• শিরোনাম

    বাজেট নিয়ে ভাবনা।মোঃ সরওয়ার হক চৌধুরী

    | ১২ জুন ২০২০


    বাজেট নিয়ে ভাবনা।মোঃ সরওয়ার হক চৌধুরী

    সরকারী দল বলবেন গণমূখী বাজেট, বিরোধী দল বলবেন গণবিরোধী বাজেট। বাজেট বিবৃতি যে দু’পক্ষরই রাজনীতির সুরে বাঁধা, তা বর্ণনা করার প্রয়োজন নেই। মাঝখানে সাধারন মানুষ কিছুটা বুঝে কিছুটা না বুঝে মুচকি হাসে এবং পক্ষ নেয়। তবে অনুভব করতে পারে ষোলআনা।

    করোণাকালে সারা বিশ্বে একধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয় চলছে। তাই কেহ কাউকে তেমনটা সহযোগিতা করতে পারবে না। তাই আমাদের অনাধ অর্থনীতির সংকট সময়ের পরিক্রমায় বৃদ্ধি পাচ্ছে। অর্থনীতির এ অবস্থার মধ্যে সামাজিক শান্তি বিরাজ করতে পারে না। তাই এ কথা আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি আগামী দিনগুলো অর্থনীতির জন্য অনেক কঠিন সময় আসছে। সুস্থ মস্তিস্কে সংকটকে অস্বীকার করার প্রবৃত্তি মানুয়ের মাঝে সাধারণতঃ না থাকাই ভাল, এ ধরনের প্রবৃত্তি মানুষ নিজে নিজেকে ধ্বংস করার সামিল। কিছু মানুষ দুঃসময়ে দিব্য নিশ্চিন্ত থাকবেন এবং ভাববেন যে, কিছুটা সময় অতিবাহিত হলে সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে যাবে, অর্থনীতি আবার ফিরে আসবে, অবারও রাজনীতি নামের যে ব্যবসা বা কারবার তা শুরু করতে পারবেন। অর্থনীতি সমিতি বলেছেন, দেশের মানুষের ৭৯ হাজার টাকা মাথাপিছু ঋণ রয়েছে। অথচ ৯৮ শতাংশ মানুষ এ ঋণ গ্রহন করেন নি। কিন্তু দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে এই ৯৮ শতাংশ মানুষকেই যে কোনভাবে এই ঋণ পরিশোধ করতে হবে। যে টাকা দিয়ে বালিশ কান্ড ঘটেছে, বড় বড় স্যাররা বিদেশ ভ্রমণ করেছে, গাড়ি কিনেছে, বাড়ি কিনেছে, মানি লন্ডারিং এর ঘটনা ঘটিয়েছে সেই টাকা আমার দেশের গরিব প্রান্তিক মানুষকেই পরিশোধ করতে হবে। শহরের গরিব মানুষ এবং প্রান্তিক দরিদ্র জনগোষ্ঠির মাঝে কাজ করার সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে নগদ অর্থ সরবরাহ করা গেলে বাজারে চাহিদা বৃদ্ধি পেত। বাজারে চাহিদার অভাব প্রতি মূহুর্ত পরিলক্ষিত হচ্ছে। কারণ এ দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি কঠিন আর্থিক সংকটের মধ্যে রয়েছে। যেহেতু সাধারন মানুষের আয় প্রায় অনিশ্চিত, সেহেতু বাজারে চাহিদার অভাব রয়েছে, সেক্ষেত্রে সহজলভ্য ঋণের মাধ্যমে অর্থনীতির স্বাস্থ্য পুনরায় ফিরিয়ে আনা খুবই কঠিন কাজ। ১১ই জুন ২০২০ অর্থমন্ত্রী আ. হ. ম. মুস্তফা কামাল ৫ লক্ষ ৬৮ হাজার কোটি টাকার দেশের ৪৯তম প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করেন। প্রস্তাবিত বাজেটে যে সকল পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাবে সেগুলো হলো – অনল্ইান খাবার, অনলাইন কেনাকাটা, বিদেশী টিভি, আয়রন, স্টিল, স্ক্রু, কমপ্রেসার শিল্পে ব্যবহৃত উপকরণ, আলোকসজ্জা সামগ্রী, বার্ণিশ, বাইসাইকেল, আমদানী করা অ্যালকোহল, গাড়ি রেজিস্ট্রেশন খরচ, গাড়ি, শ্যাম্পু, আমদানী করা দুধ, দুগ্ধজাত পণ্য, ইন্টারনেট চার্জ, মোবাইলে কথা বলার উপর কর বাড়ানোয় মোবাইল খরচ, চকলেট, বিদেশী মোটর সাইকেল, বডি ¯েপ্র, সোডিয়াম সালফেট, সিগারেটের যে চারটি স্তর রয়েছে তার মধ্যে তিনটি স্তরের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে অন্য দিকে একটি স্তরের দাম অপরিবর্তিত রেখেছে, সব ধরনের প্রসাধন সামগ্রীর উপর সম্পূরক শুল্ক ৫% হতে ১০% বৃদ্ধি করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলশ্র“তিতে এ ধরনের পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাবে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত লঞ্চ সার্ভিসের মুসক দ্বিগুণ অর্থাৎ ১০% করার প্রস্তাব করেছেন। সম্পূরক শুল্ক ৫% হতে ১০% বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে চাটার্ড বিমান ও হেলিকপ্টার ভাড়ার উপর। দেশে যে সকল আসবাব – পত্রের বিপনন কেন্দ্র রয়েছে সেগুলোর উপর মুসক ৫% হতে ৭% বৃদ্ধি করা হয়েছে। রঙের মূল্য বৃদ্ধি পাবে।


