• শিরোনাম

    শ্রাবণ সন্ধ্যায় বাণীর তৃষ্ণায়ঃ লাবণ্য কান্তা

    | ০৬ আগস্ট ২০২০


    শ্রাবণ সন্ধ্যায় বাণীর তৃষ্ণায়ঃ লাবণ্য কান্তা

    তখন সবে মাত্র আমি রবীন্দ্রনাথের গানের জগতে প্রবেশ করছি। তখন কম্পিউটার, ল্যাপটপ, ইন্টারনেটের সময় ছিল না; এমন কী তখন সিডিও ছিল না। হিন্দি ছবি দেখার জন্য প্রতিটি বাসায় এন্টেনা লাগানো হতো। আমাদের সিলেটে যে বাঁশটিকে বোরো বাঁশ বলে, ঢাকাতে দেখতাম সেই বাঁশটি কিনে এনে তারই মাথায় সরা ঢাকনা বেঁধে দাঁড় করিয়ে  দেয়া হতো। টিভি অন করে সকল সময় বাঁশ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চ্যানেল আনতে হতো। ডিডি-১ আর ডিডি-২ এই দুটি চ্যানেল দেখা যেতো; সাথে কি আরো চ্যানেল দেখা যেতো! আজ আমার মনে নেই। হিন্দি ছবি, ভারতীয় বাংলা ছবি দেখার জন্য হাহাকার মানুষের মনে। কর্মব্যস্ত জীবনে তা যেন বাড়তি  বিনোদন। এমন বিনোদনের জন্য মানুষ দিনরাত বাঁশ ঘুরাতো। আমিও ঘুরিয়েছি।  আমি বাঁশ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বলতাম হয়েছে বাবা! বাবা বলতেন আরেকটু ঘুরাও, আরেকটু, ক্লিয়ার হয়নি তো! আমি আবার ঘুরাতাম। আবার বাতাসে নড়ে গেলে আবার ঝিঝিপোকা এসে টিভির পর্দায় নাচানাচি শুরু করতো। সেই সাদাকালো টিভিতে কতো যে কসরত। এইভাবে আবার আবার আবার। এ শুধু আমাদের বাসার  কথা নয়! এই ভাইরাসে আক্রান্ত পুরো দেশ তখন।

    তখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি থেকে কাব্যছন্দে রচিত ‘ রামায়ণ ’ নিয়ে এসেছি, আর তাই পড়ি। রামায়ণ  পড়ার সাধ জেগেছিলো সেই চ্যানেলে রামানন্দ সাগরের বানানো সিরিয়াল রামায়ণ দেখে। সেই যে পড়া শুরু হলো ___ শেষ হলো না।আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা পড়তে শুরু করেছি তারও আগে থেকে। পড়তে পড়তে  কখনো তাঁর কবিতা, কখনো গল্প পড়তে পড়তে  একটা সময় তাঁর গানের এমন পাগল হলাম যে, রবীন্দ্র সঙ্গীত না হলে যেন কিছুই হয়ে ওঠে না। ঠিক কোন গানটি প্রথম শুনেছি সেই কথা মনে নেই; তবে ‘ আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়েছিলে  দেখতে আমি পাইনি তোমায়’ এই গানটি প্রথম প্রথম আমার মনের উপর প্রভাব বিস্তার করেছে যেন আমার সবকিছুতে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। আমাদের  একটি ছোট লাল টেপ রেকর্ড কেনা হলো। আমি কাজের সঙ্গে গানের তাল ঠিক রাখি। গান না শুনে কোনও কাজ করাই হয় না। কাজের ফাঁকে ফাঁকে গিয়ে ক্যাসেট বদল করি। এপিঠ ওপিঠ করে করে গান শুনি।


