• শিরোনাম

    ছোটগল্প :

    মাশুল : শাহরিয়ার জাওয়াদ

    | ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২০


    মাশুল : শাহরিয়ার জাওয়াদ

    জসিম সাহেব আজকাল ভূত দেখছেন।অতৃপ্ত আত্মা। মাসুমা নামে একজন তরুণীর অতৃপ্ত আত্মা।যখন তখন যেখানে সেখানে তিনি সেই তরুণীর অবয়ব দেখতে পাচ্ছেন। আবছা ধোঁয়াটে অবয়ব।

    মৃত মেয়েটির অবয়ব রিনরিনে গলায় কান্না করে। কান্নার শব্দ শুনে জসিম সাহেব চমকে ওঠেন, কে? কে কাঁদে? অমন করে কে কাঁদে?
    তখন জবাব আসে, আমি।


    জসিব সাহেব চিৎকার করে বলেন, আমি কে?
    আমি মাসুমা।

    তুমি আমার কাছে কী চাও?
    কোন জবাব আসে না।


    জসিম সাহেব দেখেন তরুণীর আবছা অবয়ব বাতাসে সাথে ধীরে ধীরে গায়েব হয়ে যাচ্ছে। সেই অবয়বের চোখের দৃষ্টি কী তিক্ষ্ণ আর স্পষ্ট! কী এক গাঢ় বিষাদ আর আকুতি জমে আছে সেই দৃষ্টিতে!

    জসিম সাহেব ভয়ে কেঁপে ওঠেন। তার গলার কাছে অনেকটা ভয় দলা পাকিয়ে উঠে আসে। বুকের মাঝখানটায় অদৃশ্য কিছু যেন চেপে বসে। সমস্ত শক্তি দিয়ে যেন জসিম সাহেবের বক্ষপিঞ্জর চূর্ণবিচূর্ণ করে দিতে চায়। তিনি মনে মনে ‘সূরা নাস’ পড়তে চেষ্টা করেন… কুল আ’উজুবি রাব্বিন নাস।


    এর পরের আয়াত আর জসিম সাহেবের মনে পড়ে না। তিনি তখনো তরুণীর অবয়ব দেখতে পান। সেই অবয়ব তখন খিলখিল করে হাসে। হাসতে থাকা নারীকণ্ঠ জসিম সাহেবকে একদম কাবু করে ফেলে। তিনি জ্ঞান হারিয়ে ধুপ করে পড়ে যান।

    এমনটা জসিম সাহেবের সাথে মাঝেমধ্যেই হয়। আশেপাশের সবাই তাকে বোঝাতে চেষ্টা করেছে যে এটা নিছকই একটা ভ্রম। এমনটা কখনো হয় না। তার কলিগরা তাকে বুঝিয়েছেন, আত্মীয় স্বজনরা বুঝিয়েছেন। তার স্ত্রী রাহেলা বেগমও তাকে বুঝিয়েছেন। কাজ হয় নি।

    অনেক বড় বড় সাইকিয়াট্রিস্ট দেখিয়েছেন, কিন্তু লাভ হয় নি। সাইকিয়াট্রিস্টরা সবাই তার ভয় পাওয়ার গল্প শুনে মুচকি হাসেন। মুখ হাসি হাসি করে নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলেন, চিন্তা করবেন না। আপনার সিজোফ্রেনিয়ার সমস্যা হচ্ছে।

    এটা কমন একটা সাইকোলজিক্যাল ডিসঅর্ডার।
    জসিম সাহেব তাদের কথা শুনে চুপ করে থাকেন। মাঝে মাঝে ওপর নিচ মাথা দোলান যেন তিনি মন দিয়ে তাদের কথা শুনছেন। অথচ জসিম সাহেব তাদের কথার এক বিন্দুও কানে তোলেন না। তার দৃঢ় বিশ্বাস, তিনি একটা অশুভ শক্তির কবলে পড়েছেন। একটা অতৃপ্ত নারী আত্মা তাকে সবজায়গায় তাড়া করে ফিরছে।

