• শিরোনাম

    দেবযানীর বাড়ি : আনন্দময়ী মজুমদার

    | ১৯ জুলাই ২০২০


    দেবযানীর বাড়ি : আনন্দময়ী মজুমদার

    ভোর পাঁচটায় আমি আধা তন্দ্রার মধ্যে একটা স্বপ্ন দেখেছি। দেখলাম দেবযানীকে। দেবযানী আমার বন্ধু। সে রবীন্দ্রনাথের কবিতা অনুবাদ করে। আমার ধারণা মেয়ে বলে সে এতটা ভালো অনুবাদ করতে পারে। দেবযানী বিশ্ববিদ্যালয়ে রিসার্চ করে আর পড়ায়। আর খুব ভালো আঁকে। ওর রং আমি না বুঝলেও, ওর আঁকা ভালো লাগে। ও রঙের মধ্যে রেখাও ব্যবহার করে।

    তো স্বপ্নে দেখলাম দেবযানী আমাকে একটা বিশাল ছবির প্যাকেট খুলে একটা ছবি বের করে দেখাচ্ছে। ছবির রং-এ আমার চোখ আটকে গেল। গ্রামের একটা মাটির বাড়ি। বাড়িটার রং বর্ষার আকাশের মতো তামাটে নীল। চাল বোধহয় গেরুয়া বা রাঙা। বাড়ির ওপর অনেক ছায়া পড়েছে অথবা বাড়ির নিজস্ব অবয়বের ওপর ফুটে উঠেছে অনেকগুলি কালো স্ট্রোক।


    হতে পারে কয়দিন ধরে রামকিংকরের জলরং ছবি দেখছি, যেখানে জল-রং-এর ওপর কালো কালো তুলির টান রেখার মতো লাগে, যা আমাকে টানে। তাই হয়ত বাড়িটা আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম।

    বাড়ির নিচে মাটি বা ওপরে আকাশ এসব কোনো চিহ্ন নেই। আশেপাশে কোনো গাছ নেই, সামনে কোনো বাগান নেই। বাড়িটার জানলা অথবা দরজা অথবা দাওয়া অথবা শিশু অথবা মানুষ অথবা চোখ নেই। শুধু রং ধারণ করে বাড়িটাই আছে। রংগুলো সুন্দর। আমি তাকিয়ে থাকলাম। আর দেবযানী আমাকে বলতে লাগল, এরিজোনা মরুভূমির মধ্যে এই ইন্ডানথ্রন ব্লু আর পোড়া মাটির রং-এর মিশ্রণে ছবিটা কতো সুন্দর দেখাবে।


    ওর সঙ্গে আমার এরিজোনায় দেখা হয়েছিল। আমেরিকার সবচেয়ে শুকনো রাজ্য হল এরিজোনা। এখানে আকাশ খুব স্বচ্ছ, মেঘ খুব উঁচুতে থাকে। সূর্যাস্তগুলি বন্যার মতো মাইলের পর মাইল ছড়িয়ে থাকে, মনে হয় আলোর সমুদ্র ফেটে যাচ্ছে। এমন সূর্যাস্ত দেখাও ভাগ্যের। আমি যখন ‘ছোট্ট রাজপুত্র’ অনুবাদ করেছিলাম, মনে আছে সেখানে ছোট্ট রাজপুত্রের সূর্যাস্ত দেখতে ভালবাসত। আমি তখন এরিজোনায় দেখা আমার অসংখ্য সূর্যাস্ত এক করে একটা ছবি বানাতাম মনে মনে। তারপর অনুবাদ করতাম।

    আমি কোনো দিন কারো কাছে কিছু চাইতে পারি না। সারা দিন খেতে না দিলে আমি প্রশ্ন করতে যাই না। এটা আমার একটা বেকুব জন্মগত অভ্যেস। অন্যদের বিব্রত বা বিরক্ত করতে আমার অস্বস্তি হয়, হয়ত নিজেও বিব্রত হবার জ্বালা অনুভব করেছি বলে। তাই বাড়িটার ছবি ভালো লাগলেও বলতে পারলাম না। যে, একবার দিও তো, ছবির দোকানে একটা ফোটোকপি করে বাধিয়ে রাখব ইত্যাদি। দেবযানী নিজেই বলে যেতে লাগল সে ছবিটা তার ডাইনিং ওয়ালে কীভাবে রাখবে, কেমন দেখাবে, রং কতো সুন্দর ইত্যাদি।