    এইভাবে করে কখনো কখনো একটি গান সারাদিন শুনি, অনেকবার শোনতে শোনতে একেকটি গানের প্রতি  এমন মায়া জন্মায় যে, ঘুমানোর সময় টেপ রেকর্ডটি মাথার কাছে না রাখলে মনে হয় কি যেন হারিয়ে গেল। এইভাবে গান মনের মধ্যে খুঁটি গাঁড়তে শুরু করলে রবীন্দ্রনাথের গানই বেশি শোনা হতো। নজরুল-আধুনিক-হিন্দি সবের উপর মায়া থাকে কিন্তু রবীন্দ্র সঙ্গীত এমনভাবে ভর করলো মাথায়। দিনরাত গানের সঙ্গে বসবাস। হাজার ব্যস্ততা, হাজার কাজের ভিড় কিন্তু সবকিছুতেই যেন গানই শক্তি যোগাচ্ছে … তাকে ছাড়া কিছুই হয়ে উঠছে না।

    হাতে গোনা বিশ থেকে পঁচিশটি ক্যাসেট রয়েছে __ তার মাঝেই রবীন্দ্র-নজরুল- আধুনিক- হিন্দি সব গান। সেই অতোগুলো ক্যাসেটের মাঝে হাবুডুবু খাওয়া। এমন অত্যাচার হলে কি টেপ রেকর্ড ঠিক থাকে ? কিছুদিন পর টেপ রেকর্ড নষ্ট হয়ে গেল। ক্যাসেট  প্লে করলে গান বাজে না। রিল পেচিয়ে যায়, প্যাচানো রিল খুলতে গিয়ে এতো সাবধানতা অবলম্বন করি, কিন্তু তবুও মাঝে মাঝে সেইসব প্রিয় ক্যাসেটগুলোর রিল ছিঁড়ে যেতো। মনটা এতো খারাপ হতো। মুখটা কালো হয়ে যেতো। ছিঁড়ে যাওয়া রিল জোড়া দিতে হতো চিনি দিয়ে আঠা তৈ্রি করে। সেইসব দিন,সেই সময়, সেই  গানের মাঝে ডুবে যাওয়ার  সাধ! সেইসব ফুলের মতো ফুরফুরে দিন।  আবার ক্যাসেট জোড়া দিয়ে আবার গান শোনতে ইচ্ছে করে, কিন্তু টেপ রেকর্ড তো নষ্ট। নষ্ট টেপ রেকর্ড পাঠানো  হয় বায়তুল মোকাররম এর  মার্কেটে রেডিও- টিভি মেরামতের দোকানে। সাতদিন-দশদিন টেপে রেকর্ডের  জন্য  অপেক্ষা করতে হয়। অপেক্ষা আর সয় না। প্রতিদিন খবর নিতে ধমক খাই টেপের জন্য। মন মানে না, আবার জিজ্ঞেস করি টেপ রেকর্ড কোনদিন আনা হবে ? একদিন দুইদিন, দিনের পর দিন যায় তারপর একদিন টেপ রেকর্ডার সারিয়ে আনা হয়, সাথে হয়তো বা একটি নতুন ক্যাসেটও চলে আসে। মন উড়ালপাখি হয় তখন। যতদিন টেপ রেকর্ডার নষ্ট থাকে, দোকানে পড়ে থাকে, ততোদিন ঘরটি উদাস থাকে। কাজে মন বসে না গানের জন্য মন খারাপ হয়।  পাশের বাসায় গান বাজলে কান পেতে থাকি। মনে হতো পৃথিবীটা উদাসে তলিয়ে গেছে। কান পেতে কষ্ট করে পাশের বাসার গানের আওয়াজে নিজেকে একটু মিশিয়ে নেয়া ছাড়া তো কোনও উপায় ছিল না। হোক তা হিন্দি- বাংলা যা- হোক; গান তো!


