• শিরোনাম

    গল্প :

    বাসাংসি জীর্ণানি / দেবাশিস লাহা

    | ২৯ জুন ২০২০


    বাসাংসি জীর্ণানি / দেবাশিস লাহা

    “কী দেখছ এমন করে?”

    “দেখছি না, ভাবছি।”


    “কী ভাবছ?”

    “মনুষ্য প্রজাতি যুগপৎ এইরূপ সুশ্রী এবং কদাকার হয় কীরূপে!”
    “আবার সাধু ভাষা ! কিছুই বুঝলামনা।”
    “এই যে তুমি এত সুন্দর, আর আমি এত—”
    “আবার শুরু করলে। কতবার বলেছি এসব ভেবনা। বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য দিয়ে মানুষ বিচার ! মননে মেধায় তুমি অতুলনীয় । আমার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি। তুমি ওথেলো, আমি ডেসডিমোনা। বুঝলে ?”


    আফটার শেইভ লাগানোর পর আর একবার আয়নার দিকে তাকাল অতনু। এই জাতীয় মুহূর্ত ছাড়া আত্ম প্রতিকৃতি দেখার প্রয়োজন পড়েনা। ইচ্ছেও জাগেনা। তবে এই মানব সৃষ্ট প্রতিফলকটির সামনে যতবারই দাঁড়িয়েছে, ইন্দ্রাণীময় হয়ে ওঠা দিনগুলিই ভিড় করে এসেছে। একাডেমি চত্ত্বর ছুঁয়ে জন্ম নেওয়া সেই সব অবিশ্বাস্য বিকেল। হতকুচ্ছিত মানুষটাকে আত্মবিশ্বাস দেওয়ার উদ্দেশ্যেই যেন ওদের জন্ম হয়েছিল। এক ছাত্রীর বিয়েতে আলাপ। পাত্রীর বান্ধবী। ইংরাজি সাহিত্যের অধ্যাপক হয়ে অতনু তখন সদ্য কলেজে । বয়সের ফারাক অনেকটাই। প্রায় বারো বছর। সেটা অবশ্য বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। পেশা নয় অতনুর কবিত্বই ইন্দ্রানীকে আকর্ষণ করেছিল। বছর খানেকের প্রেম। তারপর বিয়ে। কিন্তু কিছুতেই মাথায় ঢুকছেনা তৃতীয় বিবাহ বার্ষিকীর সাত দিন আগে এই আন্ডার কনস্ট্রাকশন আপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ে ওরা শিফট করল কেন? “এ” ব্লকে দু একটি পরিবার পজেশন নিলেও “সি” ব্লকে ওরা ছাড়া আর কেউ নেই। লিফট তো দূরের কথা, কমন প্যাসেজের দেওয়াল পর্যন্ত প্লাস্টার হয়নি। একটা যুক্তি অবশ্য দিয়েছিল। মাত্র আধ ঘন্টার দূরত্বে অতনুর কলেজ। শ্রীরামপুরের বাড়ি থেকে যা প্রায় দু ঘন্টার পথ। তিন কূলে কেউ নেই। ভয়াবহ এক গাড়ি দুর্ঘটনায় বাবা মা দুজনকেই হারিয়েছে। অতনুর তখন ক্লাস সিক্স। মামার অভিভাকত্বেই বেড়ে ওঠা। সেই অকৃতদার স্বজনটিও বছর পাঁচেক আগেই গত হয়েছেন। তবু বাবা মার স্মৃতি জড়ানো বাড়িটা বিক্রি করতে চায়নি। কিন্তু ইন্দ্রাণীর যুক্তির কাছে হার মানতে হল।
    “বুঝি অতনু। কিন্তু উপায় কি? ভাড়া দেওয়ার হাজার সমস্যা। কার মনে কি আছে বলা যায়!
    কিন্তু এতগুলো টাকা! কোন কাজে লাগবে? আমাদের তো কোনো সন্তানও হলনা।”

    “হয়নি। কিন্তু হতে কতক্ষণ? যত টাকাই হোক, খরচ করা কোনো সমস্যা হল? তেমন হলে ফরেন টুর করব। প্যারিস, ভেনিস, সুইজারল্যান্ড!”


    অতনু আর কথা বাড়ায়নি। ঠিকই তো বিদেশ ভ্রমণের চেয়ে আকর্ষণীয় কিছু হয় নাকি! ফ্ল্যাটটাও মন্দ নয়। খুব নিরিবিলি। জানালা খুললেই গঙ্গা। বাইরের প্লাস্টার যখন হয় হবে। ইন্টেরিয়র বেশ ভালই । পূজার পরেই নাকি সব ঝাঁ ঝকঝকে হয়ে যাবে।

    “ইন্দু, তোমার হল? আমি কিন্তু রেডি। দাড়িও কেটে নিলাম। এবার শেভিং কিটটাও লাগেজে ঢোকাব। এটাই শেষ আইটেম। রাত নটার ফ্লাইট। ছটা তো বেজেই গেল।”

    ওরা সুইজারল্যান্ড যাচ্ছে। তৃতীয় বিবাহবার্ষিকীতে অতনুর উপহার। আল্পসের বুক ছুঁয়ে স্বপ্নের মধুচন্দ্রিমা। এক মাসের ট্যুর। পূজার ছুটিটা ইউরোপেই।

    “কী হল। তুমি কি টয়লেটে? সাড়া দিচ্ছ না কেন?”

    কোনো উত্তর নেই। টয়লেটের দরজা বাইরে থেকে আটকানো। গেল কোথায় মেয়েটা! শয়ন কক্ষের দিকে এগোতেই মূল দরোজাটি খুলে গেল। নির্ঘাত হাওয়া।

    “একী,দরজাটা বন্ধ করনি ? তুমিও কি আমার মত অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছ ! একী কে ওখানে? কাকে চাই ?”

    কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটা শব্দ। বিস্ফোরণের মত। কিন্তু অস্ফুট, চাপা। ইন্দ্রাণী যখন পাবদা মাছ ভাজে, রান্নাঘর থেকে এমন আওয়াজই ভেসে আসে। কিন্তু বুকটা এমন জ্বলে উঠল কেন? চারদিকে তরলের স্রোত। চটচটে, আঠালো।সূর্যাস্তের চেয়েও লাল। কতদিন বাদে নিজের রক্ত দেখছে অতনু? মেঝের উপর গড়িয়ে পড়ার পরও মনে করার চেষ্টা করল। সংসার শুরুর প্রথম দিন। ইন্দ্রাণীকে আদর কববে বলে খুব যত্ন করে দাড়ি কাটছিল। খোঁচা খোঁচা স্টাবলে ওর ভারি কষ্ট হয়। মুহূর্তের অন্যমনস্কতায় গলগলিয়ে রক্ত। পাগলের মত ছুটে এসেছিল। কিন্তু এখন তো অনেক বেশি রক্ত। তবু ও কেন ছুটে আসছেনা?
    “ইন্দু! কোথায় তুমি! ইন্দু—-”

    যন্ত্রণাটা বেড়েই চলেছে। ঝাপসা হয়ে আসা সেন্টার টেবিলের পাশে ঝাঁ ঝকঝকে ট্রাভেল ব্যাগটাও ক্রমশ আবছা। অতনু কি দৃষ্টি হারাচ্ছে? না, ওই তো ঢাকের আওয়াজ। মহাষষ্ঠীর বোধন। মায়ের আঙুল ছাড়িয়ে প্যাণ্ডেলের দিকে ছুটতে থাকা ছেলেটাই কি অতনু?
    “ইন্দু, তুমি কোথায়? আমি যে হারিয়ে যাচ্ছি—-”

    বাহ, এই তো! আর যন্ত্রণা নেই। কেমন একটা ফুরফুরে ভাব। চারদিকে শুধু আলো আর আলো। অতনু কি পাখি হয়ে গেল? নাকি ফ্লাইট টেক অফ করেছে!

