• শিরোনাম

    মাদকাসক্তিঃ বাস্তবতা ও করনীয়

    ডা. মেজবাউল খাঁন ফরহাদ।মনোরোগ বিশেষজ্ঞ।ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ফরিদপুর। | ২২ মে ২০২০


    মাদকাসক্তিঃ বাস্তবতা ও করনীয়

    মানব জাতির সৃষ্টির শুরু থেকেই মাদক বা বিভিন্ন উত্তেজক পদার্থ ছিলো। সামাজিকভাবে, ধর্মীয়ভাবে এবং বিরূপ পরিবেশে খাপ খাওয়ানোর জন্য বিভিন্ন জাতি বা গোষ্ঠী বিভিন্ন মাদক বা উত্তেজক পদার্থ ব্যবহার করে আসছে। এভাবে মাদক ব্যবহার হচ্ছে তাদের অভ্যাসগত আচরণ যা তাদের নিজস্ব দায়িত্ববোধ, সামাজিকতা বা ব্যক্তি জীবনে তেমন বিরূপ প্রভাব ফেলে না। কিন্তু অ্যাডিকশন বা মাদকাসক্তি সম্পূর্ন ভিন্ন বিষয়। এটা এক ধরনের মস্তিষ্ক সংক্রান্ত অসুস্থতা, যা আসক্ত ব্যক্তির সামাজিক ও মানসিক বিষয়গুলিকে প্রভাবিত করে। আসক্ত ব্যক্তি নির্দিষ্ট কোন এক বা একাধিক মাদকে আসক্ত হয়ে নিজের জীবন, পারিবারিক ব্যবস্থা, বন্ধুবান্ধব বা কর্মক্ষেত্রে কোনো মনোযোগ দিতে পারে না, অভাব দেখা দেয় দায়-দায়িত্ব বোধের। ফলে সেই ব্যক্তি ও তার পারিপার্শ্বিক ব্যবস্থায় সমস্যা দেখা দেয়।

    মাদক বলতে এমন বস্তুসমূহকে বোঝায়, যা কোনো মানুষকে আসক্ত ও নির্ভরশীল করে তোলে এবং শরীরে প্রবেশ করার পর কিছু স্নায়বিক প্রতিক্রিয়ার উদ্রেক ঘটে এবং পুনরায় এসব দ্রব্য গ্রহণে তীব্র আগ্রহ জন্মায়। মাদক বর্তমানে জাতীয় ও বৈশ্বিক সমস্যা। এ সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে বা নিয়ন্ত্রণ করতে হলে, কারা মাদক গ্রহন করে, আর কারা মাদকাসক্ত হয় তা বোঝা খুব জরুরি। এটা বুঝতে পারলেই কেবল যথাযথ পদক্ষেপের মাধ্যমে মাদকাসক্তি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।
    মাদকদ্রব্য গ্রহন করার প্রধান কারন সমূহ : ১। মদকের সহজপ্রাপ্যতা; ২। ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ও নিজস্ব সমস্যা; ৩। অনুপযোগী পারিপার্শ্বিক পরিবেশ বা সমাজ ব্যবস্থা; এবং ৪। উপাদানের(মাদকের) প্রভাব।
    এখন আমরা শুধু সহজ প্রাপ্যতা কমানোর চেষ্টায় আছি, কিন্তু অন্যান্য কারন নিয়ে তেমন কোন পদক্ষেপ নাই। অথচ গবেষণায় দেখা গেছে, সহজ প্রাপ্যতার কারনে যারা মাঝে মাঝে বা বিশেষ দিন উপলক্ষে মাদক নেয়, তাদের মাত্র ১০ ভাগ পরবর্তিতে মাদকাসক্ত হয়। তাহলে এই ১০ ভাগ কারা, তারা কী কারনে মাদকাসক্ত হচ্ছে, তা না বুঝতে পারলে সমস্যা সমস্যাই থেকে যাবে।