    যখন সাতদিন, দশদিন, কিংবা পনেরদিন পর টেপ রেকর্ডার আসে, তখন মন নেচে উঠে; যেন নতুন কিছু এলো ঘরে। আবার গান বাজে, সারাদিন সকল কাজে। কিছুদিন বাজে, আবার রিল ছিঁড়ে, ক্যাসেট নষ্ট হয়, এই সমস্যা, সেই সমস্যা লেগেই থাকে। কিছুদিন গান শুনি সেভাবেই। দিন যায়, রাত যায়, সপ্তাহ ফুরিয়ে মাস আসে।

    তখন প্রতি বছরে সিলেট যেতাম। ঈদে সিলেট যেতে হবে, পূজোতে সিলেট যেতে হবে। সেইভাবে একবার ঈদের সময় এলো, আমি সিলেট যাবো। আগামিকাল ঈদ, আজকের ট্রেনে সিলেট রওয়ানা দিলাম। ট্রেন ফাঁকা সব  মানুষের বাড়ি যাওয়া শেষ, মনে হলো শুধু আমিই একা বাকি রয়েছি। পুরো ট্রেন ফাঁকা। আয়েশে সিলেট পৌঁছে যাওয়া। সে তো আজকের কথা নয়! আজ আর তেমন দৃশ্যের কথা চিন্তা করাও দোষের হবে।


    সিলেট গিয়ে এই বাড়িতে সেই বাড়িতে বেড়াতে যাই __ কার বাড়িতে কি গান বাজে, কে কি গান শোনে, কার কাছে কি কি ক্যাসেট থাকে যা আমার কাছে নেই সেটিও খেয়াল করি। একদিন এক বাড়ি  থেকে খবর এলো , আমাকে যেতে হবে তাদের সাথে দেখা করতে। সেই দূর সম্পর্কীয়  কাকার চারটি মেয়ে, সবাই লেখাপড়া করছে, কেউ স্কুলে, কেউ কলেজে। তারাই আমাকে খবর পাঠিয়েছে তাদের বাড়ি যাওয়ার জন্য। আমি গেলাম এক  বিকেলে তাদের বাড়িতে। তখন বিকেল, তারা সবাই খেয়ে দেয়ে আরামে শুয়ে শুয়ে রবীন্দ্র সঙ্গীত শোনছে “ বাদল  দিনের প্রথম কদম ফুল করেছ দান”।

    ঠিক সেই সময় আমিও গিয়ে উপস্থিত হলাম। বসলাম তাদের পাশে, তাদের সঙ্গে কথা হচ্ছে, চা আসে  পাঁপড়ভাজা আসে, আমি একটু পাঁপড় খাই, একটু গান শুনি, ‘বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল করেছ দান’। একটা সময় বলি, মিশু গানটির শিল্পী কে ?  সে বলে ইন্দ্রাণী সেন। ইন্দ্রাণী সেন নামটি শুনেই ক্যাসেটের  কভারটি খুঁজতে শুরু করেছি,মিশু কভারটি আমার হাতে দিলে, আমি তখন খুব মন দিয়ে  দেখি কভারটিতে আরো রবীন্দ্র সঙ্গীত  রয়েছে সেই ক্যাসেটে, যা আমার শোনা নেই। ক্যাসেটে চৌদ্দটি গানের মাত্র কয়েকটি আমার শোনা, বাকিগুলো আমার শোনা নেই।

    ক্যাসেটের নাম ‘ প্রথম কদম ফুল’। আমার মনটা ভীষণরকম কাঙাল হয়ে উঠলো সেই ক্যাসেটের প্রতি। বারে বারে মনে পড়তে থাকে আমাদের জানালার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা কদম গাছটির কথা। রবীন্দ্র সঙ্গীত শুনে শুনে  তখন কদম ফুলেরে ভালোবাসতে শিখে গেছি মনে। তখন কেমন যে গানপাগল ছিলাম! তা বুঝেছি তখন। তাই বলে কী এখন গানপাগল নই ?  এখনো  গান পাগল, কবিতা পাগল, বই পাগল।

    তখন  মিশুদের বাড়িতে বসে ভাবছি, ‘এই বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল’ গানটি যদি না পাই ঢাকাতে গিয়ে! তখন কি হবে? গানটির জন্য যে মন খারাপ লাগবে। কিন্তু মিশুর গানের ক্যাসেটটি তো আমি নিতেও পারবো না।সেই গানটিকে ছেড়ে চলে আসবো ঢাকায়, তাহলে জানালার ধারে দাঁড়ানো কদম গাছের ফুল দেখে যে খুব মনে পড়বে গানের কথা। মিশুকে বললাম, “ ক্যাসেটটি কোথায় পেলে তুমি ?”