    জুম্মার নামাজ ছাড়া কখনো নামাজ না পড়া মানুষটাও একসময় ঘড়ি ধরে জামাতের সময় মসজিদে উপস্থিত হন। নামাজ পড়তে চেষ্টা করেন। কিন্তু নামাজের মধ্যে রুকুর তসবীহ, সিজদার তসবীহ, শেষ বৈঠকের দোয়ায়ে মাছুরা, দরুদ শরীফ আর ইস্তেগফার- সবকিছু ভুলে যান।

    পরম করুণাময় কি তার দিকে মুখ তুলে তাকান? বোধহয় না। জসিম সাহেবের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে।
    জসিম সাহেব ক্ষমা চান। সৃষ্টিকর্তার একটুখানি করুণা চান। সৃষ্টিকর্তা তাকে করুণা করেন না। তিনি মাসুমাকে আবার দেখতে পান। ঘরের আনাচে কানাচে, ছাদের কার্নিশে। রাস্তাঘাটে। ভরদুপুরে, মাঝরাতে।

    জসিম সাহেবকে একদিন মেন্টাল হসপিটালে ভর্তি করা হয়। তিনি এখন বদ্ধ উন্মাদ। তাকে আলাদা একটা কেবিনে রাখা হয়েছে৷ সেই কেবিনে মাসুমা মেয়েটা সারাদিন তার চারপাশে ঘোরাঘুরি করে। রিনরিনিয়ে কান্না করে। জসিম সাহেব আতঙ্কে চিৎকার করেন, দরজা খোলার জন্য আকুতি করেন।

    কিন্তু কেউ দরজা খুলে দেয় না। জসিম সাহেব ফিনাইলের গন্ধওয়ালা একটা কেবিনে বন্দী হয়েই থাকেন। তাকে দেখার কেউ নেই, তার কথা শোনার কেউ নেই।
    জসিম সাহেব কি মাসুমাকে চেনেন?

    বছর পাঁচেক আগের কথা।
    জসিম সাহেব তখন এক মফস্বলের ওসি। মফস্বল বলাটাও ঠিক হবে না আসলে। জায়গাটা বান্দরবানের মধ্যে। পাহাড়ের ওপর। দুর্গম এলাকা। জসিম সাহেবের মাঝেমাঝে চুল ছিঁড়তে ইচ্ছা করে। পাহাড়ের ওপর ডাশা ডাশা মশার কামড় খেতে কার ভালো লাগে?

    জসিম সাহেবের সম্প্রতি বদলি হয়েছে। এক শিল্পপতির ছেলে মাসখানেক আগে ধরা পড়লো মাদক চোরাচালান করতে গিয়ে।

    সাথে তার তিনজন সাঙ্গপাঙ্গ। তারা কুমিল্লার বর্ডার দিয়ে চোলাই মদ থেকে শুরু করে বিদেশি ওয়াইন, হিরোইন, কোকেইন নিয়ে এসে ঢাকায় সাপ্লাই দেয়৷ ঢাকার কিছু রেস্টুরেন্টে। গুলশান, ধানমণ্ডি। যেখানে বড়লোকের ছেলেমেয়েরা এসে লুকিয়ে নেশা করে। কোকেন নেয়, হিরোইন নেয়।

    শিল্পপতির সেই ছেলের রমরমা ব্যবসা। চোরাচালান করতে গিয়ে সেও মাঝে মাঝে একটু আধটু কোকেন নেয়। এটা দোষের কিছু না। এই ব্যবসা করতে গেলে ব্যবসায়ী নিজেও একটু চেখে দেখবে এটাই স্বাভাবিক।

    সেই ছেলে কোকেনের বড় একটা চালান নেওয়ার জন্য সেবার চুয়াডাঙ্গা যায়। পুলিশ তক্কে তক্কে ছিলো। ফেরার পথে ইশ্বরদী রেল লাইনের পাশ থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। সেই সাথে জব্দ করা হয় প্রায় কোটি টাকার কোকেন।

