• শিরোনাম

    রাজপথের এক সাহসী নারী এমপি রত্না আহমেদের জীবনের গল্প

    গাংচিল ডেস্ক | ১৮ আগস্ট ২০২০


    রাজপথের এক সাহসী নারী এমপি রত্না আহমেদের জীবনের গল্প

    নারীদের পথপ্রদর্শক রত্না আহমেদ। জীবন যুদ্ধে তিনি ছিলেন দ্বায়িত্ববান স্ত্রী, রত্নগর্ভা মা, আর্দশ রাজনীতিবিদ। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগ নাটোর জেলায় সভাপতির দ্বায়িত্ব পালন করছেন। সেই সাথে চলতি সংসদে তিনি নাটোর-নওগাঁ সংরক্ষিত মহিলা আসন-৩৪৩ এ সংসদ সদস্য হিসেবে তার দল থেকে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। এই দীর্ঘ পথচলা নিয়ে দি গাংচিল ডট কমের নাটোর জেলা প্রতিনিধি সুষ্ময় দাস কথা বলেছিলেন তার সাথে। চলুন জেনে আসি কি কথা হয়েছিলো বিশেষ এই সাক্ষাৎকারে?

    ১) মাননীয় সংসদ সদস্য আপনার শৈশব কোথায় এবং কেমন কেটেছে?


    আমার শৈশব কেটেছে নলডাঙ্গা উপজেলার ব্রহ্মপুর গ্রামে। ব্রহ্মপুর প্রাইমারি স্কুলে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত অধ্যয়ন করেছি। আমি অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত ব্রহ্মপুর হাই স্কুলে অধ্যয়ণ করেছি। অষ্টম শ্রেণীতে আমি ফাস্ট ক্লাস বৃত্তি পায়। ছাত্রজীবনে আমি সবসময় প্রথম হয়েছি। নবম শ্রেণীতে উঠার পর আমি নাটোরে আসি। ব্রহ্মপুরের সেই সময়টা আমার জীবনে স্বর্ণযুগের মত ছিল। গ্রাম অনেক সুন্দর ছিল। মানুষের মধ্যে এত হিংসা বিদ্বেষ ছিল না। মানুষে মানুষে সহমর্মিতা ছিল। হিন্দু, মুসলমান একে অপরের সুখ দুঃখে পাশে দাঁড়াতো। হিন্দুদের যেকোন পূজাপার্বনে আমরা একাত্ব হয়ে যেতাম আবার আমাদের ঈদেও তারা আমাদের সাথে মিশে যেত। মনে হত এক আত্মা। সেই সময়ের পরিবেশটা অনেক ভালো ছিল।

    ২) আপনার সময় নারীদের শিক্ষা গ্রহণ করা ছিল বেশ কঠিন। সেই সময়ে কিভাবে এই প্রতিকূল অবস্থা সামাল দিয়েছেন? এবং আপনাকে লেখাপড়ায় সবচেয়ে বেশি কে উৎসাহিত করতেন?


    আমার লেখাপড়ায় সবচেয়ে বেশি উৎসাহিত করেছে আমার মা। আমার মা ও একজন রত্নগর্ভা। আমার বড়বোন পঞ্চমশ্রেণী পাশ করার পরে আমাদের এলাকায় তখন কোন হাই স্কুল ছিল না। বড়বোনের প্রতিভা দেখে আমার মা সেই সময় তাকে রাজশাহী পিএন বালিকা বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দেয় এবং আমার মায়ের মামা বাড়ি থেকে তার লেখাপড়ার ব্যবস্থা করে । আমার মেজ বোনও রাজশাহীতে পড়ালেখা করে। সেখান থেকেই আমাদের পথচলা শুরু। আমরা সব ভাই বোন অনেক মেধাবী ছিলাম। মেয়েদের যে লেখাপড়া শেখাটা গুরুত্বপূর্ণ সেই বিষয়ে মা সবসময় উৎসাহিত করতেন। কিন্তু আমাদের সমাজব্যবস্থা তখন আমাদের খুব বেশি অনুকূলে ছিল না। গ্রাম্য মোড়ল শ্রেণীর একদল মানুষ সবসময় আমাদের বাঁধা সৃষ্টি করত। তারা বলত মেয়েদের এত লেখাপড়া করে কি হবে? তাদের বিয়ের পরে তো সেই রান্নাঘর সামলাতে হবে। কিন্তু আমার মায়ের সাহস এবং বাবার উৎসাহে আমরা লেখাপড়া করেছি।

    ৩) আমরা যতটুকু জানি আপনার স্বামী ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। আপনার বিয়ে হয়ে একজন স্ত্রী হিসেবে অন্য একটি পরিবারে আসা এবং আপনার পরিবার নিয়ে যদি কিছু বলেন?