    মিশু বললো, “ আসাম থেকে আনা হয়েছে।”

    আসাম থেকে আনা হয়েছে?

    মিশু বলে হ্যাঁ।

    তখন ভাবলাম আসাম থেকে যখন আনা হয়েছে, তখন তো আর এই ক্যাসেট এখানে পাবো না। এই ক্যাসেট  হয়তো ঢাকাতেও পাওয়া যাবে না। এই ক্যাসেট হাতছাড়া হলে যে আমার জানালার ধারের কদম ফুলের আর কোনও মাহাত্ন্য থাকবে না আমার কাছে। মিশুকে বললাম __ মিশু ক্যাসেটটি আমাকে দাও কয়েকদিনের জন্য, আমি ঢাকাতে নিয়ে গানগুলো রেকোর্ডিং করিয়ে আবার পাঠিয়ে দেবো তোমার কাছে। মিশু বলে,  নিয়ে যান দিদি।

    আমি  ঢাকায় নিয়ে এলাম  সেই ক্যাসেটটি। রেকর্ডিং করালাম গানগুলো। তারপর বাদল দিনের প্রথম কদম ফুলের সঙ্গে ঘনিষ্ট সম্পর্ক হলো আমার। আমরা তখন আজিমপুরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের  বাসায় থাকি। রান্নাঘরের পাশেই বাইরে ছিল কদমগাছ। গাছটির বয়স খুব বেশি ছিল না।  ঘন বর্ষায় গাছে এত ফুল ফোটে যে পাতা দেখা যায়  না।হাত বাড়ালেই মনে হতো ফুলগুলো ছুঁয়ে দেয়া যাবে। রাতের বেলায়, আলোআঁধারিতে ফুলগুলোকে তারার মেলার মতো দেখায়।একটা মিষ্টি গন্ধে ঘর ভরে যেতো।শ্রাবণের ঘনঘোর বৃষ্টিতে কদম ফুলের ওপর বৃষ্টির জল পড়লে ফুলগুলোকে  আরো সুন্দর দেখাতো।ঝড় হলে, ঘন বৃষ্টি হলে কদমফুল ঝরে পড়তো। জমে থাকা বৃষ্টির জলে কদমফুল ভেসে যেতো। জানালার ধারে দাঁড়িয়ে কদম ফুল দেখতে দেখতে গান শুনি আর কদমফুল দেখি ___ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে একটু একটু করে বুঝতে শিখি, একটু একটু করে  আবিষ্কার করি। কী যে এক   ইন্দ্রজালের মধ্যে বসবাস আমার তখন।রবীন্দ্রনাথকে বুঝতে, জানত, পড়তে কদম ফুল দেখতে তারই মাঝেই একদিন   ক্যাসেটের এপিঠ ওপিঠ দুইপিঠ একসাথে শোনতে শোনতে বি- পিঠের শেষে একটি গানের শুধু স্থায়ীটুকু দেয়া রয়েছে সেটুকুই শুনলাম। ভাবছি এই গান  এলো কোথা থেকে ?  ক্যাসেটে তো এই গানের নাম লেখা নেই। ভুল শুনেছি বোধহয়! আবার শুনি, আবার শুনি  সেই স্থায়ী তার বেশি তো কিছু নেই। ইচ্ছে করেছিলো ক্যাসেটের ভেতরে যদি ঢুকে গিয়ে দেখতে পারতাম বাকি গানের লাইন কই ? সেই গানের লাইন  এ্যাডভারটাইজম্যান্ট। গানটি হলো ___

    “ আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার

    পরানসখা বন্ধু হে আমার।।”