    জব্দকৃত মাদকদ্রব্য পরদিন দুপুরে বাজারের মাঝখানে নিয়ে আগুন ধরিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয় সাধারণ মানুষের সামনে। বাকি থাকে আসামী। তাদের রাখা হয়েছে ইশ্বরদী থানার লকআপে।

    কিন্তু আসামীরাও ছাড়া পেয়ে যায় এক সপ্তাহের মধ্যেই। কোর্টে তোলার আগেই সেই শিল্পপতির ছেলে তার সাঙ্গপাঙ্গদের সাথে নিয়ে গা ঢাকা দেয়। তাদেরকে ছেড়ে দেন ওসি জসিম সাহেব। নিজ হাতে।

    এই হাতেই তিন সেই ছেলের বাবার কাছ থেকে দশ লক্ষ টাকা নিয়েছেন। নিজ দেশ আর জাতির সাথে বেঈমানী করা যায় কিন্তু টাকার সাথে বেঈমানী করা যায় না। টাকা যার জসিম সাহেবও তার। তিনি টাকার গোলাম। তিনি টাকায় কেনা গোলাম।

    আসামীর ছাড়া পাবার খবর পৌঁছে যায় পুলিশের কেন্দ্রীয় কর্তাব্যক্তিদের কাছে। জসিম সাহেবের কাছে অফিশিয়াল চিঠি আসে। ট্রান্সফার লেটার। বান্দরবানের পাহাড়ের ওপর একটা ছোট থানায়। জসিম সাহেব অনেক তদবীর করলেন যেন বদলীটা না হয়। কিন্তু কোন লাভ হলো না। জসিম সাহেবকে পাহাড়ে চলে আসতেই হলো।

    পাহাড়ে এসে জসিম সাহেবের ইনকাম বন্ধ। একদম বন্ধ তা ঠিক না। কিছু বাঙ্গালি সেটেলার তাকে হাত করে রেখেছে। কোন ঝামেলাতে জড়ালেই যেন তারা উদ্ধার পায়। এই তো গত পরশুর ঘটনা… পুরো একটা আদিবাসী গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে তারা। ঘর থেকে বেরোতে না পারায় একজন বৃদ্ধা পুড়ে ছাই। আগুনে পুড়ে আহত হয়েছে বেশ কয়েকজন আদিবাসী।

    দাউদাউ করে জ্বলছে মারমা গ্রামটা।
    থানায় ছুটে এলেন গ্রাম প্রধান উকাচিং মারমা।
    আমাদের গ্রাম জ্বালাই দিছে, স্যার।

    জসিম সাহেব মাত্র রাতের খাবার খেয়ে উঠেছেন। পরিষ্কার তোয়ালেতে হাত মুছতে মুছতে থুথু ফেললেন উকাচিং এর পায়ের সামনে। উকাচিং এর চেহারায় চাপা আতঙ্ক। কাঁপা কাঁপা স্বরে তিনি বললেন, স্যার, আমাদের সব জ্বালায়ে দিছে। সিং মারমার মা মারা গেছে। বের হতে পারে নাই ঘর থেকে। আমাদের ঘর বাড়ি সব শেষ। কিছু করেন স্যার।

    জসিম সাহেব ভ্রু কুঁচকে বললেন, ম্যালা বকবক কোরো না তো। আগুন ধরসে, এখন আগুন নিভাবা৷ আকাশের নিচে থাকবা ঘরবাড়ি না থাকলে। আর, কোন বুড়ি মরলো তাতে কী? বয়স হইছে এমনেই মরতো। এখন আগুনে পুড়ে মরলো। একই কথা। যাও তো!

    কথা শেষ করতে না করতেই মুখে একটা প্রচণ্ড ঘুসি খেলেন জসিম সাহেব। উল্টে পড়ে গেলেন মেঝেতে। উকাচিংকে আটকে রাখা হলো গারদের ভেতর। হাত পা বেঁধে উল্টো করে ঝুলিয়ে বেদম পেটানো হলো সারারাত। বেয়াদব বেল্লিক… কত বড় সাহস থানার ওসির গায়ে হাত তোলে!