    প্রস্তাবিত বাজেটে যে সকল পণ্যের দাম কমবে, সেগুলো হলো – চাল, ডাল, চিনি, পিয়াজ, রশুন, মাস্ক, গ্লোভস, ঔষধ, স্বর্ণ, হস্তচালিত কৃষি যন্ত্রপাতি, ডিটারজেন্ট পাউডার, ইলেক্ট্রিক্যাল যন্ত্রপাতি, আইসিইউ যন্ত্রপাতি, কৃষি যন্ত্রপাতি, পোল্ট্রি, ডেইরী, মৎস শিল্পে ব্যবহৃত উপকরণ ইত্যাদি। স্বাস্থ্যখাতের বিভিন্ন পণ্যের উপর শুল্ক ও কর ভার কমানো এবং রাজস্ব আয় বৃদ্ধি করতে এবং বিলাস সামগ্রীর উপর মানুষের ব্যয় নিরুৎসাহিত করার জন্য অনেক পণ্যে শুল্ক ও কর ভার বৃদ্ধি করার প্রস্তাব করেছে। স্বাস্থ্যখাতে ২৯ হাজার ২৬৬ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। সোলার বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুবিধার্থে এবং ব্যবহার উৎসাহিত করার জন্য সোলার মেশিনের ৬০ এএমপি পর্যন্ত ব্যাটারী কিনতে মুসক অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। দেশে উৎপাদিত সরিষার তেলের উপর মুসক অব্যাহতি দেয়ার জন্য সরিষার তেলের দাম কমার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্ব মহামারীর কারণে করোণাকালে দেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি হিসেবে থাকছে কৃষি। দেশের কৃষি অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষিখাতে উলে­খযোগ্য হারে বরাদ্দ বৃদ্ধি করেছে। ২০১৯ – ২০২০ অর্থবছরে কৃষিখাতে মোট বরাদ্দ ছিল ১২ হাজার ৯ শত ৫৭ কোটি টাকা। এবারের বাজেটে ২০২০ – ২০২১ অর্থবছরে বরাদ্দ বৃদ্ধি করে ১৫ হাজার ৪ শত ৪২ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। যা টোটাল প্রস্তাবিত বাজেটের ৫.৩ শতাংশ। কৃষকের জন্য ঋণ সুবিধাসহ প্রণোদনা থাকবে।

    আমাদের সাংবিধানিক অধিকার হলো খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা। কৃষিখাত থেকে এই ৫টি চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। আগামী ২০২০ – ২০২১ অর্থবছরে শিক্ষাখাতে প্রস্তাবিত বরাদ্দ হলো ৬৭ হাজার ৫৭ কোটি ৬২ লক্ষ টাকা। ১০ শতাংশ কর দিয়ে কালো টাকা সাদা করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এতে করে অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনের তীব্র আকাঙ্খা তৈরি হবে। প্রস্তাবিত বাজেটে এ ধরনের সিদ্ধান্ত মানুষের নৈতিক দৃঢ়তা বিনষ্ট করবে। বর্তমান সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকার। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত পারদর্শিতা এবং সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছেন। সেই সরকারের বাজেটে ইন্টারনেটের মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাব সত্যিই দুঃখজনক। করোণাকালের এই দূর্যোগ মূহুর্তে অনলাইন ক্লাস খুবই জনপ্রিয়। সেক্ষেত্রে লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী চরম বিপাকে পড়বে। আমার মনে হয় এক্ষেত্রে সরকারের বিবেচনা করা উচিত। বাচ্চাদের সুষ্ঠু বিকাশে দুধের বিকল্প নেই। আমদানী করা গুড়ো দুধ এবং দুগ্ধজাত দ্রব্য সাধারণতঃ শিশুরাই বেশি পছন্দ করে। উত্থাপিত বাজেটে আমদানী করা গুড়ো দুধ এবং দুগ্ধজাত দ্রব্যের উপর যে মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে তা সত্যিই দুঃখজনক। আমাদের শিশুরা হয়তো জানবেও না, বুঝবেও না তাদের খাদ্য দুধের এবং দুগ্ধজাত দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। তাই অভিভাবক হিসেবে আমাদের সবার দায়িত্ব আমাদের শিশুরা যেন থাকে “দুধে-ভাতে” এ বিষয়টি নিশ্চিত করা। প্রস্তাবিত বাজেটে এ বিষয়টি বিবেচনা করার জন্য সবিনয় নিবেদন করছি। প্রান্তিক জনগোষ্ঠির বাজেট নিয়ে মাথাব্যাথা নেই তবে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম নাগালের মধ্যে হলেই হলো। প্রস্তাবিত বাজেটে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা আছে কিনা অনেকের প্রশ্ন। করোণা ভাইরাসের এই দূর্যোগ মূহুর্তে বাজেট বাস্তবায়ন যে সত্যিই চ্যালেঞ্জের তা সবার কথার মাঝে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।


    মোঃ সরওয়ার হক চৌধুরী


    সাংবাদিক ও সাহিত্যিক

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    দেশ এগিয়ে গেছে বহুদূর

    ১৮ জানুয়ারি ২০২১

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫১৬
    ১৭১৮১৯২০২১২২২৩
    ২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
    ৩১