    ওই তো ছেলেটা।আহা, কী চেহারা! দীর্ঘ দেহ । মাথা ভর্তি কোঁকড়ান চুল। টি শার্টের হাতায় গ্রিসিয়ান ভাস্কর্য। ওর এক ছটাক রূপও যদি অতনুর থাকত! ওই তো ইন্দ্রাণী! এতক্ষণ তবে এখানেই ছিল! কিন্তু ছেলেটাকে এভাবে জড়িয়ে ধরেছে কেন? কী আশ্চর্য ! এই দৃশ্য দেখার পরও অতনুর এক বিন্দু ঈর্ষা হচ্ছেনা। অথচ দুদিন আগেও চ্যাট করার অপরাধে একটি ছেলেকে যাচ্ছেতাই ভাষায়—– কিন্তু ও কাঁদছে কেন? খুব ইচ্ছে করল চোখ মুছিয়ে দেয়। এই তো! হাত বাড়ালেই ছুঁয়ে ফেলবে। কিন্তু একী! আঙুল কই। চরম বিস্ময় নিয়ে নিজের দিকে তাকাল। এ কেমন ভোজবাজি! আঙুল তো দূরের কথা, হাতদুটোই ভ্যানিশ। তারপর শুধু তন্নতন্ন করে খুঁজে চলা । নিজেকেই নিজে! না, কিছুই নেই। হাত পা মাথা মুখ, চিবুক সব কিছুই উবে গেছে। আলো ছাড়া কিছুই অবশিষ্ট নেই।

    ইন্দু তুমি কেঁদনা প্লিজ। এই তো আমি!
    একবার। দুবার। তিনবার। কই, ইন্দু তো কোনো উত্তর দিচ্ছেনা।

    ইন্দু! এই ইন্দু! এই তো আমি।

    না, কোনো সাড়া নেই। ড্রয়িং রুমের মেঝেতে অন্যরকম একটি নদী। চিত হয়ে পড়ে থাকা একটি মৃতদেহ থেকেই তার জন্ম হয়েছে। কিন্তু আকস্মিকভাবে জন্ম নেওয়া এই লোহিত প্রবাহটি কোনদিকে যাবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছেনা। মোহনার দিকে ছুটে চলা রক্তরেখার উৎসটি দেখেই বুঝতে পারল ও আক্ষরিক অর্থেই অতনু হয়ে গেছে। রূপরসগন্ধ স্পর্শহীন এক উজ্জ্বলতা । দেহহীন, তনুহীন। শস্ত্র যাহাকে কাটিতে পারে না, অগ্নি যাহাকে পোড়াইতে পারে না, জল যাহাকে পচাইতে পারে না, বায়ু যাহাকে শুষ্ক করিতে পারে না । রূপরসগন্ধস্পর্শের বিপ্রতীপে এমন এক জগত যেখান থেকে কখনও ফিরে আসা যায়না।কিন্তু কী আশ্চর্য ! হাত পা চোখ চিবুক সব হারিয়ে গেলেও স্মৃতি আছে ! কবিতাও ওকে ছেড়ে যায়নি ! তাই কি নিজের মৃতদেহটিও প্রিয় কবির কথা মনে করিয়ে দিল ?

    মৃতেরা এ পৃথিবীতে ফেরে না কখনও। মৃতেরা কোথাও নেই; আছে?

    পৃথিবীর ঘাস পাতা, নদ নদী, এমনকি সদ্য কেনা ট্রাভেল ব্যাগের হাতলটিতেও অতনুর কোনো অস্তিত্ব লেগে নেই। অথচ স্মৃতি আছে।ফেলে আসা পৃথিবীর সুবাস, ইন্দ্রাণীর সঙ্গে অতিবাহিত প্রতিটি মুহূর্ত। দৃষ্টিও তো লোপ পায়নি। ওই তো ওরা চ্যাংদোলা করে ওকে কোথায় যেন নিয়ে যাচ্ছে। অভিমুখ দেখে মনে হচ্ছে স্টোর রুম। ইন্দ্রাণী পায়ের দিক, আততায়ীর হাতে মাথা। ছেঁচড়ে যাওয়া হাতদুটো বড়ই অপ্রাসঙ্গিক, হাস্যকর । ওরা কি কখনও অতনুর ছিল ? হয়ত ছিল। নইলে প্রবহমান লোহিতের স্রোত ওদেরকেও কেন ছুঁয়ে ফেলবে ? উদ্বৃত্ত আঙুলদুটিতেও চাপ চাপ রক্ত।

    “ওমা, অদ্ভুত তো ! তোমার হাতে ছটা করে আঙুল।”

    “কেন এই প্রথম দেখছ ? আমার তো সব কিছুই অদ্ভুত !”

    “ধুত্তেরি ! আবার শুরু করলে। আমি ভাবছি অন্য কথা !”

    “কী কথা ?”

    “তুমি কখনও হারিয়ে যেতে পারবেনা। আমার জ্বালায় যদি কখনও নিরুদ্দেশও হয়ে যাও, কাগজে বিজ্ঞাপন দিলেই কেউ না কেউ খুঁজে দেবে। এমন আইডেন্টিফিকেশন মার্ক কজনের আছে বলো ! বড় বড় হরফে লিখে দেব—
    “বি.দ্র. নিরুদ্দিষ্ট ব্যক্তিটির হাতে ছটি করে আঙুল।” ব্যাস কেল্লা ফতেহ !”

    সেই ইন্দ্রাণীই এখন সব চিহ্ন মুছে ফেলতে চাইছে। ও কি কখনও ভেবেছিল ঘর মোছার ন্যাতায় জল নয়, রক্ত লেগে থাকবে ! হ্যামলেটের কথা মনে পড়ল।

    এ মহাবিশ্বে এমন অনেক কিছুই আছে, হোরেশিও যা তুমি কল্পনাও করতে পারবেনা।

    হ্যামলেট না হয় হোরেশিওকে বলেছিল, কিন্তু অতনু ? অতনু কাকে বলবে ? কার সঙ্গে ভাগ করে নেবে এই অমল উপলব্ধি ? অতনুই বা কোনটি ? স্টোর রুমে পড়ে থাকা লাশ না পাখির মত উড়তে থাকা আত্মা ?
    মোছামুছির কাজ শেষ। ঝকঝকে মার্বেলে এক বিন্দুও রক্ত লেগে নেই। কে বলবে ঘন্টা খানেক আগেই এখানে একটি মানুষ খুন হয়েছে !যাক, ছবিটা পরিষ্কার হল। এত আপার্টমেন্ট থাকতে ইন্দ্রাণী কেন এই পাণ্ডব বর্জিত ব্লকটিকেই বেছে নিয়েছিল। এক ডজন মানুষকে গুলি করে মারলেও কেউ টের পাবেনা। রিভলবার হাতে ঢুকে পড়া আততায়ীটিও ওর পরিচিত। প্রেমিক বলেই মনে হচ্ছে। অর্থাৎ নিখুঁত পরিকল্পনা করেই ওকে হত্যা করা হয়েছে। মানুষই পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণি। তথ্যটি অজানা ছিলনা। কিন্তু এমন উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত যে ওর গেরস্থালিতেই লুকিয়ে ছিল, কল্পনাও করেনি। তবু তিক্ততার লেশমাত্র নেই। ক্ষোভ তো দূরের কথা। বরং সুগভীর এক কৃতজ্ঞতা ! মৃত্যুই ওকে এমন উদার করে তুলেছে। প্রিয় কবির সুরে সুর মিলিয়ে বলতে ইচ্ছে করছে– মরণ রে, তুঁহু মম শ্যাম সমান ।
    কিন্তু স্টোর রুমে পড়ে থাকা লাশটা ? সে কে ? কী তার পরিচয় ? সে কতটা অতনু ? নিছকই কি ছায়া ? কি করছে সে ? এখনও কি রক্ত ওগরাচ্ছে ? দেখে আসবে নাকি ! এই ভেবে সেই অপার্থিব আলোটি স্টোর রুমের দিকে উড়ে গেল।

    ওই তো! এখনও তনুময় ! তবে প্রাণহীন, স্রোতহীন। রক্তক্ষরণ বন্ধ হলেও টি শার্ট ভেদ করে জেগে থাকা বুলেটের ক্ষতটা এখনও দগদগে। নশ্বর অতনু ঘুমিয়ে পড়েছে।জমাট বাঁধা রক্তে মাছির আনাগোনা।

