সমান জমা হতে পারে, তাহলে শুধু হাতই বারবার ধোয়ার কথা বলা হচ্ছে কেন?


    ―শরীরে ভাইরাস আছে এমন কেউ যখন হাঁচি, কাশি দিচ্ছে বা কথা বলছে তখন তার ফুসফুস থেকে ভাইরাস বের হয়ে চতুর্দিকে ছড়ায় এবং বিভিন্ন জিনিসের উপর জমা হয়। এই বিভিন্ন জিনিসগুলো এরপর আরেকজন সাধারণত হাত দিয়েই ধরবেন। এবং শরীরের হাতই সেই অংশ যেটা দিয়ে আপনি নিজের মুখ, নাক, চোখ বেশি স্পর্শ করেন। এজন্যই হাত বারবার ধোয়ার কথা বলা হচ্ছে। যদি আপনি কাপড়সহ সারা শরীরটাই বারবার ধুতে পারেন তাহলে আরও ভালো!

    ৩. বাইরে গেলে গ্লোভস পরি, এর ফলে নিশ্চয় ভাইরাসটা আমার হাতের মাধ্যমে আর আমার শরীরে ঢুকবে না?

    ―গ্লোভস পরা হাত দিয়ে আপনি যা কিছুই ধরেন না কেন, ভাইরাস গ্লোভসের উপরে ঠিকই জমা হচ্ছে। গ্লোভসের মধ্যে এমন কিছু নেই যা ভাইরাসকে মারতে পারে। গ্লোভস পরার যুক্তি হলো, গ্লোভস পরা হাত দিয়ে মানুষ মুখ, নাক, চোখ কম ধরবে। কিন্তু আপনি যদি গ্লোভস পরা হাত দিয়েই মুখ, নাক, চোখ এবং শরীরের বিভিন্ন জায়গা ধরেন, তাহলে গ্লোভস পরা আর না পরা একই কথাই হবে। গ্লোভস পরা হাত দিয়ে আপনি যাই ধরবেন সেখান থেকেই ভাইরাস আপনার গ্লোভসে আসবে বা আপনার গ্লোভস থেকে সেখানে যাবে।

    গ্লোভস পরার অন্য একটা যুক্তি হলো, ভাইরাস সরাসরি আপনার হাতের চামড়ায় জমা হচ্ছে না; কাজেই বাসায় এসে যখন আপনি গ্লোভস খুলে হাত পরিষ্কার করবেন তখন হাত বেশি ভাইরাসমুক্ত থাকবে।

    ৪. আমি তো মাস্ক পরে বাইরে যাই, কাজেই মাস্ক ছাড়া অন্য কেউ যদি আমার সামনে হাঁচি, কাশি দেয় বা কথা বলে আমার নিশ্চয় আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা কম?

    ―শুধু আপনি মাস্ক পরলে কম সুরক্ষাই পাবেন। বেশি সুরক্ষা পাবেন তখন যখন আপনার সামনের মানুষটিও মাস্ক পরবে। সবচেয়ে বেশি সুরক্ষা পাবেন যখন দুইজনই মাস্ক পরবেন এবং আপনাদের দূরত্ব কমপক্ষে ছয় ফুট হবে। মনে রাখবেন, মাস্ক পরে ভাইরাসের প্রবেশ ঠেকানো যত কঠিন, মাস্ক পরে ভাইরাস বাইরে ছড়ানোটা ঠেকানো তার চেয়ে বেশি সহজ।

    ৫. ঈদের জন্য ঢাকা থেকে গ্ৰামের বাড়ি এসেছি। আমার তো অসুখের কোনো লক্ষণ নেই, আমি কেন কোয়ারেন্টাইনে থাকব?

    ―প্রথম কথা, বাড়ি এসে ভুল করেছেন। দ্বিতীয় কথা, অসুখটা যে কত ঝামেলার আপনার ধারণা নেই। এই ভাইরাস শরীরে ঢোকার পর লক্ষণ দেখা দিতে সাত দিনও লাগতে পারে আবার চৌদ্দ দিনও লাগতে পারে। আজ আপনার অসুখের লক্ষণ নেই বলেই যে আপনার শরীরে ভাইরাস থাকার কোনো সম্ভাবনা নেই এমন নয়। কাজেই অসুখের লক্ষণ না থাকলেও আপনাকে দিয়ে ভাইরাস ছড়ানোর সম্ভাবনা আছে। চৌদ্দ দিন পরেও যদি অসুখের কোনো লক্ষণ আপনার মধ্যে না দেখা যায় তাহলে মোটামুটি ধরে নেওয়া যায় যে, আপনার শরীরে আসলে ভাইরাস নেই। তবে, শরীরে ভাইরাস ঢোকার পর কোনোদিনই লক্ষণ দেখা গেল না এমনও হতে পারে, এবং তারাও ভাইরাস ছড়াতে পারে! আশা করি বুঝতে পেরেছেন, অসুখটা কতটা ঝামেলার।

    শুধু করোনা বেশি হচ্ছে এমন জায়গা থেকে আসার পরই নয়, করোনা রোগীর সংস্পর্শে আসার পরেও চৌদ্দ দিন কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে।

    ৬. ঢাকা থেকে বাড়ি আসার পর বা করোনা রোগীর সংস্পর্শে আসার পর টেস্ট করিয়েছি, টেস্ট তো নেগেটিভ। আমার কোনো লক্ষণও নেই, তাহলে কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে?

    ―টেস্টটা সবসময় সম্পূর্ণ নির্ভরযোগ্য নয়। শরীরে ভাইরাস থাকলেও কখনো কখনো নেগেটিভ আসতে পারে। আপনার পরিবারের এবং অন্যদের সুরক্ষার জন্য কোয়ারেন্টাইনে থাকা উচিত। এসব ক্ষেত্রে টেস্ট করার চাইতে বরং কোয়ারেন্টাইনে থাকাই বেশি জরুরি।

    ৭. কোয়ারেন্টাইনে কিভাবে থাকব?

    ―কোয়ারেন্টাইনে থাকা মানে অন্যদের থেকে একদম আলাদা থাকা। আলাদা ঘরে থাকবেন, সেখানেই খাবেন, সেখানেই আলাদা বাথরুম ব্যবহার করবেন। আপনি যেখানে থাকবেন সেখানে আর কেউ ঢুকবে না, দরজা বন্ধ থাকবে। দরজার ওপাশে খাবার দেবে এবং আপনি দরজা একটু খুলে খাবারটা ঘরে ঢোকাবেন। আপনি সেই ঘর থেকে বের হবেন না এবং আপনার ঘরের কোনো জিনিস বাইরে যাবে না।

    ডা. জলধি রায়, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ

    Facebook Comments

    বিষয় :

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২
    ১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
    ২০২১২২২৩২৪২৫২৬
    ২৭২৮২৯৩০৩১