    আমার স্বামী বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত আহম্মেদ হোসেন চম্পা। ১৯৭১ সালে যখন মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয় তখন আমি নবম শ্রেনীর ছাত্রী এবং বড়ভাই তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করত। রাজশাহী থেকেই আমার ভাই ভারতে চলে যায় মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে।তখন আমার বাবাকে ব্রহ্মপুর গ্রামের রাজাকারদের মাধ্যমে পাকিস্থানী মিলিটারী বাহিনী ধরে নিয়ে যায় এবং তারা আমার বাবাকে প্রশ্ন করে তোমার ছেলে কোথায়? সে কি মুক্তিযুদ্ধে গেছে? আমার বাবা তখন তাদের জানায় যে আমার ছেলে রাজশাহীতে পড়ালেখা করে আমি জানিনা সে মুক্তিযুদ্ধে গেছে কিনা? তারা আমার বাবার কথা বিশ্বাস করেনি। আমার বাবাকে অনেক নির্যাতন করে মিলিটারী লাথি দিয়ে বাবার বুকের একপাশের পাজর ভেঙ্গে দেয়। তখন থেকেই আমাদের স্বাধীনতার এবং আওয়ামীলীগের পক্ষে কাজ শুরু। আমি নিজেও অত্যন্ত সৌভাগ্যবান ছিলাম আমার বিয়ে হয়েছে একজন মুক্তিযোদ্ধার সাথে। আমার স্বামীর বড়ভাই উলফাত হোসেন নাটোরে সম্মুখযুদ্ধে প্রথম শহিদ হয়। যুদ্ধে আমার মামাশ্বশুরের একটি পা উড়ে যায়। বাকিজীবন তিনি কাঠের পা ব্যবহার করতেন। আমার স্বামীও যুদ্ধে আহত হয় কিন্তু তিনি বেঁচে যান। আমার পরিবার সবসময় আওয়ামীলীগের পক্ষে কাজ করেছে। আর একটা বিষয় আপনাদের বলে রাখি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন স্বাধীনতার আগে নাটোরে আসতেন দলীয় কাজে তখন তিনি আমার শ্বশুরের নাটোর বোডিং নামে বোডিং এ অবস্থান করতেন। আমার শ্বাশুরী বাসায় সুন্দর সুন্দর রান্না করে তাকে খাওয়াতেন। আমার শ্বাশুরীর কাছে এই গল্প অনেকবার শুনেছি। নাটোর বোডিং এর সেই কক্ষটা সংরক্ষণ করার চেষ্টা করেছি সবসময়। কিন্তু ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্য করার পরে নাটোরের অবস্থা খুবই ভয়াবহ হয়ে যায় এবং আমাদের সেই কক্ষটা সংরক্ষণ করা আর সম্ভব হয়ে উঠেনি। কক্ষটি এখনও আছে। আমরা সেইভাবে সংরক্ষণ করতে না পারলেও যথাসম্ভব সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছি। আমার বাবার বাড়ি এবং শ্বশুরবাড়ির পরিবার আওয়ামীলীগের জন্য অনেক কষ্ট করেছে এবং আমরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বুকে ধারন করে বেঁচে আছি। আওয়ামীলীগকে ভালোবেসে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার জন্য দিনরাত চেষ্টা করছি। আমি থানা মহিলা আওয়ামীলীগের সভাপতি ছিলাম প্রায় ১৫ বছর, জেলা মহিলা আওয়ামীলীগে আছি প্রায় ১৭ বছর। আমি আমার অবস্থান থেকে নাটোরে অবহেলিত নারী সমাজের ভাগ্য উন্নয়নে কাজ করছি। ১৯৯৬ সালে যখন দল ক্ষমতায় আসে তখন নাটোরে আমরা হেরে যায় সিটটা বিএনপি পায়। তখন এই বিষয়ে একটা মিটিং হয় যে নাটোরে আওয়ামীলীগের এত জনপ্রিয়তা থাকার পরেও কেনো সিটটা পাওয়া গেল না। সার্ভে রিপোর্টে উঠে আসে ভাই এবং বাবারা নৌকায় ভোট দিলেও তাদের মেয়ে বউরা নৌকায় ভোট দেয়নি তারা মৌলবাদিদের বিভিন্ন প্রচারে ভাবে থেকে যে নৌকায় ভোট দিলে এটা হিন্দুস্থান হয়ে যাবে, আযান শোনা যাবে না, ইত্যাদি। আমি তখন থানা মহিলা আওয়ামীলীগের সভাপতি। আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয় মহিলাদের সচেতন করতে হবে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ তাদের মাঝে প্রতিস্থাপন করতে হবে। তখন আমি, সমাজসেবা, মহিলা অধিদপ্তর, যুব উন্নয়ন কার্যালয় থেকে মেয়েদের নিয়ে ২৪০ টি সমিতি করি এবং মৌলবাদিদের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে প্রচার করতে শুরু করি। এইকাজে সাধারণ নারীদের তেমন সহযোগিতা না পেলেও জেলা আওয়ামীলীগ আমাকে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করে। এরই ফলশ্রুতিতে আপনারা আজ নাটোরে মহিলা আওয়ামীলীগের এত জোয়ার দেখতে পাচ্ছেন।