    উকাচিং এখনো লকআপে পড়ে আছে। সারাগায়ে কালশিটে পড়ে গেছে। একগাদা মাছি ভনভন করে তার চারপাশে। পঁচে মরুক শালা। এসব ছোটলোকের বেঁচে থাকার অধিকার নেই। জসিম সাহেবের মনে হয়, আরো কয়েক ঘা দিয়ে আসার দরকার ব্যাটাকে। তারপর রাতের আঁধারে হাত পা বেঁধে সাঙ্গু নদীতে ফেলে আসা হবে। ডুবে মরবে।

    থানার কোন দায়বদ্ধতা থাকবে না। স্টেটমেন্ট দেওয়া হবে, তাকে কখনো থানায় আটকেই রাখা হয় নি। যেদিন আগুন লাগলো মারমা গ্রামে সেদিন উদ্ভ্রান্তের মতো দৌঁড়ে এসে ঘটনা থানায় জানিয়ে আবার দৌঁড়ে বেরিয়ে গেছে।

    কোন দিকে গিয়েছে সেটা অন্ধকারে কেউ ঠাহর করতে পারে নি। তবে মনে হয় নদীর দিকেই গিয়েছে। কোন অজ্ঞাত দুষ্কৃতিকারী দল তাকে সেখানে একা পেয়ে খুন করে নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছে। তারপর অজ্ঞাত কয়েকজনের নামে মামলা দায়ের হবে।

    সেই মামলা বছরের পর বছর চলতেই থাকবে। একটা সময় সুরাহা করতে না পেরে মামলা খারিজ করে দেওয়া হবে। আর যদি কোন ঝামেলাও হয় তবে সমস্যা নেই। আজকাল আদালতে অহরহ কর্তাব্যক্তি ঘুষ খান। কিছু পয়সা কড়ি ফেললেই মামলা ডিসমিস।
    সুতরাং, নো চিন্তা।

    জসিম সাহেব সেটেলারদেরকে দেওয়া কথা রেখেছেন। কড়কড়ে নতুন টাকার নোটের প্রতি তিনি দায়বদ্ধ। তাকে কথা রাখতেই হবে।জসিম সাহেব থানায় বসে ডেস্কের ওপর পা তুলে আয়েশ করে সিগারেট ফুঁকছিলেন।

    আর গালভর্তি ধোঁয়া ছাড়ছিলেন। বেনসন অ্যান্ড হেজেজ। ঠিক এই সময় একজন হাবিলদার এসে বললো, স্যার, এক লোক আপনার সাথে দেখা করতে চায়। রেইপ কেস।

    জসিম সাহেবের ঠোঁটের কোণে সূক্ষ্ম একটা হাসির রেখা ফুটলো। ইনকামের একটা বড় পথ খুলে গেছে। তিনি গমগমে স্বরে বললেন, পাঠায়া দাও।
    জসিম সাহেবের কথা শুনে হাবিলদার দ্রুতপায়ে তার রুম থেকে বেরিয়ে গেলো।

    মিনিট দুয়েক পর এলোমেলো পায়ে একজন যুবক প্রবেশ করলো। বিধ্বস্থ চেহারা। অবিন্যস্ত চুল। কনুইয়ের কাছে গভীর একটা ক্ষতচিহ্ন। সেখান থেকে চুইয়ে চুইয়ে রক্ত পড়ছে। যুবক হাঁটছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। পায়ে বেশ চোট পেয়েছে বোঝা যায়। রীতিমতো হাপাচ্ছে সে।

    জসিম সাহেব বললেন, নেন। পানি খান। শান্ত হইয়া বইসা কাহিনী কন!
    টেবিলের ওপর রাখা পানির গ্লাসটা এগিয়ে দিলেন যুবকের দিকে। যুবক ঢকঢক করে পানি খাচ্ছে। পানির দুটো ধারা তার ঠোঁটের দু’পাশ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে।

