• শিরোনাম

    গল্প :

    গায়েব : সিদরাতুল মুনতাহা রাইসা

    | ০৮ আগস্ট ২০২০


    গায়েব :  সিদরাতুল মুনতাহা রাইসা

    তো গল্পটি শুরু করা যাক আমাদের বাড়িটির বর্ণনা দিয়ে। নানির বাড়ি। তিনি বহু বছর আগেই ইন্তেকাল করেছেন, নানাও তার আট বছর পূর্ণ হওয়ার ঠিক দশদিন আগে ইন্তেকাল করলেন।

    দুইজনের মৃত্যুর মাঝেই একটু হলেও অস্বাভাবিকতার ছোঁয়া ছিল। নানি মারা গেলেন সড়ক দুর্ঘটনায়। এক আত্মীয়ের বাড়ি গিয়েছিলেন সন্ধ্যার সময়ে। ফেরার সময়ে তাদের বাড়ির বাইরের দ্বোরে হোঁচট খাওয়ায় তারা বলেছিলেন,”আপা, একটা বাঁধা যেহেতু পড়েছে,তাহলে আরেকটু বসে যান।” কিন্তু তিনি বলেছিলেন,”না না,বাসায় আমার নাতি আছে।


    নাতি তো আবার আমি ছাড়া অন্য কারো কাছে খেতে চায় না।” এই বলে তিনি তাড়াহুড়ো করে রওয়ানা দিলেন।

    তার সাথে তৎকালীন ছোট কাজের মেয়েটিও ছিল। সাঁঝের অাঁধার,ফাঁকা রাস্তা,চোখের ছানি চিকিৎসা করাতে গড়িমসি করেছিলেন বলে দ্রুতগামী বাসটিকে স্পষ্ট দেখতে পাননি।


    কাজের মেয়েটি কয়েক ইঞ্চির ব্যবধানে অবস্থান করার দরুন প্রাণে বেঁচে গেল আর নানি রাস্তার পাশের চায়ের দোকানদারের ভাষায়’একটি পাখির মতো উড়ে এসে তাদের সামনে অাঁছড়ে পড়লেন।’ এই ঘটনার পর থেকে আমার মা কোথাও হোঁচট খেলে আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে পড়েন এবং ধৈর্য ধরে আরো কিছু মুহূর্ত পূর্বের অবস্থানে অতিবাহিত করার প্রাণপণ চেষ্টা করেন।

    এখন কথা হচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়াটা অস্বাভাবিক কোনো ব্যাপার নয়, কিন্তু নানির মৃত্যুটি অস্বাভাবিক এই কারণে যে এর বিশ বছর আগেই তার ইহকাল ত্যাগ করার কথা ছিল কেননা প্রায় সারাটা জীবনই তিনি নানাবিধ শারীরিক জটিলতায় ভুগেছেন যার দরুন তিনি তার সন্তানদের একাধিক সহোদর উপহার দিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন আর পিতেÍর পাথর ফেঁটে যাওয়ার পর তো চিকিৎসকেরা আশাই ছেড়ে দিয়েছিলেন,অনেকটা অলৌকিকভাবেই সেই বিশটি বছর পাওয়া।


    আমার রন্ধননিপুণা,সূঁচসখী জননী একাধিক কর্মে দক্ষ হলেও গল্প বলায় কখনোই তেমন পারদর্শী ছিলেন না। মূলত সেই কারণেই ছোটবেলায় আমাদের দুই ভাই-বোনকে ভাত খাওয়ার সময়ে হয় নানির মৃত্যুর মর্মস্পর্শী বর্ণনা নতুবা মায়ের জন্মেক্ষণে মা-সন্তানের জীবন নিয়ে রশি টানাটানি খেলায় দুই পক্ষের সমান সমান জয়ের ইতিহাস এবং আমাদেরকে এই অতিমাত্রায় বিচিত্র গ্রহটি অবধি বহনকারীণির অশ্রুশিক্ত বদনছবি হজমি হিসেবে গ্রহণ করতে হতো।