    গবেষণার মাধ্যমে মাদকাসক্ত হওয়ার যেসকল কারন নির্ণয় করা হয়েছে, তা হলো-

    ক) ব্যক্তিত্ব ও পারিবারিক কারন: পারিবারিক সমস্যা, মা-বাবার অমিল বা আলাদা থাকা; পরীক্ষায় খারাপ করা, স্কুল পালানো, ছোট খাটো চুরি করা; ক্ষণিক মজা পাওয়ার প্রবণতা ও হঠাৎ উত্তেজনাময় ব্যক্তিত্ব; পরিবারে সদস্যদের মাঝে মানসিক বা ব্যক্তিত্ব সমস্যা থাকা; বংশগত সমস্যা। খ) সামাজিক কারন: মাদকাসক্ত সঙ্গী বা বাবা মার প্রভাব; বেকারত্ব বা চাকুরী হারানো; বাসস্থানহীনতা ইত্যাদি।


    উপাদানের প্রভাব: অনেকেই মাদককে তার কাজের টনিক হিসেবে ব্যবহার করেন কিন্তু আসক্ত হয় না, কিন্তু অন্যরা তা পারে না। কারন একেকজনের মস্তিষ্ক একেক রকম প্রতিক্রিয়া দেখায়। যারা আসক্ত হয় তাদের মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সিস্টেম বেশি কাজ করে এবং তার মস্তিষ্কের চাহিদা অনুযায়ী তাকে মাদক গ্রহন করতে বাধ্য করে। এতে মাদকের সহনশীলতা বেড়ে যায় ও পূর্বের থেকে ঘন ঘন ও অতিরিক্ত মাদক গ্রহণ করতে হয় এবং সে মাদকাসক্তিতে পরিনত হয়।

    মস্তিষ্কের উপর মাদক ভেদেও এর আলাদা আলাদা প্রভাব থাকে। যেমন- গাঁজার সহনশীলতা খুব একটা বাড়ে না, কিন্তু রিওয়ার্ড সিস্টেম খুব কার্যকরী। অর্থাৎ একই পরিমান গাঁজা দীর্ঘদিন সমান প্রতিক্রিয়া করে, পরিমান খুব একটা বাড়ানো লাগেনা। আবার ইয়াবা, ফেন্সিডিল, হেরোইন, পেথিডিন ইত্যাদি মাদকের সহনশীলতার মাত্রা খুব দ্রুত বেড়ে যায়। ফলে আজ যতটুকুতে তার নেশা হয়, কয়েকদিনের মধ্যেই ততটুকুতে তার সমান নেশা হয় না। ফলে তার মাদকের ডোজ বাড়াতে হয়। এভাবে বাড়াতে বাড়াতে তার মধ্যে মাদকের উপর পূর্ন নির্ভরশীলতা চলে আসে। তখন সামান্য সময়ের জন্য বাদ দিলেও শারীরিক ও মানসিক সমস্যা হয়। একে বিজ্ঞানের ভাষায় ডিপেন্ডেন্সি বা মাদক নির্ভর্শীলতা বলে যা মাদকাসক্তের চূড়ান্ত পর্যায়।
    এখন আসি, মাদককে কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং কিভাবে মাদকাসক্ত হওয়া রোধ করা যায়। সেজন্য প্রথমেই মাথায় রাখতে হবে, মাদক গ্রহণ করার উপরের কারণ গুলো – ১। মদকের সহজপ্রাপ্যতা; ২। ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ও নিজস্ব সমস্যা; ৩। অনুপযোগী পারিপার্শ্বিক পরিবেশ বা সমাজ ব্যবস্থা; এবং ৪। উপাদানের(মাদকের) প্রভাব।