    ইতিউতি আসবাব, পরিত্যক্ত সামগ্রীর ভিড়।মাথার কাছে ভাঙা টেবিলের পায়া। পায়ের কাছে প্লাস্টিকের মগ। জানালায় আধ খাওয়া চাঁদ। থ্যাবড়া নাকের উপর শুধু সে-ই হাত রেখেছে।

    এই ঘুম চেয়েছিল বুঝি! রক্তফেনামাখা মুখে মড়কের ইঁদুরের মতো ঘাড় গুঁজি আঁধার ঘুঁজির বুকে ঘুমায় এবার—

    জীবনানন্দ । আট বছর আগে একদিন। কতবার যে আবৃত্তি করেছে। মঞ্চে, শ্রেণিকক্ষে। প্রিয় ছাত্রছাত্রীদের অনুরোধে। তবে কবিতার অর্থও তো বদলায়। পরিবর্তনশীল জীবনের রঙ মেখে সে-ও এক অনিবার্য প্রিজম।রহস্যময়ী, বহুমাত্রিক। মধ্যাহ্নের ছায়া দেওয়া গাছটিই তো রাত্রির অন্ধকার গাঢ়তর করে। নিজের মৃতদেহের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে অতনুর মনে হল এই ঘুমই সে চেয়েছিল। কদাকার, কুশ্রী বেঁচে থাকার চেয়ে ঢের ভাল এই ঘুম। বুলেটের ক্ষতে কেবল রক্তক্ষরণই হয়না, অবিরল স্রোতের সঙ্গে বেরিয়ে আসে কাম, ক্রোধ, মোহ, মাৎসর্যের পূতিগন্ধময় পাঁক। ঘোরের অন্ধকার ভেদ করে উঁকি মারে অঘোরের আলো। হ্যাঁ, এই ঘুমই চেয়েছিল অতনু। বেঁচে থাকার অন্তহীন ভার কি কম রক্ত ঝরিয়েছে ?
    “I fall upon the thorns of life! I bleed!” এ কি কেবল শেলির উপলব্ধি ? অতনুর নয়? তার চেয়ে ঢের ভাল এই রক্তক্ষরণ। চাঁদ ডুবে চলে যাওয়ার পর ইন্দ্রাণীর ঠোঁট থেকে রক্ত মুছতে মুছতে অতনুই তো লিখে ফেলেছিল–

    জীবন যে কেনো এমনতর হয়;
    পাখির ঠোঁটে নিভৃত খড়কুটো–
    মৃত্যুর মতো অকৃপণ কেউ নয়,
    বিন্দু চাইলে দিয়ে যায় মুঠো মুঠো —

    না, ওটা অতনু নয়। হতে পারেনা। স্টোর রুমের অন্ধকারে শুয়ে থাকা লাশটা নিছকই এক ছায়া। আকাশ ছুঁয়ে উড়ে বেড়ানো আলোটিই অতনু।

    আত্মারও কি স্মৃতি থাকে? হয়ত থাকে। পূর্ব জন্মের স্মৃতি নিয়ে জন্মানো মানুষকেই তো জাতিস্মর বলে। নিজের মৃতদেহের দিকে তাকিয়ে অতনুরও কি তাই ক্লাস লেকচারের কথা মনে পড়ছে? টি এস এলিয়ট, ওয়েস্ট ল্যান্ড, উপনিষদের অনুসঙ্গ। ভগবত গীতার এই অমৃতবানী!

    মানুষ যেমন জীর্ণ বস্ত্র পরিত্যাগ করে নতুন বস্ত্র পরিধান করে, দেহী ও তেমন জীর্ণ শরীর ত্যাগ করে নতুন দেহ ধারন করে….

    রক্তে ভেজা লাশটা ছিঁড়ে যাওয়া পোশাক মাত্র। অতনু তাকে বর্জন করেছে। তবে ও আর কখনও জন্মাতে চায়না। কখনই না।

    “কেন এই আত্মপ্রবঞ্চনা অতনু ? তুমি কি সত্যিই আর জন্মাতে চাওনা ? তবে সুদর্শন আততায়ীর রূপে মুগ্ধ হলে কেন ? যদি সুন্দর কোনো আচ্ছাদন পাও ? তবুও ফিরবেনা ?”

    সন্নিকটে একটি আলো। না, নিছক আলো নয়, আলোকবর্তিকা। লক্ষ নক্ষত্রের জ্যোতি দিয়ে যিনি মহাকাশ আলোকিত করেন, সেই পরমাত্মা। তাঁর তে্জটিই অনুরণন হয়ে উঠেছে। দৈববাণীর মত।

    “না প্রভু। জীবন মৃত্যুর মাঝে ঝুলে ছিলাম বলে পার্থিব ক্লেদ তখনও পিছু ছাড়েনি। এখন আমি মুক্ত, নিষ্কাম।”

    “কিন্তু দেহ না থাকলে ছোঁবে কি করে?”

    উদ্বৃত্ত আঙুল ছিল আমার। তবুও তো ওকে ছুঁতে পারিনি। অযুত হাতেও কি শূন্য ছোঁয়া যায় ?

    ২]

    “আমার ভীষণ ভয় করছে পলাশ!”

    “কিসের ভয় ইন্দু ? সব তো প্ল্যান মাফিক এগোচ্ছে।”

    “শিট ! আবার ইন্দু! কতবার বলেছি আমাকে ওই নামে ডাকবি না! ঘেন্নায় গা রি রি করে !”

    “সরি রে। বার বার ভুল হয়ে যায়। নামটা তো আমারই দেওয়া।সেই ক্লাস নাইন। সদ্য ফ্রক ছেড়ে শাড়ি ধরেছিস। কি করে জানব যাকে বিয়ে করবি, সেও তোকে এই নামেই ডাকবে। যাক শোন ! মাথা ঠাণ্ডা রাখ। তোর জন্য হাজারটা খুন করতে পারি। বিনা প্রশ্নে। অতনুর ক্ষেত্রেও তোকে কোনো প্রশ্ন করিনি। শুধু বলেছিস ভালবাসিস, তাই পালাতে চাস। এইটুকুই যথেষ্ট। তোদের ফ্লাইট যেন কটায়?”

    “নটায়।”

    “তার মানে আর পঞ্চাশ মিনিট পর তোরা টেক অফ করছিস। কয়েক ঘন্টার মধ্যেই সুইজারল্যাণ্ড। সত্যিটা শুধু তুই আর আমি জানি। আর জানবে এয়ার ইণ্ডিয়া। তাতে কোনো সমস্যাই নেই।কারণ অনেক প্যাসেনজারই ফ্লাইট মিস করে। অতনুর তিন কূলে কেউ নেই। পরিচিত বলতে কলিগ আর ছাত্রছাত্রী। তাও গুটিকতক। তুই-ই বলেছিস ও যথেষ্ট আনসোশ্যাল। বন্ধু বান্ধব নেই বললেই চলে। যে কজন আছে তারা নিশ্চয় ফরেন ট্যুরের ব্যাপারটা জানে। ফোনে না পেলেও চাপের কিছু নেই। বেড়াতে গেলে অনেকেই সুইচড অফ রাখে। অর্থাৎ হৈ চৈ শুরু হবে এক মাস পরে যখন ও কলেজ জয়েন করবেনা। এখন পুজোর বাজার। যে যার মত ব্যস্ত। আর তোদের ফ্ল্যাটে – নিশ্চিন্ত থাক ! কেউ মরতেও আসবেনা। ছক কষেই খোঁজটা দিয়েছিলাম।”

    “ঠিক বলেছিস। সবে সাতদিন । কাজের মাসির ঝামেলাও নেই। কিন্তু তবু যদি কেউ চলে আসে ?”

    “মানে ? কে আসতে পারে ?”

    “না বলা তো যায়না।”

    “সেটাও তো ঠিক হয়ে আছে। আমি দরজা খুলব। বলব কেয়ার টেকার। তোরা ট্যুরে বেরিয়েছিস। তেমন পরিস্থিতি হবে বলে মনে হয়না। ভোর হওয়ার আগেই তো পগার পার ! কেউ টিকি পেলে তো !”