    আর নানির মৃত্যুর পর বহুলোকের জোড়াজুড়িতেও যে নানা আমার নিজের মত থেকে জীবাণুমাত্র সরে আসেননি,তার পক্ষে মৃত্যুর মাস দেড়েক পূর্বে আমাদের টিনের ভাড়ার ঘরের এক সদ্য দ্বিতীয় তালাকপ্রাপ্ত প্রৌঢ়াকে নিকা করার জন্য প্রায় উন্মাদ হয়ে ওঠাটি ছিল নিতান্তই বিচিত্র।

    সকলকে এই ব্যাপারে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত রেখে নানির মৃত্যুক্ষণের অনুরূপ এক সাঁঝের অাঁধারে জামা-কাপড় গুছিয়ে উদ্ভট উন্মাদনাকে সাঙ্গ করে ছুটে গিয়েছিলেন ময়মনসিংহ। বহু খোঁজাখুঁজির পর শেষে মাঝরাতে তাঁর অবস্থান সম্বন্ধে নিশ্চিত হওয়া গেল যদিও তা কীভাবে সম্ভব হয়েছিল,তা এখনো আমার অজ্ঞাতই রয়ে গিয়েছে আর কাউকে এ সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিলেও দ্বিধা এসে গালে লাগায় এক চড়।

    সে চড়ে অবশ্য যন্ত্রণা তেমন নেই,তবে হাত-পা বহুক্ষণ আড়ষ্ট হয়ে থাকে। তো সেই ঘটনার দুই মাস পূর্ব হতেই নানার একটা দৈনিক অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল রোজ সন্ধ্যায় চা পানের সময় সবাইকে তাঁর স্বপ্নের ব্যাখ্যা শ্রবণ করানো। একদিন বলতেন,”রাতে আম্মা এসে বলল, ছদর ,তুই এসে পড়।”

    আরেকদিন হয়তো বলতেন,”শিল্পী,তোর মা বলছিল তাঁর কাছে চলে যেতে। আমাকে তাঁর কবরে কবর দিস।” ময়মনসিংহ থেকে ফিরিয়ে আনার পরপরই খবর এল যে সেই বয়স্ক মহিলা নাকি পাগল হয়ে গিয়েছে,মাঝরাতে পুকুর পাঁড়ে গিয়ে চুল ছেড়ে,শাড়ি খুলে গুনগুন করে,কেউ কাছে গেলেই পানিতে লাফ দেয় আর তারপর পুকুর পাঁড় পুনরায় মানবশূন্য না হওয়া অবধি ডুব দিয়েই থাকে। কাহিনীটি যে সম্পূর্ণ বানোয়াট তা অনুধাবন করতে কাউকে মোটেও বেগ পেতে হয়নি, তারপরও বিবৃতিটি শোনার সাথে সাথেই নানার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ শুরু হয়ে গিয়েছিল পূর্বের কোনো দূরারোগ্য ব্যাধি না থাকার দরুন পরবর্তী দশ ঘণ্টার মধ্যে তাঁর মৃত্যুটি কারো কাছেই সহজভাবে গ্রহণযোগ্য ছিল না। শেষ নিশ্বাসটি ফেলার আগেও তাঁর মুখ থেকে বের হয়ে এসেছিল তিনটি শব্দ-”তোর মায়ের কবরে।”

    তো আমার প্রত্যক্ষ করা আমাদের পরিবারের এই দুটি মৃত্যুর সাথে মূল ঘটনাটির কোনো যোগসূত্র আছে কি না তা সময়ের উপরই ছেড়ে দেওয়াটি শ্রেয় বলে আমার ধারণা। তো ঘটনাটির প্রথম উদয় হয়েছিল এক গ্রীষ্মের কাঠফাঁটা রৌদ্রের দুপুরে। আমাদের গোসল শেষে মা নিজে যথন গোসল করতে গেলেন, সেই সময়টাতে আমরা আট এবং দশ বছর বয়সী দুইটি শিশু ঘরে বসে দুর্দর্শনের পর্দার নানা রোমাঞ্চকর ঝলকানি উপভোগ করছিলাম যেহেতু স্বভাবতই বা্ইরে দৌড়াঁদৌড়ি করে খেলার অভ্যাস আমাদের কারোরই কোনোদিন ছিল না।

