• শিরোনাম

    বোয়ানট্রপি অথবা গরুভবন / দেবাশিস লাহা

    | ১৪ আগস্ট ২০২০


    বোয়ানট্রপি অথবা গরুভবন / দেবাশিস লাহা

    চমকে উঠলেন নাকি? শান্ত হোন। এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হলেই মহাকবি শেক্সপিয়রের হ্যামলেট চরিত্রটিকে স্মরণ করবেন। প্রিয় সখা হোরেশিওকে সম্বোধন করে তাঁর সেই অবিস্মরণীয় উক্তি — There are more things in heaven and earth Horatio/ Than are dreamt of in your philosophy.

    এ বিশ্বে এমন অনেক কিছুই আছে, হোরেশিও যা তোমার কল্পনা বা দর্শনের নাগালের বাইরে। আমি কোনো মনগড়া কাহিনি অথবা কল্পনা জাল বিস্তার করার উদ্দেশ্যে শিরোনামটি ব্যবহার করিনি। বোয়ানট্রপি( Boantropy) অত্যন্ত বাস্তব বিষয়। বিরল, দুরারোগ্য মানসিক রোগ। অভিধানেও যার উল্লেখ আছে। কী অর্থ? আসুন দেখে নেওয়া যাক।


    Boanthropy is a psychological disorder in which the sufferer believes he or she is a cow or ox.
    অর্থাৎ বোয়ানট্রপি হল এমন একটি মানসিক ব্যাধি যার প্রভাবে কোনো নারী বা পুরুষ নিজেকে গরু/ মহিষ মনে করে। হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন। শুধু মনে করাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনা, এই রোগের শিকার ব্যক্তিটি গরুর মতই চার পায়ে হাঁটেন,হাম্বা হাম্বা ডাকেন, ঘাসও খান। এখানেই ইতি নয়। চরম পর্যায়ে পৌঁছলে এই রোগী কসাইখানায় যাওয়ারও বায়না ধরেন। কাতর অনুনয়ে জানান — আমাকে তোমরা কেটে খেয়ে নাও।

    লাটির শব্দ Bovinae ( গবাদি পশু) থেকেই শব্দটির উৎপত্তি। বাংলা ভাষায় এই রোগটির কোনো প্রতিশব্দ খুঁজে পাইনি। তাই “গরুভবন” শব্দটির ব্যবহার করেছি। ভব অর্থ হওয়া, রূপান্তর। যেভাবে ঘনীভবন শব্দটির নির্মাণ, গরুভবনও অনুরূপ। কিঞ্চিৎ এদিকওদিক করে নেওয়া artistic freedom নিতেই পারি, তাই না?


    অত্যন্ত বিরল এই রোগটির সর্বপ্রথম শিকার কে? ইতিহাস কী বলছে? বোয়ানট্রপির প্রথম রোগী কে, এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া অসম্ভব। তবে বিখ্যাত ব্যক্তিদেরই তো ইতিহাস মনে রাখে, যেহেতু তাঁরাই কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন। তেমনই এক ব্যক্তিত্ব এই রোগটির কবলে পড়েছিলেন। অনেকেই তাঁর নাম শুনে থাকবেন।

    প্রাচীন আশ্চর্যের অন্যতম সেই Hanging garden বা ঝুলন্ত উদ্যানের স্রষ্টা, ব্যবিলনের মহাপ্রতাপশালী শ্রেষ্ঠতম সম্রাট দ্বিতীয় নেবুকদনেজা। খ্রীস্টপূর্ব ৬০৫ থেকে ৫৬২ পর্যন্ত যিনি ব্যবিলন শাসন করেছিলেন। সিরিয়া এবং প্যালেস্টাইন জয় করার পর তিনি ব্যবিলনকে এক অত্যাশ্চর্য নগর হিসেবে গড়ে তোলেন। তিনিই জেরুজালেমের প্রখ্যাত মন্দিরটি ধ্বংস করে সমগ্র ইহুদি জনপদটিকেই বন্দী করে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেন। ব্যবিলনের এই বিশ্ববিখ্যাত সম্রাটকে নিয়ে আলোচনার পরিসর এখানে নেই। প্রশ্ন হল, কেন তাঁর এমন পরিণতি হল? নির্দিষ্ট করে কিছু বলা মুশকিল। কারণ বিরল এই রোগটির কার্যকারণ এখনও অজ্ঞাত। তবে বিশ্বাস এই যে অপরিসীম কৃতিত্বের অধিকারী এই সম্রাট অত্যন্ত অহংকারী হয়ে উঠেছিলেন। ঈশ্বরকেও চ্যালেঞ্জ করে বসেছিলেন। তারই শাস্তি হিসেবে এই পরিণতি। বলাই বাহুল্য অন্ধ বিশ্বাসীদের তৃপ্তি দিলেও চিকিৎসা বিজ্ঞানে এই যুক্তিটি আদৌ গ্রহণীয় নয়।