    “পগার পার ? কেন ? কোথায় যাব আমরা?” ইন্দ্রাণীর গলায় অদ্ভুত একটা কাঁপুনি।

    সে কিরে ! সাত কাণ্ড রামায়ণের পর সীতা রামের মাসি ? পারিস বটে ! পেট্রাপোল বর্ডার দিয়ে বাংলাদেশ। ঢাকাতে এক রাতের হল্ট। তারপর সোজা দুবাই। নতুন নাম, নতুন পরিচয়। আখতার ভাই সব সেটিং করে রেখেছে। শুধু মাল্লুটা ঠিকঠাক দিতে হবে। রেডি আছে তো ?

    মাল্লু ! তোর ভাষা এখনও ঠিক ঠাক বুঝিনা রে পলাশ।

    আরে মাল্লু ! মাল। মানে টাকা। লাখ পাঁচেক। বলেছিলাম তো। রেডি আছে তো ?
    মাত্র পাঁচ ! তার চেয়ে অনেক অনেক অনেক বেশি ! কত চাই ! হা হা হা !

    ইন্দ্রাণী হাসছে ! অট্টহাসি। ক্ষমতার ঔদ্ধত্যে যেভাবে রাজাধিরাজ হেসে ওঠেন। না, অভিধান বর্ণিত সেই গগনবিদারী নিনাদ নয়। স্বেচ্ছা বৈধব্যকে আমন্ত্রণ জানানো নারীর হাসিটিকে পৃথিবীর বলে মনেই হলনা।কোলরিজ রচিত কুবলাই খান থেকে যেন সেই “ডেমন লাভার” রমণীটি বেরিয়ে পড়েছে। অতিপ্রাকৃত হয়ে ওঠা সন্ধেটা কি তবে পৃথিবীর অধিকারে নেই? হকচকিয়ে যাওয়া পলাশ এক লাফে দাঁড়িয়ে পড়ল। কিন্তু এগোতে পারলনা। এলোচুলে ঢেকে যাওয়া চিবুক। গম রঙা গালে সিঁদুরের ধ্বংসাবশেষ। না, চক্রবর্তী রাজার অট্টহাসি নয়, এ হাসি উন্মাদিনীর !যার কক্ষচ্যুত আঁচলটি প্রতি মুহূর্তেই আগুনের জন্ম দিয়ে চলেছে । নিজেকে পতঙ্গ মনে হল। নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও যে তার বধ্যভূমি্টির দিকেই নির্নিমেষ চেয়ে থাকে । মন্ত্রমুগ্ধ অবস্থাটা কতক্ষণ চলত কে জানে। চড়া রিং টোনটা ওকে আবার বাস্তবে ফিরিয়ে আনল।

    “একি! তুই ফোন সুইচড অফ করিসনি ? ধরবি না। আগে দেখ কার কল।”

    আচমকা আওয়াজে ইন্দ্রাণীও হকচকিয়ে গেছে। তবে স্বাভাবিক হতে সময় লাগলনা। খুব সন্তর্পনে সেলটা হাতে তুলে নিল।

    “মা ! ধরব ?”

    “দাঁড়া দেখি কটা বাজে। আটটা দশ। বল চেক ইন করছিস। ল্যাণ্ড করার পর কল ব্যাক করবি।”

    “ওকে। মা আমরা চেক ইন করছি। এখন কথা বলা অসম্ভব। পরে কল ব্যাক করব।”
    “বেশ। এবার সব ফোন সুইচড অফ করে দে। অন বোর্ডে যেমন হয়”।

    “তুই জানলি কি করে ?”

    “হা হা হা ! কি ভেবেছিস ! ফ্লাইটে চাপিনি ? শিক্ষিত ভদ্রলোকের চাইতে অশিক্ষিত অ্যান্টি সোশ্যালরা এখন অনেক বেশি এয়ার ট্রাভেল করে, বুঝলি। যাক তোর কি শরীর খারাপ লাগছে ?”

    “না, তো, একদম ঠিক আছি”।

    “না, যেভাবে হেসে উঠলি ! হাত পা রীতিমত কাঁপছিল !”

    “সেটা কি স্বাভাবিক নয় ? দু ঘন্টা আগেও যে মানুষটা বহাল তবিয়তে ছিল, ইউরোপ ট্যুরের প্যাকিং করছিল, পৃথিবী থেকে তার অস্তিত্বটাই মুছে গেছে। তোর আপনজন হলে কি করতিস ! ছাড়, তুই তো আবার সুপারি কিলার।”

    বুকে যেন শেল বিঁধল । হৃদপিণ্ডের ভিতর লোহার শিক ঢুকিয়ে দিলেও এমন যন্ত্রণা হতনা। আন্ডার ওয়ার্ল্ডের রথী মহারথীরাও ওকে সমঝে চলে। ঘন্টা মিত্তিরের সঙ্গে পাঙ্গা নিলে কি দশা হয় বা হতে পারে, সবাই হাড়ে হাড়ে জানে। অন্ধকার জগতে ওর একটিই পরিচয়—ঘন্টা। কার কখন ঘন্টা বাজবে, ঘন্টা মিত্তিরের বিলিতি চেম্বারই ঠিক করে দেয়। অথচ ইন্দ্রাণীর সামনে ও এখনও সেই ক্লাস নাইনের পলাশ। বিন্দুবাসিনী বালিকা বিদ্যালয়ের দিকে তাকিয়ে থাকা বিস্ফারিত চোখের এক কিশোর। ইন্দ্রাণী মানেই তো একটা উন্মাদনা। অমোঘ, অপ্রতিরোধ্য। এখনও– —–

    “গালিগালাজের জন্য সারা জীবন পড়ে আছে। কোলে মাথা রেখে না হয় সে সবই শুনব। এখন একটাই কাজ। নিজেকে শক্ত রাখা। দু ঘন্টা আগে কী ঘটেছে, ভুলে যা। আমি বরং কফি বানিয়ে আনি। তারপর গল্প। চুপচাপ থাকলেই সমস্যা বাড়বে।”

    প্রশ্রয়ের হাসি হেসে পলাশ যেভাবে রান্নাঘরের দিকে হেঁটে গেল, পরিষ্কার বোঝা গেল, আগেও এই ফ্ল্যাটে ঢুকেছে। অবশ্যই অতনুর অনুপস্থিতিতে। দু মগ কফি বানাতে বড় জোর মিনিট পাঁচেক। বেড রুমে ঢুকেই চমকে উঠল। একি ! কোথায় গেল মেয়েটা ! বেড়ে যাওয়া হৃৎস্পন্দনে আশঙ্কার পদধ্বনি। অন্য সময় হলে হয়ত খেয়ালই করতনা। কিন্তু এখন প্রতিটি মুহূর্তই —

    “এই তো আমি ব্যালকনিতে। নদী দেখছি। জানিস পলাশ, এই সময় ও একদৃষ্টে নদীর দিকে চেয়ে থাকত। ডিনার সার্ভ করে শুধু ডেকেই যেতাম। কে শোনে কার কথা !”
    ———
    “কি গো, খাবার দিয়েছি তো। বাব্বা ! হাঁ করে নদী দেখা হচ্ছে ! তিন দিনেই এত প্রেম !”

    “তিন দিন ! হা হা হা ! আমাদের বাড়িটাই তো নদীর ধারে, ইন্দু। শ্রীরামপুর ঘাট থেকে পাড় বরাবর দশ মিনিট। বাবার হাত ধরে যেদিন প্রথম নদীর কাছে গিয়েছিলাম, প্রবহমান জলধারা লক্ষ করে উনি কী বলেছিলেন জানো !নদী তুমি কোথা হইতে আসিয়াছ ? কার লেখা বলো তো ?”

    “জানিনা তো”।

    “জগদীশচন্দ্র বসু। অব্যক্ত। নদী জিনিষটা কী অদ্ভুত তাইনা ইন্দু ? এই যে জল দেখছ, কাল সে ছিলনা। কেবল স্রোতটিই আবহমান। নদী খাতটিকেই আমার নদী বলে ভুল করি।

    স্বেচ্ছাচারী আসলে সময়, তুই না;
    এত ছুঁই তবু কতদিন তোকে ছুঁইনা,
    জল আছে তবু জল হয়ে তুই দেখনা,
    কালকের নদী আজকের নদী এক না !”
    ——-
    “কবি ! হা হা হা ! আমাকে ল্যাঙ মেরে শেষে তুই কবিকে বিয়ে করলি। তা বেশ। কিন্তু মারলি কেন ?”