    তো যেহেতু আমাদের দ্বিতল বাড়িটির নিচতলায় আমাদের বাস ছিল, কাজেই রান্নাঘরের বাতায়ন দিয়ে হাত বাড়ালেই পাশের টিনের ভাড়া দেওয়া ঘরের বাতায়নের সন্নিকটে বসে থাকা একজন মানুষের অশ্রু মুছে দেওয়া যাবে এই পরিমাণ দূরত্ব ছিল আর মধ্যিখানের সেই স্থানটুকু দখল করতে হলে আমারও নিজেকে অর্ধেক করে ফেলতে হবে অর্থাৎ সে পথে যাতায়াত করার সক্ষমতা ছিল গুটিকতক কয়েকজন মানুষের এবং বিপুল পরিমাণ অন্যান্য জীবের। সে বয়সে আমার মনের দ্বারেও কখনো কখনো বিড়ালের ন্যায় ক্ষুদ্র প্রাণী কিংবা পিপীলিকার ন্যায় ক্ষুদ্র পোকায় পরিণত হওয়ার বাসনা কড়া নাড়ত।

    যদি সেই দুই খিড়কির ফাঁক গলে বাড়ির পেছনের ঝোপটাতে গিয়ে বসে আপন মনে কিছুক্ষণ নিরিবিলিতে চিন্তা করতে পারতাম যেহেতু বাড়ির পশ্চাতে পৌঁছোনোর কোনো বিকল্প পথ সম্বন্ধে আমি জ্ঞাত ছিলাম না। যাই হোক সেদিন মা আমার দুইখানা বিঘতী কই রেঁধেছিলেন যার একটিই আমরা চারজনে মিলে গলা:ধরণ করেছিলাম সেই দুপুরে। স্বভাবতই আমার আর আমার বাবার খাওয়া শেষ করতে বাড়ির বাকি সবার থেকে অধিক সময় ব্যায় হতো চর্বণের ধীরগতির কারণে।

    মায়ের আরো নানাবিধ কাজ থাকার দরুন তিনি খাওয়া শেষে উঠে গেলেন এবং বললেন যদি লাগে, তাহলে যেন আমরা উনুনে অবস্থিত দ্বিতীয় কইটির অংশবিশেষও নিয়ে খাই। তো এরপর বিকেল গেল,সাঁঝ গেল,রাত এলো ,রাতের খাবার খাওয়ার পালা এলো। ভাতের থালায় সাদা ভাতের চারিদিকে মুরগির মাংস,ডাল,বেগুন ভাজা,আঁচারের উপস্থিডু লক্ষ্য করলেও আরেকটি বস্তুর অনুপস্থিতিও অনুভব করছিলাম। মাকে জিজ্ঞেস করলাম সেই দ্বিতীয় কই মাছটিকেও আমরা আমাদের সঙ্গী করে রাতের বেলা উদরমাঝে স্থান দিব কিনা। আমার কৌতুহলী চাহনি প্রত্যক্ষ করে তঁার বিস্ময়াভিভূত প্রতিক্রিয়া আমদের সকলকেই অবাক করে তুলল। মা বললেন উনুনে দ্বিতীয় কই মাছটির অনুপস্থিতি লক্ষ্য করে তিনি খুশি হয়েছিলেন এই ভেবে যে আমরা সেটির সমগ্রটিকে নিজেদের উদরমাঝে স্থান দিয়ে দিয়েছি এবং তাঁর রান্না সার্থক হয়েছে।