    ৪) পরিবারে স্মৃতিময় একটি ঘটনা যদি আমাদের বলেন?

    আমার মেয়ে ১৯৭৫ সালের ২০ আগষ্ট জন্মগ্রহণ করে। ১৫ ই আগষ্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। সেই সময় আমি সন্তানসম্ভ্যাবা এবং অসুস্থ ছিলাম এবং আমার স্বামী না পালিয়ে বাসাতেই লুকিয়ে ছিলেন। ১৭ ই আগষ্ট রাতে সেনাবাহিনী আমাদের বাড়ি ঘেরাও করে নেই এবং আমার স্বামীকে অনেক মারধর করে হাত পা বেঁধে ধরে নিয়ে যায়। তারপর আমার প্রথম সন্তান সুমনা আহমেদের জন্ম হয় ২০ আগষ্ট। সেই সময় আমার সন্তান ডেলেভারি করতে অনেক সমস্যা হয়। সেই সময় আমার স্বামী আমার পাশে থাকতে পারেননি। আপনারা জানেন প্রথম সন্তান সবার প্রিয় হয়। জন্মের পর আমার সন্তান তার বাবার মুখটা দেখতে পায়নি। তিনমাস পরে তার জামিন হয়। এটা আমার জীবনের একটি কষ্টকর স্মৃতি।

    ৫) আপনি একজন রত্নগর্ভা মা, আপনার সন্তানরা দেশের বাহিরে প্রতিষ্ঠিত। এই যে সংসার আবার স্বামী হঠাৎ করে প্রয়াত হওয়া সবমিলিয়ে সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করার পেছনের গল্পগুলো যদি আমাদের বলেন?