    মাদকের সহজপ্রাপ্যতা রোধঃ এটা সম্পূর্নভাবে রাষ্ট্রের কাজ। কিন্তু এটা করা খুবই দূরহ , কারণ মাদকের ব্যবসা পৃথিবীর দ্বিতীয় লাভজনক ব্যবসা (তেলের পরে)। এর সাথে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় গডফাদাররা জড়িত। প্রশাসন যদি ন্যায় নিষ্ঠভাবে চায় আর রাজনীতিবিদরা যদি তাদের সত্যিকার অর্থে সহায়তা করে তবে তা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তবে, পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশ, যাদের প্রশাসন তুলনামূলক স্বচ্ছ আর রাজনীতিবিদরা তুলনামূলক দায়ত্বশীল বলে স্বীকৃত তারাও মাদক সম্পূর্ন নির্মুল করতে পারেনি। সেখানে আমাদের বাস্তবতায় তা কতটা সম্ভব, তা চিন্তার বিষয়। এর প্রধান কারণ হচ্ছে চাহিদা। চাহিদা যতদিন আছে, ব্যবসা ততদিন চলবেই।

    অর্থাৎ আমাদের চাহিদা কমাতে হবে, চাহিদা কমলেই এর যোগান কমবে। আর চাহিদা কমাতে হলে আমাদের মাদক গ্রহণের কারণের মধ্যে ২, ৩ এবং কোন কোন ক্ষেত্রে ৪ নং এর প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। আর আগেই বলছি ১ নং কারণ অর্থাৎ মাদকের সহজলভ্যতা কমানো রাষ্ট্রের কাজ, সেখানে আমাদের করার তেমন কিছু নাই, শুধু সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা ছাড়া। তবেঁ, বাকি তিনটা অনেকটাই আমাদের হাতে। আর যেহেতু ছেলে-মেয়ে আমাদের, তাই আমাদেরকেই তাদের মাদকের ছোবল থেকে রক্ষা করতে হবে।

    ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ও নিজস্ব সমস্যায় করণীয়ঃ একটি বাচ্চা যখন বড় হতে থাকে, তখন তার শারীরিক বৃদ্ধির সাথে সাথে তার মানসিক ও সামাজিক বিকাশও যথাযথ ভাবে হওয়া প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে কোন ধরনের অস্বাভাবিকতা থাকলে, শিশুর পরিবার বিশেষ করে পিতামাতার তা গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিৎ। বিশেষ করে, পরীক্ষায় খারাপ করা, স্কুল পালানো, ছোট খাটো চুরি করা , ক্ষণিক মজা পাওয়ার প্রবণতা ও হঠাৎ উত্তেজনাময় ব্যক্তিত্ব ইত্যাদি থাকলে শিশুর বিশেষ যত্ন নেয়া, প্রয়োজনে সাইকলোজিস্ট বা সাইকিয়াট্রিস্টের পরামর্শ নেয়া। পারিবারিক অশান্তি থাকলে তা যথাসম্ভব কমিয়ে আনা, পিতামাতার মধ্যে অমিল থাকলে বা তারা আলাদা থাকলেও যাতে শিশুর উপর তার প্রভাব কম পরে তার জন্য যথাযত ব্যবস্থা নেয়া। সর্বোপরি, শিশু যেন যথাযত পারিবারিক, সামাজিক, ধর্মীয় ও মানবিক মূল্যবোধে গরে উঠে তা নিশ্চিত করা।

    অনুপযোগী পারিপার্শ্বিক পরিবেশ বা সমাজ ব্যবস্থা ও করনীয়ঃ কিশোর বয়স এবং সদ্য যুবক বয়সী ছেলে-মেয়েদের উপর পারিপার্শিক ও সামাজিক পরিবেশের প্রভাব খুব বেশি। তারা এমন কোন পরিবেশে যাচ্ছে কিনা, যে পরিবেশটাই মাদক গ্রহণের জন্য তাকে উৎসাহিত করছে। ঝুকিপুর্ন বন্ধুবান্ধব, স্কুল-কলেজ-ভার্সিটি, বাসস্থানের আশেপাশের পরিবেশ ইত্যাদি খেয়াল করার দায়িত্ব পরিবারের। অনেক ক্ষেত্রে পরিবাররের পরিবেশটাই ঝুকিপুর্ন থাকে, যেখানে বাবা-মা নেশা করেন, বা নেশাদ্রব্য বাসায় রাখেন , বাবা-মা বা পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নিয়ন্ত্রনহীন জীবনযাপন করেন। সন্তানের ভালোর জন্য সে পরিবেশটা অবশ্যই আমাদের ঠিক করতে হবে। তাছাড়া, বেকারত্ব, চাকুরী চলে যাওয়া, ব্যক্তিগত সম্পর্কের মারাত্বক অবনতি ইত্যাদি মাদক গ্রহণে প্রভাবিত করে। পরিবারের সদস্যদের উচিৎ এরকম পরিস্থিতিতে তাকে মানসিক সাপোর্ট দেয়া আর রাষ্ট্রের উচিৎ যথাযত কর্মসংস্থানের ব্যব্যস্থা করা।