    এবিষয়ে চিকিৎসা বিজ্ঞান কী বলছে? এই রোগের ( সম্রাটের চার পায়ে হাঁটা এবং ঘাস খাওয়া) কারণ হিসেবে পরফাইরিয়া ( porphyria) নামক একটি এনজাইম বা উৎসেচক বিভ্রাটের ফল হতে পারে। যার প্রভাবে রোগীর স্নায়বিক বৈকল্য ঘটে, যেমন দৃষ্টিভ্রম ( hallucination) সুতীব্র হতাশা (depression) উদবেগ ( anxiety) যা প্যারানইয়া ( paranoia) পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে। কেউ কেউ এটিকে paralytic dementia অর্থাৎ পক্ষাঘাতের ফলে স্মৃতিভ্রম হিসেবেও ব্যাখ্যা করেছেন, যা সিফিলিস নামক যৌনরোগের কারণেও হতে পারে।

    প্রশ্ন জাগে, তবে কি এই রোগটির উল্লেখ সমসাময়িক চিকিৎসা বিজ্ঞান বা চিকিৎসকের অভিজ্ঞতায় লিপিবদ্ধ হয়নি? অবশ্যই হয়েছে। ইসলামি স্বর্ণযুগের চিকিৎসক, গণিতজ্ঞ, বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ( এঁকে পলিম্যাথ Polymath বলা হয়) ইবন শিনা (Ibn Sina, আবু আলি শিনা নামেও পরিচিত) এই রোগটির চিকিৎসা করেছিলেন বলে জানা যায়৷ পারস্যের এই প্রতিভাধর মানুষটি ৯৮০ থেকে ১০৩৭ পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। এই নাতিদীর্ঘ জীবনকালেই অনন্য প্রতিভার স্বাক্ষরও রেখেছিলেন। প্রায় ৪৫০ টি গ্রন্থের লেখক ( যেমন The Canon of Medicine, The book of Healing) এই চিকিৎসক, বিজ্ঞানী মনীষা সত্যিই বিস্ময়কর। (ইসলামে কখনই বিজ্ঞান ছিলনা, কেবলই হিংসা, বিদ্বেষ আর হত্যালীলা– এমন বিশ্বাস নিয়ে যাঁরা কলম চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁদের বলব ইবন শিনা এবং ইসলামি স্বর্ণযুগ নিয়ে কিঞ্চিৎ পড়াশোনা করুন।)

    প্রখ্যাত এই চিকিৎসকের অভিজ্ঞতাটি আবদুর রহমান জামি তাঁর Seven Thrones নামক গ্রন্থে উল্লেখ করে গেছেন। কেমন সেই অভিজ্ঞতা?

    পারস্যবাসী এক ব্যক্তি (যিনি এই রোগে ভুগছিলেন) বারবার দাবি করছিলেন তাঁকে যেন হত্যা করা হয়। যেহেতু তিনি নিশ্চিত যে গরু ব্যতীত অন্য কিছু নন। হাম্বা হাম্বা আওয়াজ তুলে মাঝেমধ্যেই আকুতি জানিয়ে চলেছেন — “আমাকে অবিলম্বে হত্যা করো তোমরা। অনুগ্রহ করে কসাইখানায় নিয়ে চলো। আমার ওজন কমেই চলেছে। দেরি করলে তোমরা যথেষ্ট মাংস পাবেনা।”

    তিনি কোনো ওষুধও খাবেন না, খাবারেও অনীহা। মহা মুশকিল। সব চিকিৎসকই ব্যর্থ। অগত্যা সবাই সেই মহা চিকিৎসক ইবন শিনা-র শরণাপন্ন হলেন। ইবন শিনা সমস্যাটি বুঝে গেলেন। সমবেত আত্মীয় পরিজনদের বললেন — তোমরা রোগীকে বল, কসাইকে খবর দেওয়া হয়েছে। তোমাকে জবাই করার জন্যই সে রওয়ানা হয়েছে। কালবিলম্ব না করে ইবন শিনা রোগীর বাড়ি চলে গেলেন। দরোজায় পৌঁছেই চেঁচিয়ে উঠলেন — “এখানে গরু কে আছো?”