    আসার সময় ওর অনুবাদের কথা মনে পড়ছিল। এই সময় আমি একটা অন্যমনস্ক হয়ে ছিলাম। তাই হয়ত শক্ত ইটের রাস্তার ওপর আচমকা পড়ে গেলাম, দুটো ইট আলগা হয়ে গিয়েছিল অন্ধকারে দেখতে পাইনি। আমার কপালের দুটো জায়গা ফুলে ঢিপি হয়ে গেল। আর সেই সঙ্গে আমার মনে হল আমার মাথা জুড়ে অনেকগুলো ছুরি আমাকে চিরে ফেলছে।

    সেই যন্ত্রণা ভুলে থাকার জন্য আমি বাসায় ফিরে ঋতুপর্ণ ঘোষের বই ‘ফার্স্ট পার্সন’ থেকে রবিবাসরীয়-তে লেখা তার নিয়মিত কলাম পড়ছিলাম। বইটা আমাকে অণু দিয়েছে পড়তে। সেখানে লোকটার নৈর্ব্যক্তিক আর ব্যক্তিক ছবিগুলো এত সুন্দর মিশে গেছে, যে আমার এই টেকনিকে আঁকা শিখতে ইচ্ছে করছিল। ঋতু একটা ছবি নিয়ে তার শিরায় স্নায়ুতে কীভাব হাত দিয়ে ডাক্তারের মতো বলে দিতে পারে কোথায় কোন নীলের পোঁচ পড়েছে, সেটা দেখে আমার খুব মন খারাপ হয়ে গেল। ঋতু নেই।

    আমার মাথা আর কপাল বসে গিয়ে দুইপাশের শিরা দেখা যাচ্ছিল যা কখনো হয় না। আমার মাথা যন্ত্রণা করছিল। আমি হুহু করে কাঁদতে লাগলাম। হতে পারে আমার প্রিয় কিছু মানুষ কয়দিনের মধ্যে চলে গেছেন। চারিদিকে চলে যাবার সংবাদ। আমি কাঁদবার এক্সকিউজ খুঁজছিলাম। যা আমি কখনো করি না, সেই এক হাঁটুজলে দাঁড়িয়ে আমি কাঁদতে লাগলাম। লুই ক্যারলের এলিসের মতো আমি ডুবে যেতে লাগলাম।

    আমার ছেলে দীপ্র আমার পাশে এসে দাঁড়াল। আমি বললাম, ভয় পেও না। কান্না মানে দুর্বল হয়ে যাওয়া না। সাহস করে কাঁদতে খুব কম জন পারে, এখন শরীরটা খারাপ তাই কান্না সহজ হয়ে গেছে। শরীর সুস্থ হতে চাইছে। তুমিও চাইলে কাঁদতে পারো। সে কোনো কথা না বলে আমার হাত ধরে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকল। সে হয়ত বুঝতে পারল না আমি কী বলছি। কাতর স্বরে জানাল তারও পেটে এরকম ব্যথা করে ইত্যাদি। আমার মা-বাবা এলেন। মা আমাকে জড়িয়ে ধরলেন, পিঠে হাত বুলিয়ে দিলেন, কোনো প্রশ্ন করলেন না। বাবা আমাকে একটা ঘুমের ওষুধ দিলেন। বললেন, অর্ধেকটা খেতে। আমি অভয় দিয়ে বলতে লাগলাম, এই সময় কান্নাই জরুরি, ইত্যাদি। আমার নিজের কান্নার শব্দে আমার ঘুম ভেঙে গেল তখন। আমি কপাল ছুঁয়ে দেখলাম। কপাল বেঢপ হয়ে দুটো জায়গায় ফুলে আছে। মাথার পেছনে একটা ছুরি চলে যাবার যন্ত্রণাও টের পেলাম। দীপ্রর দিকে চোখ গেল। দেখি ও দুটো পায়ের পাতা জড় করে ঘুমিয়ে আছে।

    আনন্দময়ী মজুমদার

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫১৬
    ১৭১৮১৯২০২১২২২৩
    ২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
    ৩১