    আমার মেয়ে সুমনা আহমেদের যখন জন্ম হয় তখন তার বাবা জেলে ছিলেন। এরপর আমার মেয়ে ধীরে ধীরে বড় হলো। এরমধ্যে আমার আরেক সন্তান রাকিব আহমেদ পাপনের জন্ম হলো। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর সেই বিভিষীকাময় ২১ টি বছর ছিল। কখন গেপ্তার হবো কখন আটক করবে? এই আতঙ্ক ছিল। জিয়াউর রহমান এবং এরশাদ তারা দুজনই আওয়ামীলীগের ওপর অনেক নির্যাতন করেছে। আমার মেয়ে যখন বড় হচ্ছে এরশাদ তখন ক্ষমতায়। আমরা আওয়ামীলীগ করি তার কারনে আমার মেয়েকে স্কুলে যাবার সময় অনেক উত্যক্ত করত। বাজে বাজে কথা বলত বখাটে ছেলেরা। এমনও বলত জয়বাংলা যাচ্ছে ধর ধর। আমার মেয়ে এসব দেখে অনেক কষ্ট পেত। একটা দল করা কি অপরাধ,বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসা কি অপরাধ, বাংলাদেশকে স্বাধীন করা কি অপরাধ? এসব প্রশ্ন সবসময় তার মাথায় ঘুরত। আমার মেয়ে আমার মতই অনেক মেধাবী ছিল। ছাত্রজীবনে সে সবসময় প্রথম হতো। এরপর মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে আমার মেয়ে। আমার তিনটা বোন ও একটি ভাই আমেরিকা থাকে। আমার বড় দুলাভাই জননেত্রী শেখ হাসিনার ভাই শেখ কামালের বাল্যবন্ধু ছিলেন। সেই সময় আমার মেয়ে বলল লেখাপড়া করতে সে আমেরিকা যাবে। তখন অনেক কষ্ট করে আমি আমার মেয়েকে ঢাকায় এক ভাইয়ের বাসায় নিয়ে যায় এবং তোফেলে ভর্তি করে দেয়। রাজনীতি করার জন্য আমার স্বামী বেশিরভাগ সময় জেলে থাকত, হুলিয়া থাকত,পালিয়ে থাকত। সেই সময় আমার অনেক কষ্ট হত একবার ঢাকায় যাওয়া একবার নাটোর আসা। এরমধ্যে আমার মেয়ে অনেক ভালো ফলাফল করে এবং সে আমেরিকার বেশকিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দেয় এবং কৃতকার্য হয়। সেই সময় স্টুডেন্ট ভিসাতে আমেরিকা যেতে খরচ হয় প্রায় সাড়ে ১৭ লাখ টাকা। আমি আমার আত্মীয় স্বজনদের নিকট থেকে সহযোগিতা নিয়ে আমার মেয়েকে আমেরিকা পাঠায়। ৭ বছর পর ছেলে বড় হয়ে বড়বোনের দেখাদেখি সেও স্টুডেন্ট ভিসাতে আমেরিকা যায়।

    ৬) আপনিতো রাজনীতি করেন এবং আপনার দলের গুরুত্বপূর্ন দায়িত্ব পালন করছেন, আপনি রাজনীতিতে কিভাবে আসলেন?

    ১৯৭১ সালে যখন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো তখন আমি নববিধান বালিকা বিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিলাম। বঙ্গবন্ধু যখন অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলেন যে শুধুমাত্র ব্যাংক, বিমা খোলা থাকবে, বাকি সব বন্ধ। সেই সময় আমাদের আশেপাশের অনেক পাকিস্থানপন্থী মানুষ অনেকেই স্কুল কলেজ বন্ধ করতেন না। সেই সময় ছাত্রনেতা রেজা ভাই, রঞ্জু ভাই, সেলিম ভাইয়ের নেতৃত্বে আমরা স্কুল কলেজ বন্ধ করতাম। রাস্তায় বের হতাম, মিছিল করতাম। মিটিং করতাম। এরপর যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলো তখন আমি গ্রামে চলে যায়। যুদ্ধে রেজা,রঞ্জু,সেলিম ভাই শহীদ হলেন। যুদ্ধ চলাকালিন আমার ভাই যুদ্ধে চলে যায়, রাজাকাররা আমার বাবাকে ধরে নিয়ে গিয়ে অনেক নির্যাতন করেন। এরপরেই আমরা দৃঢ়ভাবে অনুপ্রাণিত হলাম, এই দেশ স্বাধীন করতেই হবে। আমি তখন মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার দিতাম, পানি দিতাম, আম্মাকে বলতাম তাদের মুখ শুকিয়ে গেছে, তাদের মুড়ি চিড়া দেও, আমার মা খিচুড়ি রান্না করে দিত মুক্তিযোদ্ধদের। এভাবেই রক্তে চলে এলো মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শ। তখন থেকেই আমার রাজনীতিতে আসা এবং দলীয় পদপদবী পায় ১৯৯১ সালে।

    ৭) আপনি যদি রাজনীতিতে না আসতেন তাহলে কি করতেন?