    রোগী চার পায়ে হেঁটেই বেরিয়ে এলো। বলল, ” আমি হুজুর।আমিই সেই গরু।” ইবন শিনা তাঁকে আশ্বস্ত করে বললেন– আমি কসাই। তোমার ইচ্ছে এবার পূর্ণ হবে।

    এই বলে তিনি রোগী হাত পা বেঁধে ফেললেন। জবাই করার আগে যেভাবে গরু বাঁধা হয়। তারপর ছুরিতে ধার। কসাই যেভাবে গরু ছাগল মেপে নেয়, ঠিক সেইভাবেই তিনি রোগীর দেহটি পর্যবেক্ষণ করলেন। তারপর পিঠে, পাছায় থাবড়া মেরে বিড়বিড়িয়ে উঠলেন — গরুটি বড্ড রোগা-সোগা, অপুষ্টিতে ভুগছে। এখন একে হত্যা করা মানেই অপচয়। একে বরং দুবেলা ঠিকঠাক খাওয়ানো হোক। ওজন বাড়লে জবাই করব।
    ইতিমধ্যেই রোগীর আত্মীয় পরিজন উপস্থিত। রোগী বাঁধন খুলে দেওয়া হল। মুখের সামনে যথেষ্ট খাদ্যও হাজির করা হল। রোগীটি এবার পরম তৃপ্তিতে খাবার খেতে শুরু করলেন। কিছুদিন পরেই তিনি হারানো স্বাস্থ্য ফিরে পেলেন। মানসিক সমস্যাও দূরীভূত হল। নিজেকে আবার মানুষ ভাবতে আরম্ভ করলেন

    boantropy নিজেকে গরু মহিষ ভাবা। কিন্তু গরুর বদলে যদি কেউ নিজেকে শেয়াল, কুকুর ভাবে? এককথায় এই জাতীয় মানসিক বিকারকে Zoanthropy বলা হয়। অর্থাৎ যখন কোনো মানুষ নিজেকে ইতর প্রাণি ভেবে নেয়। এই zoanthropy র একটি অংশ হল boantropy! এই ধরণের ব্যাধিত  documented case report হিসেবে রবার্ট বেফিল্ড রচিত গ্রন্থ  Treatise de morborum capitis” ( ইংরেজিতে disease of the head, অর্থাৎ মাথার রোগ) তে পরিলক্ষিত হয়। ১৬৬৩ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত এই গ্রন্থটিতেই “মানুষের জীবজন্তু হয়ে ওঠার” কিছু প্রামাণ্য তথ্য প্রমাণ পাওয়া যায়।

    প্রশ্ন একটিই Zoanthropy র পরিবর্তে boantropy শব্দটি কেন বেশি পরিচিত, প্রচলিত হয়ে উঠল? ব্যবিলন সম্রাট নেবুকদনেজা এই রোগের শিকার হয়েছিলেন বলে? নাকি গরু নামক চতুষ্পদটি অপেক্ষাকৃত সহজলভ্য বলে? নাকি (অন্যান্য (জীবজন্তুর তুলনায়) নিজেকে গরু ভেবে নেওয়াই উত্তম বলে? প্রশ্ন একটাই এযুগেও যদি কেউ এই বিরল রোগটির শিকার হন, চিকিৎসা কে করবেন? কোনো অত্যাধুনিক মনস্তাত্ত্বিক? নাকি ইসলামি চিকিৎসক ইবন শিনার নতুন কোনো অবতার?

    দেবাশিস লাহা 

    তথ্যসূত্র Amber Blaize লিখিত article — Boanthropy — One of the weirdest disorders you’ve never heard of

    এবং অন্যান্য।

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫১৬
    ১৭১৮১৯২০২১২২২৩
    ২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
    ৩১