• শিরোনাম

    দরিদ্রতা অভিশাপ- বিষয়ক কথকতা: তপন দেববর্মা

    | ০১ সেপ্টেম্বর ২০২০


    দরিদ্রতা অভিশাপ- বিষয়ক কথকতা: তপন দেববর্মা

    দরিদ্রতা একটা অভিশাপ। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে সরকার প্রতি অর্থবছরেই দরিদ্রতা হ্রাসে ব্যাপক ভিত্তিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়। তবুও দারিদ্র্যের কষাঘাত থেকে রেহায় পায় না দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ দরিদ্র্য জনগোষ্ঠী।

    কেনো এমনটি হয়ে থাকে তা অনুধাবন করতে আমাদের বিশেষ কিছু বিষয়ের দিকে নজর দিতে হবে। কেনো দারিদ্র্যের কষাঘাত থেকে রেহায় পায় না দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ দরিদ্র্য জনগোষ্ঠী? এই প্রশ্নের উত্তরে বলতে হয়,


    এর প্রধান কারণ বাস্তবায়নে মধ্যস্বত্বে অবস্থানকারীদের নৈতিক স্থলন কিংবা আর্থিক তছনছ করার কৌশল জিইয়ে রাখা। যাতে প্রতি অর্থবছর সরকারের এই প্রক্রিয়াতে লাভবানের সুযোগ হাতছাড়া না হতে হয়! সেই সূত্রে, দারিদ্র্য বিমোচন সিদ্ধান্তে অপ্রার্থী হচ্ছে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান।

    দারিদ্র্য ব্যবস্থার সাথে কৃষি উৎপাদন বা প্রক্রিয়ার ব্যাপক যোগ-সাদৃশ রয়েছে‌। আমাদের কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থায় নানান ধরনের ভোগ্য সামগ্রীর উৎপাদন হয় এবং সেটি ভোক্তার চাহিদা অনুযায়ী বন্টন হয়ে থাকে।


    যার কিছু কিছু ভোগ্যপণ্য দারিদ্র্য ভোক্তা শ্রেণীর জন্য বাজারজাত হয় আর কিছু ভোগ্যপণ্য উৎপাদন হয় শুধুমাত্র উচ্চমানের ভোক্তাদের জন্য। এই ব্যবস্থাকে ভোগ বৈষম্য (Discrimination of Consumption) বলা যেতে পারে।

    কারণ আর্থিক সক্ষমতা সবার সমান নয় এবং এই আর্থিক সক্ষমতাই বাজারের শ্রেণীবিন্যাস প্রক্রিয়ার নির্ধারক। অর্থাৎ যার যতো ধন, তার ততো ভোগ।


    কৃষি ব্যবস্থার অন্তর্নিহীত বিষয় হচ্ছে- খাদ্য উৎপাদন। তবে খাদ্য উৎপাদনে এবং দাম নির্ধারণে একটি অদৃশ্য হাত (Invisible Hand) রয়েছে যেটি সামগ্রিকভাবে বাজারের খাদ্য দ্রব্যের অঞ্চল ভিত্তিক দাম নির্ধারণের মূখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে।

    এক্ষেত্রে চিরাচরিত কৌশল হচ্ছে পণ্য-দ্রব্যের সহজলভ্যতা। যে পণ্যের সহজলভ্যতা যতো বেশী সেটির দাম ততোই কম আর দুষ্প্রাপ্য হলে দাম বেশী (Water dimond paradox)। কেননা সহজলভ্যতা হচ্ছে প্রয়োজনীয় দ্রব্যের চাহিদার সমপরিমাণ মূল্য।

    মানব সভ্যতা যতো আধুনিক থেকে আধুনিকতর হচ্ছে ততোই সভ্যতার শ্রেণীবিন্যাস ব্যাপকতা লাভ করছে। কেননা এর প্রধান কারণ হচ্ছে সম্পদের অপ্রতুলতা। এর প্রেক্ষিতে, কম সম্পদের মধ্যেই প্রধান ধনিক শ্রেণীর সভ্যতার অংশীদাররা দরিদ্রদেরকে নিষ্পেস করে চলছে।

    আর জনসংখ্যায় বেশী হওয়া সত্ত্বেও দরিদ্ররা সম্পদের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ ভোগের সুবিধা পাচ্ছে। এই অংশকেই আমরা ‘দরিদ্রতার অভিশাপ’ বলে গালমন্দ করি। এই অংশতে সঞ্চয় প্রবণতা কম কেননা, তাঁদের জীবনমান পরিচালন ভিত্তি নির্ভর করে প্রাত্যহিক বা মাসিক উপার্জনের উপর।

    শিক্ষা ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকারও অন্যতম কারণ এই দরিদ্রতার অভিশাপ।

    সুতরাং এই পুঁজিবাদী ফাঁদ যতোদিন চলবে, দেশও ততোদিন উন্নয়নের বোতলের তলানিতে অবস্থান করবে। বলা যায়, উন্নয়নের গতি এতোই মন্থর যেনো ধীরে বহমান নদী-জলের আচরণের ন্যায়। ফলে বহুদূরে অবস্থান করছে প্রতিক্ষার উন্নয়ন।

    উন্নয়নের এহেন গতিতে আরো পিছিয়ে পড়ছে দেশের খেটে খাওয়া দরিদ্র জনগোষ্ঠী।

    ব্যর্থ হচ্ছে উন্নয়নের সামগ্রিক পরিকল্পনা। পুষ্টি ও স্বাস্থ্যের সংকটে পৃথিবী আজো ধুকছে- কারণ, প্রতিযোগীতামূলক ভোগ-বিলাসে অর্থনৈতিক সংকট থাকায় দরিদ্র্য জনগোষ্ঠীর পুষ্টিমাণ সমৃদ্ধ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ধনিকদের হাতেই তুলে দিতে বাধ্য হচ্ছে। এতে করে স্বাস্থ্যের গড় উন্নয়ন ব্যহত হচ্ছে।

    আয় বৈষম্যেও এক্ষেত্রে স্পষ্টভাবে তা চিত্রায়িত হচ্ছে, যার সমাধানের উপায় নিহিত আছে অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ ব্যবস্থার মধ্যে। অন্যদিকে দেশের সামগ্রিক কর্মহীন ও কর্মজীবীর অনুপাত যদি একটি সহনশীল পর্যায়ে নিয়ে আসা যায় এবং যোগ্য বেসরকারী মাধ্যমে কিছু প্রকল্প সঠিক বন্টন করে দেওয়া যায় তাহলে এই সমস্যার লাঘব সম্ভব বলে আমাদের বিশ্বাস।

    তপন দেববর্মা
    প্রাক্তন শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    দেশ এগিয়ে গেছে বহুদূর

    ১৮ জানুয়ারি ২০২১

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫১৬
    ১৭১৮১৯২০২১২২২৩
    ২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
    ৩১