    এটি একটি মজার প্রশ্ন। ছোট থেকেই আমি স্বপ্ন দেখতাম শিক্ষক হবো। সেটা, প্রাইমারি স্কুল, হাই স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় যেটাই হোক না কেন। আমাদের সময় শিক্ষকরা অনেক আদর্শবান ছিলেন্ তাদের দেখলে শ্রদ্ধা এবং সম্মানে মাথা নত হয়ে আসত। এখনকার শিক্ষক মহোদয় এবং ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে তেমন মূল্যবোধ আর দেখি না। তখন শিক্ষকরা ছিল সমাজের উচুশ্রেনীর মানুষ। তারা জ্ঞানের কথা বলত। আমার মনে হত আমিও শিক্ষক হয়ে জ্ঞানের কথা বলবো। আমার অনেক শিক্ষার্থী থাকবে। সবাই আমাকে সম্মান করবে।

    ৮) রাজনীতি করতে গিয়ে প্রতিকূল যে পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন তারমধ্যে যেকোন একটি ঘটনা যদি আমাদের বলেন?

    মহিলাদের রাজনীতি করা সেই সময় অনেক কঠিন ছিল। খুব অল্প আমরা তিন চার জন ছিলাম রাজনীতিতে। তখন আমি একজনের স্ত্রী, একটি বাড়ির গৃহবধু। আমি যখন প্রথম রাজপথে মিছিলে যায় তখন আমার শ্বশুর এবং পরিবারের লোকজনদের এলাকার মানুষ অনেক অপমান করে। তাদের আপত্তি বাড়ির বউ কেন রাজপথে মিছিল করবে, জোরে জোরে হেটে যাবে, জয়বাংলা বলে স্লোগান দেবে? কিছু মৌলবাদী লোকজন আমার শ্বশুরকে এসে এসব করতে নিষেধ করতে বলে যায়। তখন আমার স্বামী আমার পাশে এসে দাঁড়ায় তিনি মেয়েদের রাজনীতি করার গুরুত্ব সবাইকে বোঝায় । তারপরে পরিবার থেকে তেমন বাঁধা পায়নি কিন্তু এলাকার মানুষ সবসময় আমাকে কটাক্ষের চোখে দেখত্ । আমি সেসব গায়ে মাখতাম না। এইসব প্রতিকূলতা জয় করেই আমি আজ এখানে এসেছি।

    ৯) আপনি একজন মাননীয় সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মানুষকে আরো কাছে থেকে সহযোগিতা করার সুযোগ পেয়েছেন। এই সুযোগটি কিভাবে কাজে লাগাচ্ছেন?