    “দেখ পলাশ, তোকে আমি বন্ধু ছাড়া অন্য কিছু ভাবিইনি। ল্যাঙ মারার প্রশ্ন উঠছে কি করে ! যতটুকু বন্ধুত্ব সেটাও স্কুল পর্যন্ত। তারপর তুই যেদিকে টার্ণ নিলি, ছি, ভাবতেই পারিনা ! তোর সাথে প্রেম ! হা হা হা !”

    “হ্যাঁ যেমন বলিসনি, স্পষ্ট করে না-ও তো বলিসনি। আমার মত একটা হ্যাণ্ডু ছেলেকে বাদ দিয়ে এমন হতকুচ্ছিত দেখতে—আমি তো ওরাং ওটাং ভেবেছিলাম”।

    “মুখ সামলে কথা বল পলাশ। যে লোকটা আর পৃথিবীতেই নেই – মানুষের ভেতরটাই আসল।”

    “সরি, এই নে, কফি। ঠাণ্ডা হয়ে গেলে পানসে লাগবে। যাক, আমার চেহারা তোকে কখনও টানেনি, সড়কছাপ গুণ্ডা বলে কথা। কিন্তু এত সুন্দর ভেতরওয়ালা কবি অধ্যাপক ! তাকে এভাবে !”

    আগুনটা মুহূর্তেই নিভে গেল। গাঢ় অন্ধকারে পেঁচার ডাক। তবু ম্রিয়মাণ নক্ষত্রালোক ইন্দ্রাণীর কুঁচকে যাওয়া মুখ এঁকে ফেলল।

    “লোকটা ভেতরে আরও কুচ্ছিত ! টপ টু বটম পার্ভার্টেড ! কবিতা শুনিয়ে টরচার করত। কিল চড় ঘুষি তো ডালভাত ! বেল্টও বাদ যায়নি ! উফ ! কী বীভৎস ‍ ! এর নাম ভালবাসা ! থুঃ !”

    ৩]

    “সুরঞ্জনা, ঐখানে যেয়োনাকো তুমি,
    বোলোনাকো কথা ঐ যুবকের সাথে;
    ফিরে এসো সুরঞ্জনা ,
    নক্ষত্রের রুপালি আগুন ভরা রাতে;
    ফিরে এসো এই মাঠে, ঢেউয়ে;
    ফিরে এসো হৃদয়ে আমার;
    দূর থেকে দূরে – আরও দূরে
    যুবকের সাথে তুমি যেয়ো নাকো আর।
    কী কথা তাহার সাথে—–

    বল কী কথা ? ইউ স্পয়েল্ট বিচ ! গডড্যাম হার্লট ! বেশ্যা !”

    “এসব কি বলছ অতনু ! বিয়ের ছমাসও হয়নি।এর মধ্যেই ! ছি ! তুমি কি মানুষ !”

    “বল কার সঙ্গে সিনেমায় গেছিলি। কী কথা থাকে তোদের ? এই রুদ্র তোর কে হয় রে ? নিশ্চয় নাগর ! ফোন তোলার নাম নেই ! হারামজাদি !”

    “উফ, আর মেরোনা প্লিজ ! আমি যে মরে যাব অতনু। বলছি, সব বলছি। রুদ্র আমার পাড়াতুতো ভাই। একসঙ্গে মানুষ । খুব ভালবাসে আমায়। আমার তো নিজের ভাই নেই। তোমাকে কল করেছিলাম, বিশ্বাস কর। ঢুকলনা।”

    “আবার মিথ্যে কথা ! চেকনাই চামড়া দেখলেই লালা ঝরে তাইনা ! মর শালি !”

    “ওরে বাবারে , মরে গেলাম ! তোমায় পায়ে পড়ি অতনু। আর কখনো এমন করবনা। মাথা ঠাণ্ডা কর প্লিজ। তুমিই আমার সব। এসো, আমার চোখে চোখ রাখ ! দেখ, শুধু তুমি আর তুমি ! কেউ কোত্থাও নেই !”
    ———

    সত্যিই কেউ নেই। দুঃখ নেই, যন্ত্রণা নেই, অনুতাপ নেই। পার্থিব ক্লেদ, গ্লানি থেকে অনেক অনেক দূরে এই অমৃতলোক। কেবল আলো আছে, কান্তিময় আলো। আর আছে স্মৃতি ! নির্লিপ্ত, নির্নিমেষ। বিমল এক সত্যের মত সে-ই কেবল পিছু নিয়েছে।
    কখনও বোঝেনি ও এতটা পজেসিভ। অন্তত বিয়ের আগে। ইন্দ্রাণীর কোনো ছেলে বন্ধুকেই সহ্য করতে পারতনা। সুদর্শন হলে তো কথাই নেই। শুধু কি তাই ? বিয়ের পর চাকরি করতে চেয়েছিল। নামী ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে সুযোগও পেয়েছিল। অতনুই বেঁকে বসে। বাপের বাড়িতে যাওয়ারও ছাড়পত্র ছিলনা। অনেক সাধ্য সাধনার পর বড় জোর দু দিন। অথচ এবেলা গেলে ওবেলাই ফিরে আসা যায়।
    “তোমাকে চোখের আড়াল করতে ভাল লাগেনা, ইন্দু। কলেজ থেকে ফিরে দেখতে পাবনা ভাবলেই বুকটা কেমন করে ওঠে। প্লিজ আমাকে ছেড়ে যেওনা”

    “দূর বোকা। আমি কি একেবারে ছেড়ে যাচ্ছি ? এই ধর যদি কাজে কম্মে কোথাও যাই”—

    “না, কোত্থাও যাবেনা। গেলে আমাকে নিয়ে যাবে। এক সঙ্গে ঘুরব, শপিং করব।”

    “সারাদিন কলেজে থাক। আমার যে দম বন্ধ হয়ে যায় অতনু।”

    “কেন, আমাকে ফোন করবে।”

    “তুমি তো ক্লাসে থাকো”।

    “সব সময় কি ক্লাস থাকে ? বেশ আমি তোমাকে ক্লাস রোটিনটাই দিয়ে দেব। অফ পিরিয়ডে কল করবে।”

    সবই মেনে নিয়েছিল। অতনুকে না নিয়ে কোথাও বেরতনা। বাজার হাটও একসঙ্গে। অতনুর কবিতার ওই প্রথম পাঠক। দিন রাতের প্রতিটি মুহূর্তই অতনুর সমার্থক হয়ে উঠল। কিন্তু এতেও রেহাই মেলেনি। এবার চোখ পড়ল মোবাইলে।

    “এত ফেসবুক কর কেন ? দেখি কার মেসেজ।”

    “কোথায় করি। তুমি যখন কলেজে থাক, তখনই একটু আধটু। তাও তো তোমার কবিতাই পোস্ট করি। টাইপ করতে কত সময় যায় ! তুমি থাকলে বেশ হত। আমি শুধু শেয়ার করতাম।”

    “ফেসবুকে আমি থাকব ! ডিসগাস্টিং ! যত সব ফালতু সময় নষ্ট। কই দেখালে না তো ?”

    “কী দেখাব ? তোমার মেসেঞ্জারে কারা এত মেসেজ করে, দেখব না ?”

    “এটা কিন্তু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে অতনু। প্রাইভেসি বলে একটা ব্যাপার আছে।”

    “প্রাইভেসি মাই ফুট !”

    “একী, মোবাইলটা কেড়ে নিলে কেন ? দাও বলছি !”

    “নিশ্চয় দেব।আগে প্রাইভেসির নমুনাগুলো দেখি”।

    ইনবক্স দেখতেই মাথা গরম হয়ে গেল।

    “ হাই, সেক্সি ! ইউ আর সো হট !”

    “এরা কারা ইন্দু ?”

    “চিনিনা তো। ফেসবুকে এমন হাজার মেসেজ আসে”।

    “খুব চালাক হয়ে গেছিস না ? পাত্তা না দিলে সাহস পায় কিরে ? তুই তো আবার আবার স্মাইলি মেরে উত্তর দিয়েছিস। ডিসগাস্টিং বিচ !”