    উপাদানের(মাদকের) প্রভাব ও করনীয়ঃ আগেই বলেছি, বিভিন্ন মাদক, বিভিন্ন ব্যক্তির ভিন্ন ভিন্ন প্রভাব ফেলে। অনেকেই আছেন কোন প্রকার নেশাদ্রব্যই সে নিতে পারে না, ওটা নিলে তার যে শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন হওয়া শুরু হয় তাকে সে ভয় পায় বা শরীর-মন থেকে এক ধরনের বাধার সম্মুক্ষীন হয়। এটা তার জন্য ভালো। কিন্তু সে যদি মাদক ঝুকিপূর্ন ব্যক্তিত্ব হয় এবং তার পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশ ঝুকিপূর্ন হয়, তাহলে সে এই চ্যলেঞ্জ জয় করে মাদকে অভ্যস্থ হয়ে পরতে পারে। এছাড়া পারিবারিক ও সামাজিকভাবে বিশেষ দিনে ছেলে-মেয়েদের একটু আধটু মজা করার অনুমতি দিয়ে থাকি। সেক্ষেত্রে পূর্ন ছাড় না দিয়ে, তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। যাতে তারা কম ঝুকিপূর্ন উত্তেজক, অল্প পরিমাণে নেয় তার বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। কোন ভাবেই ইয়াবা, ফেন্সিডিল, হেরোইন, কোকেইন, গাঁজা ইত্যাদি মারাত্বক ঝুকিপূর্ন মাদক গ্রহণযোগ্য নয়।

    পরিশেষেঃ একটা জাতির প্রধান চালিকাশক্তি হচ্ছে যুব সমাজ। তাদেরকে মাদকের ঝুঁকিতে রেখে রাষ্ট্র কখনো আগাতে পারেনা। তাই রাষ্ট্রের প্রয়োজনেই উচিৎ এর সহজপ্রাপ্যতা নিয়ন্ত্রণ করা। আর আমাদের উচিৎ আমাদের ছেলে-মেয়ের জন্য একটি সুস্থ, সুন্দর, দৃঢ় পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশ তৈরি করা। তাদের জন্য পর্যাপ্ত খেলাধুলার সুযোগ করে দেয়া, শিল্প সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করা, তাদেরকে পর্যাপ্ত সময় দেয়া, সুস্থ বিনোদনে এবং প্রকৃতির মাঝে ঘুরতে যাওয়া উৎসাহিত করা। নিজেরা ঝুকিপূর্ন জীবনযাপন করে, ঘুষ খেয়ে, অন্যায় করে, মানুষ ঠকিয়ে যতই টাকা কামাই না কেন সন্তান মানুষ করা যাবে না। সেক্ষেত্রে সন্তানকে শাসন করার নৈতিক অধিকারটুকুও আমরা হারাবো। তাই আগে নিজেরা ভালো হই, ভালো একটা একটা পারিবারিক বন্ধন গরে তুলি, সুস্থ সামাজিক পরিবেশ তৈরি করি, তাহলেই কেবল মাদক নির্মূল সম্ভব।


    ডা. মেজবাউল খাঁন ফরহাদ,মনোরোগ বিশেষজ্ঞ

    ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ফরিদপুর।

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫১৬
    ১৭১৮১৯২০২১২২২৩
    ২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
    ৩১