    মিনিট দশেক চুপ করে থাকার পর যুবক যা বললো তার সারসংক্ষেপ মোটামুটি এমন,
    তার নাম আবদুর রহিম। পাহাড়ের ঢালে বাড়ি। পেশায় চাষী। অন্যের জমি লীজ নিয়ে শাক সবজি চাষ করে।

    গত মৌসুমে এলাকার চেয়ারম্যানের কিছু জমি লিজ নিয়েছিলো। ফলনও খুব ভালো হলো। কিন্তু বিক্রি করার সময় দেখা গেলো, আড়তদার আর পায়কারী ব্যবসায়ীরা নামমাত্র মূল্যে চাষীদের কাছ থেকে ফসল আর সবজি কিনে নিচ্ছে। ভালো ফলনের পরেও আয় রোজগার নাই।

    নিজের চলার টাকা তো দূরে থাক চেয়ারম্যানের লীজের টাকাই সে পরিশোধ করতে পারলো না। চেয়ারম্যান শীতল কণ্ঠে বললেন, রহিম মিয়া, বাড়িতে যাও। দেখা যাবে।

    গতকাল মাঝরাতে আবদুর রহিমের বাড়িতে ডাকাত পড়ে। দা দিয়ে বেড়া কেটে বাড়ির ভেতর ঢোকে তারা। আবদুর রহিম ঘুটঘুটে অন্ধকারে বুঝতে পারে ডাকাত সর্দারের বেশে চেয়ারম্যানের ছেলে মনা মিয়া। বাড়িতে ভাঙ্গচুর শুরু করে তারা। মনা মিয়ার ইশারায় আবদুর রহিমকে একটা বাঁশের খুঁটির সাথে আটকে ফেলা হয়।

    আবদুর রহিমের বাড়িতে নতুন বৌ। ডাকাতরা আবদুর রহিমের সামনেই পালাক্রমে ধর্ষণ করে তার বৌকে। স্ত্রীর গগনবিদারী আর্তনাদের সাথে যোগ হয় আবদুর রহিমের অসহায় আর্তনাদ। একজন ডাকাত আবদুর রহিমের হাতে পায়ে কোপ দেয়। মাথায় সজোরে বাড়ি দেয়। আবদুর রহিম জ্ঞান হারায়।

    শেষরাতে যখন আবদুর রহিমের জ্ঞান ফেরে তখন সব শেষ। তার স্ত্রীর বিবস্ত্র মৃতদেহ পড়ে আছে তার সামনে। ধর্ষণের পর গলা টিপে তাকে হত্যা করে অমানুষগুলো।

    স্ত্রীর কথা বলতে গিয়ে আবদুর রহিমের সে কী কান্না! সে বলে, বিশ্বাস করেন স্যার, বৌ ছাড়া আমার কেউ ছিলো না। বাপ মা মইরা গেছে কবে! আমার জান ছিলো সে। আমার জানটারে তারা মাইরা ফালাইছে। আমারে শেষ কইরা দিছে।

    জসিম সাহেব তার দলবল নিয়ে মনা মিয়াকে গ্রেফতার করতে যান আর আবদুর রহিমের স্ত্রীর লাশ পাঠান পোস্ট মর্টেম করাতে।

    চেয়ারম্যান সাহেব পুলিশদের খুব খাতিরদারি করলেন। মোরগ জবাই করা হলো। দুই কেজি খাসির মাংস আর চিকন চালের পোলাও রান্না করা হলো। গৃহস্থের আপ্যায়নে জসিম সাহেব খুব খুশি। কিন্তু মনা মিয়াকে তো ছাড়া যাবে না। সে হলো টাকার খনি। তাকে দরকার।

    খাওয়াদাওয়া শেষে চেয়ারম্যান সাহেব বললেন, ওসি সাহেব, একটা ভুল হয়ে গেছে ছোট।
    জসিম সাহেব দাঁত খিলাল করতে করতে বললেন, কী?