    কিন্তু বাস্তবিকই তা ঘটেনি বরং আমরা রান্নাঘরে গিয়ে সেটা আনার ব্যাপারে ভাবিইনি। তো এখন মাছ কোথায় গেল তা নিয়ে দিন তিন-চার যাবৎ যল্পনা-কল্পনা চলতে লাগল। আমাদের রান্নাঘর বরাবর ঘরের পেছন দিকে দেয়ালের উপরে শীতের কাপড়-চোপড়ে ঠাসা। সকলে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী হলেও বাড়ির বড়রা অবধি ধারণা এটি জ্বীনের কাজ যার আস্তানা দেয়ালের উপরের সেই গোমট স্থানটি এবং যার দুই সঙ্গী অাঁধার এবং ধুলো।

    আমার ভীষণ অবাক লাগত যদিও কখনো কখনো ঘুমোতে যাওয়ার পূর্বে দেয়ালের উপরের সেই জায়গাটির দিকে চোখ পড়লেই শিউরে উঠতাম নিজের অজান্তেই। প্রথম ঘটনার ঠিক দিন ছয় পর উবে গেল মুরগির মাংস এবং ঝোল। একই ঘটনার ভিন্ন পুনরাবৃত্তি দেখতে নিশ্চিত হওয়া গেল যে এটি মেছো ভূতের কাজ নয়, এই ভূত আরো পেটুক। সেসময় মেছো ভূতের একটি গল্প পড়েছিলাম ,মূলত সেখান থেকেই মনে জেগেছিল ধারণাটি।

    তারও দিন দুই পরে বিকেলবেলা মা রান্নাঘরের দিকে রওয়ানা হয়েছিলেন । দ্বারকোণ হতেই তাঁর চোখে পড়ল আরেকটি চোখ। ”কে?”বলে চিৎকার দেওয়ার সাথে সাথে উনুনের বিপরীত পার্শ্বের বাতায়নের অপর প্রান্তে দণ্ডায়মান সেই চোক্ষুজোড়ার অধিকারী দিল ঝেড়ে দৌঁড় । মায়ের স্বরযন্ত্রের কম্পাঙ্কের সাথে সাথে যে তার দৌঁড়ের বেগও সমহারে বৃদ্ধি পেতে থাকল, তা সেই সরু পথের বস্ত্র মৃত পত্রের মোচড়ানোর আওয়াজই বলে দিল।

    সেই বিকেলেই ধরা পড়ল আসামী। অবশ্য দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া সাত বছর বয়সী শিশু যার মা-বাবা দুইজনই গার্মেন্টস শ্রমিক,তাকে আসামী বলে সম্বোধন করা ন্যায়সঙ্গগত হবে কি না জানি না। তো যাই হোক, সে হচ্ছে আমাদের টিনের ভাড়া ঘরে বসবাসকারী এক শিশু। তার মা এবং নানি চুলের মুঠি ধরে নিয়ে এসে আমাদের উঠানে অাঁছড়ে ফেলল।

    অনেকটা বাড়িওয়ালাকে দেখানোর মতো করেই কিল-থাপ্পড় মারতে লাগল। শিশুটির নানি তো,”চুরি করলেও করসে,না করলেও করসে।” যে উক্তিটি থেকে বোঝা যায় যে এতে তাদেরও হাত ছিল। তাছাড়াও এতটুকু শিশুর পক্ষে নিশ্চয়ই এত বড় কই মাছ একাই গলা:ধকরণ করতে পারবে না। অতএব রান্নাবান্না গায়েব হওয়ার রহস্যটি অবশেষে প্রকাশ পেল।

    সিদরাতুল মুনতাহা রাইসা
    নবম শ্রেনী, ভিকারুননিসা নুন স্কুল এন্ড কলেজ

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    লাইবার আঁকা ছবি

    ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২০

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২
    ১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
    ২০২১২২২৩২৪২৫২৬
    ২৭২৮২৯৩০৩১