    “প্লিজ অতনু। বোঝার চেষ্টা কর। উফ অসহ্য। আমি আর তোমার সঙ্গে থাকতে পারবনা”।

    “কি বললি ! এত বড় সাহস ! আমাকে ছেড়ে যাবি ? দাঁড়া মজা দেখাচ্ছি !”

    বিচ্ছেদের সামান্যতম ইঙ্গিতও অতনুর মাথায় আগুন জ্বালিয়ে দেয়। বেশ বুঝতে পা্রে ওর মধ্যে দু দুটো সত্ত্বা—একটি আলো, আরেকটি অন্ধকার; ডক্টর জেকিল এবং মিস্টার হাইড।একজন উদার, অহিংস, মহান। আরেকজন জন হিংস্র, পাশবিক, স্বার্থপর। স্টিভেনশন সৃষ্ট এই দ্বিতীয় চরিত্রটিই কি ওর জীবনের নিমেসিস হয়ে দাঁড়াবে ? প্রিয় নারীটির মুখ লক্ষ্য করে যে বেল্ট চালিয়ে দিল, সে-ই কি মিস্টার হাইড ? হয়ত তাই। আঘাতের পর আঘাত। । কপাল, চিবুক, ঠোট ! কিন্তু কী আশ্চর্য ! নারীটির মুখে কোনো শব্দ নেই। নেই কোনো যন্ত্রণার অভিব্যক্তি। সেদিন থেকে ইন্দ্রাণী আর কাঁদেনি। কিন্তু কেন ? হয়ত অপেক্ষা। অতনু একদিন বদলে যাবে। আসমুদ্র অশ্রু শুকিয়ে যাওয়ার পর সে-ই তো থাকে। অপেক্ষা কার নেই ? হলুদ নদীর জলে চাঁদ পড়ে গেলে, মৃতদেহও ভেবে নেয় পূণর্জন্ম হবে !

    না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিল। অতনুও কিছু মুখে তোলেনি। জনপদ ক্রমশ নীরব। ম্রিয়মাণ ফ্লোরেসেন্টে পথ কুকুরের জলসা। জুট মিলের অন্ধকারে শেয়ালের ডাক। এরপরও ঘুম আসে ? আসেনা বোধহয়। শুধু ভান করা যায়। চোখ বন্ধ করে বুঝিয়ে দিতে হয় নিদ্রিত হওয়ার মূল শর্তটিই কেবল পালিত হচ্ছে। এসময়েই রক্ত মুছতে হয়। আদরে আদরে ভরিয়ে দিতে হয় ক্ষতস্থানের হাঁ। প্রথমে ঠোঁট, তারপর চিবুক, তারপর গাল ও কপাল। তারপর লাল হয়ে ওঠা। আসমুদ্র রুমাল জুড়ে শুধু রক্ত আর রক্ত। কিন্তু ভালোবাসার অধ্যায়গুলি তো এখানেই থেমে থাকেনা। বেল্টের বিপরীতে ব্লেড জেগে ওঠে। অতনুই বা কেন ব্যতিক্রম হবে। ডান হাতে ব্লেডটা ধরতেই, বাঁ হাতের কব্জিতে দীর্ঘ এক সরলরেখার জন্ম হয়। অকৃপণ অবগাহনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে আর একটি রক্তের ধারা ! অতনু চেয়ে থাকে। অবিচল, অনিমেষ। আহ কী তৃপ্তি !
    “দণ্ডিতের সাথে দণ্ডদাতা কাঁদে যবে সমান আঘাতে, সর্বশ্রেষ্ঠ সে বিচার”

    ৪]

    “ও কি সত্যিই মরে গেছে ?”

    “কেন সন্দেহ আছে ? আর একবার না হয় দেখে আয়।”

    “মাত্র একটা গুলি ! বলা তো যায়না হয়ত বেঁচে আছে।”

    “নিশ্চিন্ত থাক। জায়গামত লাগলে একটাই যথেষ্ট।”

    “আচ্ছা ও যদি আবার জেগে ওঠে ? পৃথিবীতে তো কত অলৌকিক ঘটনা ঘটে।”

    “মানে ভূত ! হা হা হা ! আমাকে ভয় দেখাচ্ছিস ? কোনো লাভ হবেনা। কত লাশ ফেলেছি। অন্তত ডজন খানেক ভূত। তবে এই প্রথম বিনা পয়সায়।”

    “ছি !তুই এত রুড ! কত সহজে মানুষ মারার গল্প করে যাচ্ছিস।! অনুতাপ হয়না ?”

    “একটুও না। আমি না মারলে অন্য কেউ মারত। এক্সপায়ারি ডেট বুঝিস? আমি বরং পূণ্যের কাজ করেছি। সবচেয়ে কম কষ্ট দিয়ে ভোগে পাঠানোর রেকর্ডটা এখনও আমার, বুঝলি। পয়েন্টে টার্গেট করি। কয়েক সেকেণ্ডেই খালাস। আমি রাজি না হলে তুই অন্য কাউকে খুঁজে নিতিস। অথবা অন্যভাবে মারতিস।খাবারের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে। সেটা আরও যন্ত্রণাদায়ক হত। তবে আমি ভাবছি—”

    “কী ভাবছিস ?”

    “ভাগ্যিস তোর ছেলেপেলে হয়নি। কিন্তু তিন বছর বিয়ে। না হওয়াটাই অস্বাভাবিক!”

    টেবল ল্যাম্পের আলোটা ক্রমে ভুতুড়ে হয়ে উঠছে। দেশলাইয়ে কাঠি ঠোকার শব্দ। পলাশের ঠোঁটে ঝুলে পড়া কিং সাইজ। আর মাত্র তিন ঘন্টা। আখতারের ফোন এলেই বেরিয়ে পড়বে। তারপর লং ড্রাইভ। ইন্দ্রাণীকে ছোঁয়ার ইচ্ছেটা তীব্র থেকে তীব্রতর। কত দিনের অপেক্ষা। দশ দশটা বছর। যেন একটা যুগ। সত্যিই কি এসব ঘটছে ? অপেক্ষা কি শেষ হতে চলেছে ? বাবলার মুখটা এখনও ভেসে ওঠে ! কী মারটাই না মেরেছিল !অথচ ওর কোনো দোষ ছিলনা।

    —–

    “চল ওস্তাদ, মস্তি করে আসি। লেটেস্ট আইটেম । একেবারে ডবকা মাল !”

    “কিসের মস্তি বে ?”

    “সোনাগাছি গুরু, নীলকমলের দোতলায়। চার নম্বর ঘর। আজই চালান হয়েছে।”

    “এই বাঞ্চত ! ক্যাসেট বন্ধ কর। নইলে খালাস করে দেব। ঘন্টা লাশ ফেলতে পারে কিন্তু যেখানে সেখানে ইয়ে মারাতে যায়না। ছুঁলে একজনকেই ছোঁব।”

    ——-

    জব্বর ভয় পেয়েছিল বাবলা। লাইনে নতুন বলে পলাশের কোড অফ কনডাক্টটা অজানা ছিল। হাত পা ধরে ক্ষমাও চেয়েছিল। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি।

    প্রার্থিতা সেই নারীটিকে এখন হাত বাড়ালেই ছুঁয়ে ফেলা যায়। কিন্তু না। পলাশ অপেক্ষা করবে। ভালবাসা এবং ইন্দ্রাণীর মাঝখানে এখনও একটা মৃতদেহ। ওকে দূরে নিয়ে যাবে পলাশ। অনেক, অনেক দূর। যন্ত্রণাহীন, মৃত্যুহীন এক জগত। যেখানে ভালবাসা ছাড়া আর কোনো কিছুরই অস্তিত্ব নেই। তারপর–

    “ও খুব চাইত জানিস। বাবা হওয়ার কী সুতীব্র আকাঙ্ক্ষা ! কিন্তু আমিই হতে দিইনি।”
    টেবিল ল্যাম্পের ওপার থেকে একটা স্বগতোক্তি।

    “কিন্তু কেন ?”