    ছেলেরে বলছিলাম, আবদুর রহিমের বাড়িতে ডাকাতি করতে। আল্লাহ কসম। কিন্তু জোয়ান পোলাপান তো, কন্ট্রোল করতে পারে নাই। বয়সের দোষ। ব্যবস্থা করে দেন। একটু আধটু ভুল তো এই বয়সে পোলাপান করবেই।

    জসিম সাহেব হাসলেন, আমি আপনার ব্যবস্থা করবো আর আপনি আমার ব্যবস্থা করবেন না?
    চেয়ারম্যান তার দিকে একটা চেক এগিয়ে দিলেন, এই নেন পাঁচ লাখ টাকা। কাজ শেষ হলে আরো দশ লাখ পাবেন। আমি কথায় আর কাজে এক মানুষ।

    সেদিন পুলিশ মনা মিয়াকে গ্রেফতার করতে গিয়ে গ্রেফতার করে আনলো আবদুর রহিমকে। মানুষটা বুঝতে পারছে না তার দোষ কী। সে কী করেছে। ফ্যলফ্যাল করে সবার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকছে।

    যৌতুকের জন্য স্ত্রীকে খুন করেছে আবদুর রহিম। চাষ করে লসে পড়ে চেয়ারম্যানের লীজের টাকা শোধ করতে না পেরে তার নব্যবিবাহিতা স্ত্রীকে যৌতুকের জন্য চাপ দেয় সে। একপর্যায়ে সেদিন রাতে স্ত্রীকে পেটায় আবদুর রহিম। শেষে রাগের মাথায় স্ত্রীর গলা টিপে ধরে। স্ত্রী মারা যায়।

    মিথ্যা সাক্ষী আর ভুয়া পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট দেখিয়ে নিরীহ আবদুর রহিমের বিরুদ্ধে দায়ের করা এই অভিযোগ আদালতে সত্য বলে প্রমাণও হয়ে যায়।

    আবদুর রহিমের ফাঁসির রায় হয়। আবদুর রহিম শুধু রায় শুনে ওপরের দিকে তাকিয়ে বলে, এই দুনিয়া বহুত খারাপ। তোমার একা একা কষ্ট হইতেসে বৌ? আমি আইতাছি। চিন্তা নিও না।

    জসিম সাহেব সেই পাহাড়ের মাঝে বসেও রাতারাতি পনেরো লাখ টাকা কামিয়ে ফেলেন।

    সেই ঘটনার এক বছর পর।
    জসিম সাহেব বদলি হয়ে ঢাকায় ফিরেছেন এবার। তিনি এখন রমনা থানার ওসি। বহুদিন পর পরিবারের কাছাকাছি থাকতে পারছেন তিনি। এতদিন পাহাড়ে গ্রামে থেকে থেকে, এটাকে তার স্বর্গসুখ বলে মনে হচ্ছে।

    সেদিন সকাল থেকে খুব বৃষ্টি হচ্ছিলো। সন্ধ্যার পর বৃষ্টি আরো বেড়েছে। তখন রাত ন’টার কিছু পর। জসিম সাহেব থানায় বসে ভাবছিলেন, এই বৃষ্টিতে যদি গরম গরম খিচুড়ি খাওয়া যেতো এখন। সাথে এক চামচ ঘি। জসিম সাহেবের মোবাইল ফোন বেজে উঠলো।

    বাসা থেকে কল করেছে। কল রিসিভ করামাত্রই ওপাশ থেকে রাহেলার কান্নার শব্দ ভেসে এলো, তোমার মেয়েকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সন্ধ্যায় কোচিং এ গিয়ে সে আর ফিরে আসে নাই।

    জসিম সাহেবের মনে হলো, সবকিছু ফাঁকা হয়ে গেছে মুহূর্তেই। পায়ের তলায় মাটি ফাঁক হয়ে গিয়েছে আর তিনি সেই গর্তে পড়ে যাচ্ছেন। পড়ছেন আর পড়ছেনই। তার মেয়ের বন্ধু বান্ধবী, শিক্ষক সবার কাছে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো। কেউ কিচ্ছু জানে না।