    এটা খুব ভালো একটা প্রশ্ন। আমি এটাই চেয়েছিলাম যে মানুষকে কিভাবে সহযোগিতা করবো।
    আপনারা জানেন যে ২০০৯ সালে আমার দল থেকে আমাকে উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন দেওয়া হয়। সেইসময় আমি ১ লাখ ৬১ হাজার ভোট পেয়ে বিপুল পরিমান ভোটে নির্বাচিত হয়। আমি মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হবার পরে দেখলাম আমাদের ক্ষমতা খুবই সীমিত। তখন খুব ব্যাথিত হয় যে জনগন এত আশা নিয়ে আমাকে ভোট দিয়েছে কিন্তু আমি কোন প্রতিষ্ঠানে একটন গমও দিতে পারিনি। আমি সবসময় গরীব দুঃখি মানুষের জন্য কাজ করেছি। অনেকে বলে আমি গরীবের এমপি, গত দেড় বছরে আমি উপাধি পেয়েছি গরীবের এমপি। এমপি হবার আগেও আমি আমার আত্মীয়স্বজনের নিকট হতে সহযোগিতা নিয়ে গরীব মা বোনদের সেলাই মেশিন কিনে দিয়েছি। আজ থেকে দশ বছর আগে খুব খড়া দেখা দেয়, পানির স্তর অনেক নিচে নেমে যায়। সেই সময় আমি ৪০ টি সাবমারসিবল টিউবয়েল বসিয়েছি গ্রামে। তখন থেকেই আমার অনেক ইচ্ছা আমি যদি কোন বড় জায়গায় যায় মানুষের জন্য অনেক কাজ করবো। মহান আল্লাহতালার ইচ্ছায় এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার দয়ায় বঙ্গবন্ধুর একজন ক্ষুদ্রকর্মী হিসেবে নাটোর নঁওগা সংরক্ষিত আসন থেকে দায়িত্ব পেয়েছি। আমি নেত্রীকে কথা দিয়েছিলাম আমার দ্বারা কখনও দুর্নীতি হবে না। আমি যতটুকু সরকারী অনুদান পাবো তা মানুষের উপকারে ব্যয় করবো। নাটোর ও নলডাঙ্গার যেখানে প্রয়োজন মসজিদ, মন্দির, গোরস্তান, শ্মশান, রাস্তা, স্কুল সবজায়গাতে অনুদান দিয়ে সমস্যা সমাধান করার চেষ্টা করছি। আপনারা সার্ভে করলে দেখতে পারবেন আমার অনুদান থেকে কোথাও ঘুষ দিতে হয়না। কেউ নিলে বা চাইলে তা আমাকে জানাতে বলেছি। জাতির পিতার কন্যার আলোকিত গ্রাম গড়ার জন্য আমি নলডাঙ্গাতে স্ট্রিট লাইট দিয়েছি। নাটোর সদরেও কিছু জায়গায় কাজ করছি। রাতে বের হলে দেখতে পারবেন গ্রামগুলো আলোকিত হচ্ছে। এছাড়াও আমার আরো একটি বড় অর্জন আমি নাটোর জেলার গরীব, দুঃখী, মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যদের নিকট হতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবর আবেদন নিয়ে যায়। সেখান থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব তহবিল হতে চিকিৎসা ভ্রাতা হিসেবে বরাদ্দ চেয়ে নিয়ে আসি এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে দয়া করে তা দেন্। গত দেড় বছরে প্রায় ২০ লাখ টাকা চিকিৎসা ভাতা হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব তহবিল থেকে নিয়ে এসেছি। এটি আমার বিশাল একটি অর্জন।

    ১০) আগামীতে নাটোর নিয়ে আপনার স্বপ্নগুলো যদি আমাদের বলেন?

    নাটোর একটি ঐতিহ্যবাহী প্রাচিন শহর কিন্তু সারাদেশের সাথে তাল মিলিয়ে নাটোরে সেইভাবে উন্নয়ন হয়নি। এটা আমাদেরই দোষ আমরা নাটোরের প্রয়োজনীয়গুলো হয়ত মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট সেইভাবে তুলে ধরতে পারিনি। অন্যান্য সংসদ সদস্যদের মত আমি আমার ক্ষুদ্র প্রয়াস থেকে নাটোরে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের আবেদন জানিয়েছি এবং মহান সংসদেও এবিষয়ে বলেছি। এছাড়া কৃষকদের কাঁচা পন্য, সবজী সংরক্ষণের জন্য ভালো মানের খাদ্য গুদাম, বিশেষায়িত হিমাগার স্থাপনের জন্য বলেছি। নাটোরে হালতি বিল সহ অনেক পর্যটন কেন্দ্র আছে। পর্যটনখাতকে উন্নত করতে সরকারীভাবে হোটেল,মোটেল স্থাপনের জন্য কাজ করছি। বঙ্গবন্ধু দিঘাপতিয়া রাজবাড়িকে গণভবন ঘোষণা করেন। তিনি এখানে কিছু মিটিং ও করেছেন। পরবর্তীতে এখানে আর মিটিং হয়নি। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বিশেষভাবে অনুরোধ জানাবো বছরে একটা অথবা দুই বছরে একটা মিটিং এখানে করার জন্য । এর ফলে গণভবন তার ঐতিহ্য ফিরে পাবে এবং নাটোর অনেক সমৃদ্ধ হবে। কর্মজীবি মহিলাদের হোস্টেল স্থাপনের জন্য আমাদের নেত্রী ইন্দিরা আপার নিকট দরখাস্ত দিয়েছি। সবমিলিয়ে নাটোর কে নিয়ে আমার অনেক স্বপ্ন। জানিনা কতটুকু বাস্তবায়ন করতে পারবো।

    ১১) কোভিড-১৯ এর দূর্যোগে আপনি ফুড ব্যাংকের মাধ্যমে অসহায় মানুষদের সহযোগিতা করছেন। ফুড ব্যাংক নিয়ে যদি কিছু বলেন?