    “বাঁধা পড়ে যেতাম যে। তাছাড়া ওর মত আর একটা শয়তান জন্মালে ? বলা যায় ! সে হয়ত আরও কদাকার, আরও নৃশংস কিছু হত।”

    বড় করে ধোঁয়া ছাড়ল পলাশ। তারপর একটা রিং ! একটু একটু করে উর্ধ্বগামী হওয়া সেই আবর্তের দিকে তাকিয়ে ভাবল ওর সন্তানও কি অ্যান্টি সোশ্যাল হবে ! একমেবাদ্বিতীয়ম সুপারি কিলার ‍! কে জানে ! ও তো বাবার মত হয়নি ! চলন্ত ট্রেনের সামনে পড়ে যাওয়া একটা বাচ্চাকে বাঁচাতে গিয়ে গৃহ শিক্ষক বাবা—তারপর যা হয় ! দারিদ্র, অনাহার, বোনের টিউশন ফি– সংসারের জোয়ালটাই কাঁধে এসে পড়ল— তারপর—তারপর—

    “লুকিয়ে লুকিয়ে পিল খেতাম। পটেনশিয়াল ডেটগুলো প্রাণপণে এভয়েড করতাম। কখনও মাথাব্যথা, কখনও ক্লান্তি। ও কখনও জোর করতনা। তবু একবার কিভাবে যেন— খুব ভয় পেয়েছিলাম। কিভাবে যে এবর্ট করেছি, সে আমিই জানি। নেহাত চেনা ডাক্তার। তবু প্রথমে রাজি হননি। ফার্স্ট ইস্যু তো। উফ, কী বাঁচা যে বেঁচেছি !”

    ৫]
    “এই ইন্দু, ঘুমিয়ে পড়লে নাকি ?”

    “না, বলো। শুনছি।”

    “এই যে এমন আদর করলাম। এর ফল কি ইতিবাচক হবে ?”

    “মানে ? মাঝে মাঝে এমন হেঁয়ালি করনা !”

    “উঁহু। খুব সহজ। বলো ছেলে হবেনা না মেয়ে ?”

    ইন্দ্রাণীর বুকে অতনুর মুখ। শীতার্ত বেড়ালছানা যেন ওম খুঁজে বেড়াচ্ছে।

    “আদর করার সময় যা দুষ্টু হয়ে যাও, নির্ঘাত ছেলেই হবে।”

    “তাই ? বেশ তো ! আমি কিন্তু নাম ঠিক করে রেখেছি। তনুময়। আর মেয়ে হলে তনুশ্রী।”

    অতনুর চোখে অদ্ভুত একটা আলো।

    “যাহ, এমন নাম কেন ? আমি তো ভেবেছিলাম প্রথম অক্ষরের সঙ্গে মিলিয়ে রাখব। এই যেমন অমর, অভীক, মেয়ে হলে অতসী। তুমি তো দেখছি তনুতেই আটকে আছ।”

    “সে তুমি বুঝবেনা । অতনু মানে নিশ্চয় জান ! যার তনু অর্থাৎ দেহ নেই। আমার তো থেকেও নেই। তাই এমন নাম দিতে হবে যাতে আমাদের সন্তান যেন আমার মত কদাকার না হয়।”

    “আবার ! ইউ আর সিমপ্লি হোপলেস ! কতবার বলেছি এই ফালতু ব্যাপারটা থেকে বেরিয়ে এসো।”

    “সরি ভুল হয়ে গেছে। কিন্তু এত দেরি হচ্ছে কেন ? আমি কবে বাবা হব ইন্দু ?”

    “আমি কি করে বলব ! যখন হওয়ার হবে। ঘুমোও তো !”
    ——–
    অতনু নামের আলোটি এখন ইন্দ্রাণীর চিবুকে। যে তিলটি দেখে তিল তিল করে মরে যাওয়ার সাধ জেগেছিল তার ঠিক উপরে। হামলে পড়া চুলের এপাশে যেখান থেকে ভুরুর বক্ররেখাটি শুরু হয়েছে, সেখানে এখনও ভালোবাসার ক্ষত। আলোটা উপরে উঠছে। চিবুক থেকে গাল, গাল থেকে চোখ, চোখ থেকে কপাল। অতনু কি আবার ওকে ছুঁতে চাইছে ? না বোধহয়। এই ছোঁয়াছুঁয়ি খেলার ওপারেও কিছু রক্তমাংস থাকে। এম্বাসেডরের পেছনের সিটে থেঁতলে যাওয়া বাবা মা-ও তো আসলে রক্ত মাংসেরই পাণ্ডুলিপি। স্বাদে গন্ধে বর্ণে হয়ত একটু অন্যরকম। মাথার উপর থেকে ছায়া হারিয়ে গেলে যে বিপন্নতার জন্ম হয়, সে তো অতনুরই প্রতিবেশী। জন্মাবে ভেবেও যার জন্ম নেওয়া হলনা সেও কি এখন অতনুর মত এক কান্তিময় আলো ? যন্ত্রণাময় বাঁচা থেকে বেঁচে যাওয়া সেই প্রাণকণাটিরও তো অনন্তলোকের অধিবাসী হওয়ার কথা। কোথায় সে ?

    খুব, খুব ভাল করেছ ইন্দু। জন্মানোর আগেই ওকে মুক্তি দিয়েছ। তোমার মনে আছে ঘুমের মধ্যে আমি কথা বলে উঠতাম ? অনেকবার জানতে চেয়েছ, কিন্তু বলা হয়ে ওঠেনি। হাইনরিখ হেইন আমার উপর ভর করতেন। ফিসফিসিয়ে বলতেন–

    ঘুম ভাল, মৃত্যু আরও ভাল, কিন্তু সবচেয়ে ভাল যদি জন্মই না হত।

    ৬]

    “চল এবার বেরোতে হবে।”

    “কোথায় ?”

    “কোথায় মানে ? আবার ন্যাকামো শুরু করলি। ঠিকঠাক প্যাকিং করেছিস তো ? আরেকবার দেখে নে। কাগজপত্র, টাকা পয়সা। আর হ্যাঁ অরনামেন্টস অবশ্যই নিবি। কারেন্সির চেয়ে গোল্ড অনেক বেশি কাজের”।

    “আর ও ? ও যাবেনা ?”

    “ও মানে ? আর কে যাবে ?”

    “কেন অতনু ? ও কি এখানেই পড়ে থাকবে ?”

    “তুই কি পাগল ? ও কি করে যাবে ? হি ইজ ডেড ব্লাডি ফুল ! অতনু মরে গেছে !”

    “যদি আবার বেঁচে ওঠে ? ঠিক ছটায় ওকে বেড টি দিই। আর মাত্র দু ঘন্টা বাকি।”

    ভয়, খুব ভয় পেল পলাশ। মানুষ খুন করার পরেও কখনও এমন অনুভূতি হয়নি। ইন্দ্রাণী কি ঠাট্টা করছে ? নাকি সত্যিই পাগল হয়ে গেছে ? কিন্তু কোথায় ইন্দ্রাণী ? একি ! স্টোর রুমের দিকে কে ছুটে যাচ্ছে ?

    “ওদিকে যাস না ইন্দু ! ওদিকে যেতে নেই !”

    দরোজার কাছে পৌঁছনোর আগেই পলাশ ওকে ধরে ফেলল।

    “প্লিজ ইন্দু। আমার কথা শোন !”

    “আবার ইন্দু ! কতবার বলেছি ওই নামে ডাকবিনা।”

    “বেশ ডাকবনা। শান্ত হ প্লিজ । সামনে অনেক পথ। নতুন জীবন—আয় তোর মাথায় হাত বুলিয়ে দিই !”

    “ডোণ্ট টাচ মি, ইউ ব্লাডি মার্ডারার !”

    “বড্ড বাড়াবাড়ি করছিস কিন্তু। সব কাজ তোর কথা মতই হয়েছে। আমাকে ভিলেন বানিয়ে কী লাভ ? চল, দেরি হয়ে যাচ্ছে।”

    তারপর নীরবতা, আলুথালু বেশ, তারপর শীতঘুম, শুরু হওয়া শেষ। নিভে যাওয়া আগুন থেকে যেভাবে ছাই উড়ে আসে ঠিক সেভাবেই হেঁটে গেল ইন্দ্রাণী। ট্রলিতে হাত পড়তেই চাকা নড়ে উঠল।

    “বাহ এই তো লক্ষ্মী মেয়ে। আমাকে দে। খুব ভারি মনে হচ্ছে!”