    সন্ধ্যায় কোচিংয়েও সে আসে নি। সারারাত তন্ন তন্ন করে খোঁজা হলো মেয়েটাকে। কোথাও নেই। একরাতেই যেন জসিম সাহেবের বয়স বহুবছর বেড়ে গেছে। চোয়াল শুকিয়ে গেছে।

    ভোরবেলা তার মেয়ের খোঁজ পাওয়া গেলো। মহাখালীর এক নির্মানাধীন ভবনের ভেতর পড়ে ছিলো তার নিথর দেহ। রেইপ অ্যান্ড মার্ডার কেইস। মেয়ের মৃতদেহ দেখে গাল ভর্তি করে বমি করলেন জসিম সাহেব। ঠিক তখনই শুনলেন, কে যেন রিনরিনে গলায় কাঁদছে।
    জসিম সাহেব চিৎকার করে বললেন, কে? কে কাঁদে?
    নারীকণ্ঠে উত্তর এলো, আমি।

    জসিম সাহেব চকিতে ঘুরে তাকালেন। একজন তরুণী। আবছামতো দেখা যাচ্ছে তাকে। অস্পষ্ট একটা নারী অবয়ব। একজন দুঃখী তরুণী। চেনা চেনা লাগছে তাকে! কে সে? জসিম সাহেব কোথায় দেখেছেন তাকে?
    আরে! এই তরুণী আবদুর রহিমের মৃতা স্ত্রী না? এই দিনের আলোয় কি তিনি ভূত দেখছেন? আশেপাশের কেউ কি এই ভূত দেখছে না?

    জসিম সাহেব বললেন, তুমি আবদুর রহিমের বৌ না?
    অবয়ব বোধহয় মাথা দোলালো।
    জসিম সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, তোমার নাম কী?
    নাম দিয়া কাম কী? তরুণী খিলখিল করে হাসছে।

    জসিম সাহেব ভয় পাচ্ছেন। তার কপাল থেকে ঘাম গড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে।
    তরুণী বললো, পাপ বাপরেও ছাড়ে না ওসি সাহেব। নগর পুড়লে বলে দেবালয়ও রক্ষা পায় না। আর আপনি তো কোন নরকের কীট!
    অ্যাই, তোমার নাম কী?

    মাসুমা। মাসুমা মানে জানেন তো? নিষ্পাপ।

    জসিম সাহেব তার কেবিনে বসে আছেন। ঠিক তখন খুট করে কেবিনের দরজাটা খুলে গেলো। ডিউটিতে থাকা ডাক্তার আরিফ ঢুকলেন। মৃদুস্বরে বললেন, একটা খারাপ খবর আছে জসিম সাহেব।
    জসিম সাহেব একটু নড়েচড়ে বসলেন।

    ডাক্তার আরিফ বললেন, আমাদের কাছে কল এসেছিলো। গতকাল রাতে গ্যাসের সিলিন্ডার বার্স্ট হয়ে আপনার স্ত্রী মারা গেছেন। আপনার ছেলেটা গুরুতর আহত। মনকে শক্ত করুন জসিম সাহেব।

    জসিম সাহেব হাসির শব্দ শুনলেন। দু’টো কণ্ঠস্বর। একটা নারীকণ্ঠ। অপরটা পুরুষকণ্ঠ। জানালার দিকে তাকালেন তিনি। জানালার পাশে বসে মাসুমা আর উকাচিং মারমা হাসছে।
    আজ তাদের মনে খুব আনন্দ।

    “যুগের ধর্ম এই-
    পীড়ন করিলে সে পীড়ন এসে পীড়া দেবে তোমাকেই।”
    – কাজী নজরুল ইসলাম

    শাহরিয়ার জাওয়াদ
    তৃতীয় বর্ষ,
    প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান,
    চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২
    ১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
    ২০২১২২২৩২৪২৫২৬
    ২৭২৮২৯৩০৩১