    কোভিড-১৯ একটি বৈশ্বিক সমস্যা। উন্নতদেশগুলো তাদের অর্থনীতি একং জীবনমাল রক্ষায় হিমশিম খাচ্ছে সেখানে বাংলাদেশ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখছে। সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত পরিমানে সহযোগিতা করা হয়েছে। আমরা সেটা মনিটরিং করেছি । একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমি আমার বিদেশী আত্মীয়স্বজন ছেলে মেয়ের সহযোগিতা নিয়ে একটি ফান্ড গঠন করি। এবিষয়ে আমার মেয়ে সুমনা আহমেদ এর ভূমিকা সবচেয়ে বেশি সে নিজে আত্মীয়স্বজনদের বুঝিয়ে সেখান থেকে আমাকে একটা ভালো অংকের তহবিল পাঠায়। যা দিয়ে এখন পর্যন্ত আমি ৫০০০ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি। চাল,ডাল, আলু,সাবান, পেঁয়াজ সহ নগদ টাকা বিতরণ করছি। এই বিতরণ এখনও অব্যাহত আছে, বন্যাদূর্গত এলাকায় বিতরন করছি। এছাড়াও প্রায় প্রতিদিন আমার অফিস থেকে অসহায় গরীবদের বিতরন করছি। ইনশাল্লাহ ভবিষতে এই বিতরণ অব্যাহত থাকবে।

    ১২) রাজনীতিতে আপনার ভবিষৎ পরিকল্পনা কি?

    আমার স্বামীর মৃত্যুর পর আমার মেয়ে আমাকে আমেরিকা নিয়ে গিয়েছিল। আমি থাকতে পারিনি। বাংলাদেশের টানে চলে এসেছি। গরীব দুঃখী মানুষের জন্য কাজ করতে চাই আমৃত্যু। রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ,আওয়ামীলীগের আদর্শ নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে একজন ক্ষুদ্র কর্মী হিসেবে কাজ করে যাবো। নাটোরে প্রত্যেকটি জায়গায় বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে পৌছে দিতে কাজ করে যাবো।

    ১৩) বর্তমান রাজনীতিবিদদের সাথে আপনার পার্থক্য কি?

    আমি নিঃস্বার্থভাবে কাজ করছি। আমার স্বামীর দেওয়া বাড়ি,গাড়ি রয়েছে। আমার ছেলে মেয়ে বিদেশে সুপ্রতিষ্ঠিত। রাজনীতি থেকে টাকা আয় করা আমার লক্ষ্য না। মানুষকে কিভাবে সহযোগিতা করবো, মানুষ কিভাবে আমার থেকে উপকৃত হবে সেই লক্ষেই কাজ করছি। আমি মনে করি আমার পার্থক্য এখানেই। মানুষকে সেবা দিয়ে আমার জীবনটা শেষ করতে চাই।

    ১৪) একজন সফল নারী হিসেবে আপনি অন্য নারীদের উদ্দেশ্য যদি কিছু বলেন?

    নিঃস্বার্থভাবে কিছু করলে যে তার ফল পাওয়া যায় আমি তার একটি উদাহরণ। আমার হাতে গড়া নাটোর সদর থেকে নাটোর জেলা মহিলা আওয়ামীলীগ। আমার স্বামী ১৬ বছর আগে মারা গেছে । এরপরও অনেক প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়ে আমার এখানে আসা। আমি নারীদের উদ্দেশ্যে একটি কথায় বলতে চাই তোমরা পড়ালেখা করো, শ্রম দেও, নিঃস্বার্থভাবে দুর্নীতিমুক্ত হয়ে কাজ করো তোমাদের মূল্যায়ন হবেই। রাজনীতি,চাকরী,ব্যবসা যে সেক্টরেই যাও সফল হবে।

    অসংখ্য ধন্যবাদ মাননীয় এমপি মহোদয় আমাদের সময় দেবার জন্য।

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫১৬
    ১৭১৮১৯২০২১২২২৩
    ২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
    ৩১