    দু পা এগিয়েই আবার—-

    “ও কি সত্যিই মরে গেছে পলাশ ?”

    “কতবার বলব ? মরে গেছে ! মরে গেছে ! মরে গেছে ! হি ইজ ডেড ! হি ইজ ডেড ! হি ইজ ডেড !”
    “তবে কি ও এভাবেই পড়ে থাকবে ? কেউ তো খবরও পাবেনা। স্টোর রুমের মধ্যে একটু একটু করে পচে গলে—না, কক্ষনও না– এ হতে পারেনা পলাশ ! আমি ওর সৎকার করব।”

    “মানে ? আর ইউ ম্যাড ? ঘানি টানার খুব শখ না!”

    “তোর তো কোনো দোষ নেই। সব দায় আমার। এই নে টাকা। সব নিয়ে যা। আমার কিচ্ছু চাইনা। টাকা পয়সা গয়না গাঁটি। সব তোর। অতনুকে ছেড়ে আমি কোথাও যেতে পারবনা। আমি যে ওকে কথা দিয়েছি!”

    “এবার বুঝতে পারছি তুই ওকে ডিভোর্স করলিনা কেন !খুন খারাপির দরকারই হতনা।”

    “কেন করব ? ও যদি অন্য কারও হয়ে যেত ?”

    ইন্দ্রাণীর চোখে আর উন্মাদনা নেই। সমাহিত চিবুকে সিদ্ধান্তের দৃঢ়তা। ট্রলিটিও দাঁড়িয়ে পড়েছে। থমকে যাওয়া চাকায় কী হাস্যকর স্থবিরতা। যে পথে যাওয়ার কথা, সেখানে কারও পদচিহ্ন নেই। অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়া গন্তব্যের দিকে তবে কে হেঁটে যাচ্ছে ? পলাশ না ঘন্টা মিত্তির ? আগুন না ছাই ? আলো না অন্ধকার ? এই যে এত অপেক্ষা ? তার কি কোনো মূল্য নেই ? তবে কেন এত আয়োজন ? হরি লুটের বাতাসারও তো দুটো পিঠ থাকে। এক পিঠে ধুলো থাকলে কি আরেক পিঠে আকাশ লেখা যায়না ? প্রার্থিতা মানবীর চোখে চোখ রেখে পলাশ কি এই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজে বেড়াচ্ছে ? কে জানে ! ওই তো একটা ছায়া ! বিন্দুবাসিনী বালিকা বিদ্যালয় থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে যে জামরুলের গাছ, তারই নিচে এক কিশোর। স্কুল ব্যাগে বই নেই, শুধু পেয়ারা আর বনকুল। ছেঁড়া চপ্পলে যা লেগে আছে, সবটাই কি ধুলো ? অপেক্ষা নয় ? ওই তো ছুটির ঘন্টা। স্কুল গেটে আর একটি ছায়া। জামরুল গাছের দিকেই তার অভিমুখ। এক একটি পদক্ষেপ মানে এক একটি প্রহর। আসছে, সে আসছে।

    “এনেছিস ? বাহ ! দাঁড়া এগুলো রেখে আসি।”

    অনভ্যস্ত আঁচলে পেয়ারার লাফ। ঠোঁটে বনকুল। এভাবেই ছায়ারা ফিরে যায়। তারপর আবার অপেক্ষা। এক মিনিট, দু মিনিট, পাঁচ মিনিট, এক ঘন্টা, এক মাস, এক বছর, দশ বছর, নাহ, পুরো একটা জীবন।

    “আমাকে শুধুই ইউজ করে গেলি ইন্দু ?”

    রিভলবার থেকে যে গুলিটা বেরিয়ে এল, সে কখনও লক্ষ্যভ্রষ্ট হতে শেখেনি। ন্যুনতম যন্ত্রণা দিয়ে মানুষ মারার কৌশলটি সে অনেক আগেই আয়ত্ত করেছে। ডাইনিং থেকে স্টোর রুম পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়া দ্বিতীয় রক্তরেখাটির মধ্যে তাই কোনো নতুনত্ব নেই। অতনুর পাশে যখন ইন্দ্রাণীও শুয়ে পড়ল, তখন ভোর হচ্ছে। ডাউন ট্রেনের চাকায় ঘরে ফেরার শব্দ।

    ৭]
    গঙ্গামুখী ব্যালকনিতে আর একটি আলো।

    আমি এসে গেছি অতনু।

    ইন্দু ! তুমিও ! কেন এলে এখানে ? এত তাড়াতাড়ি !

    ভালবাসি বলে।

    বেশ । তবে তাই হোক।এই দেখ, আমিও এখন আলো। তোমার মতই কান্তিময়।

    এই বেশ ভাল হল বলো। নিজেকে আর কদাকার ভাববেনা। আমাকে এত কষ্ট দিতে কেন অতনু ?

    সেটাও আমার ভালবাসা ইন্দু। তোমাকে আঁকড়ে ধরেছিলাম। আমি যে সাঁতার জানতাম না। ডুবন্ত মানুষ তো বাঁচার তাগিদেই জড়িয়ে ধরে। সে কি কখনও ভাবে যাকে আঁকড়ে ধরেছে, তারও শ্বাস রোধ হতে পারে !

    ভালবাসা এত রক্ত ঝরায় কেন অতনু ?

    হা হা হা। ভালবাসাই তো রক্ত ঝরায়। মরে এবং মারে। কখনও দেশ, কখনও ধর্ম, কখনও নারী।

    তুমিও তো আমায় মেরে ফেলতে পারতে !

    কেন ইন্দু ? ওথেলোরাই কি শুধু ডেসডিমোনাদের মারবে ?

    কিন্তু তোমার কোলে মাথা রাখব কিভাবে ? সবই তো শূন্য ! রক্ত মাংস বুক চিবুক কিছুই তো নেই।

    শূন্য আর পূর্ণে কোনো ভেদ নেই ইন্দু। অনুভবে যে যেমন পায়। শূন্যের আকৃতি নিয়েই তো বৃত্ত গড়ে ওঠে। আলো, অন্ধকার, দিন রাত্রি, সুন্দর, কুৎসিত সব একই মুদ্রার দুটি পিঠ। অতনু আসলে একটা অন্ধকারের নাম। তোমাকে ছোঁয়ার জন্যই তার জন্ম হয়েছিল। সে জানত না তার স্পর্শে আলোটিও অন্ধকার হয়ে যাবে।

    কিন্তু আমরা যে কথা বলছি !

    না ইন্দু। আমিও তাই ভেবেছিলাম। এসবই অনুভব, সংবেদন। কথা বা উচ্চারণ নয়।শুধু আমরাই বুঝতে পারি। জীবিতদের কানে কখনও ধরা দেয়না। চলো, সময় হয়েছে।

    কোথায় অতনু ?

    গেলেই বুঝবে । থাক, একটু পরে যাই। পলাশ আসছে। ওকেও সঙ্গে নেব।

    পলাশ ? কি বলছ অতনু ?

    হ্যাঁ, ওই দেখ, মেইল ট্রেন লক্ষ্য করে কী উদ্দাম ছুটে চলেছে ! শরীরে একটাও সুতো নেই। সম্পূর্ণ উলঙ্গ। নির্ঘাত পাগল হয়ে গেছে।

    ওকে থামাও অতনু।

    আমরা শুধু দেখতেই পারি ইন্দু। থামাতে পারিনা।

    কিন্তু পলাশ !ও কেন এখানে আসবে ?

    সুপারি কিলারটিও তোমাকে ভালবাসত, ইন্দু। হয়ত আমার চেয়েও বেশি। চলো, এগোই । ও এক্ষুনি এসে পড়বে।

    কোথায় অতনু ?

    প্রার্থনা কক্ষে। সবাই অপেক্ষা করছে।

    প্রার্থনা ? কাদের জন্য ?

    যারা এখনও রয়ে গেল—-
    ওরা আমাদের তর্পন দেয়, আমরা ওদের জন্য প্রার্থনা করি।

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২
    ১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
    ২০২১২২২৩২৪২৫২৬
    ২৭২৮২৯৩০৩১