    সেই গানের স্থায়ী শুনে সেই গানের জন্য মন কেমন করে উঠে, কোথায় পাই এই গান ? কার  কাছে যাই ? ইন্দ্রাণী সেনের গানগুলো কী ঢাকায় পাওয়া যাবে? আজিমপুরে একটি দোকানে খোঁজ নেয়া হলো; নেই এই গান এখনো আসেনি। নিউমার্কেট খোঁজ নেয়া হলো আসেনি এই ক্যাসেট।  গান না শুনি, গানের পরবর্তী লাইনে কী কথা আছে, তাই শোনবার জন্য মন ছটফট করে উঠে। আমি তো জানতাম না গীতবিতানে পাওয়া যাবে। গীতবিতানের সঙ্গে পরিচয় হলো তারও পরে।  মাত্র শুরু হয়েছে রবীন্দ্রনাথ পড়া। আর রবীন্দ্রসঙ্গীত মানেই যে গীতবিতান তা তখনো বুঝতে পারিনি।

    গীতবিতান কি ?

    সে তো পরের কথা। তারপর সেই দুটি লাইন শোনে শোনে  অপেক্ষা আর অপেক্ষা করা। কোথায় পাবো সেই গানটি? এইভাবে একের পর এক গানের জন্য  রবীন্দ্রনাথকে  জানার, শোনার ইচ্ছেটা বাড়তে থাকে।  তখন বইমেলাতে কবিতার ক্যাসেট বিক্রয় হতে শুরু করেছে। মেলা থেকে দু’একটি কবিতার ক্যাসেট কিনি,  কবিতা শোনতে শিখে গেছি। তারপর রবীন্দ্রসঙ্গীতের মাঝে কবিতার মিল রেখে কিংবা কবিতার সঙ্গে গানের মিল রেখে গান এবং কবিতা দুটোকে একসঙ্গে উপস্থাপনের একটা সময় এলো, সেই ক্যাসেটগুলোই আমার বেশি পছন্দের ছিল ___ আমি সেগুলোই কিনে আনতাম, এবং সেগুলোই শুনতাম।

    বইমেলাতে যেতে যেতে এতো এতো বইয়ের সঙ্গে পরিচিত হতে হতে আরও বেশি গানপাগল, আরও বেশি কবিতাপাগল, আরও বেশি বইপাগল হতে হতে রবীন্দ্রনাথের অনেক লেখা পড়ার প্রয়াস বেড়েই যেতে থাকে। একটা সময় এলো, সে বেশ কয়েকবছরের পরের কথা। তখনো কিন্তু আমার সেই বহু অপেক্ষার গানটি পাইনি, সেই গানের জন্য তখনো অনেক অপেক্ষা ছিল।

    তারপর গীতবিতান এলো হাতে।গীতবিতানে  সেই গানটি খুঁজে পেলাম, যাক গানটি শোনতে না পেলেও গানের  কথাগুলো পড়ে অপেক্ষার কিছুটা প্রশমিত হলো। তখন গীতবিতান পড়ে  গানের প্রতি আরও আগ্রহ বাড়ে, আরও বেশি গান শোনা, ততোদিনে সিডি চলে আসে, বিটিভির সঙ্গে প্রাইভেট চ্যানেল দু’একটি এলো। সেই চ্যানেলে রবীন্দ্রনাথ, কাজী নজরুল বিষয়ক অনুষ্ঠান শুরু হলো। গান-কবিতাও এসবের অনুষ্ঠান হতে শুরু হলো। সিডিতে ইন্দ্রাণী সেনের সেই গান ___

    “আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার

    পরানসখা বন্ধু হে আমার”।

    সেই গানটি একটি সিডিতে পেলাম। তখনো আমার সিডিতে গান শোনা হয়নি। আমি আমার সেই লাল টেপরেকর্ডেই গান শুনি। টেপ রেকর্ডটি তখন আরো বিকল হয়ে গেছে, প্লে চেপে ধরে রাখলে গান বাজবে নয়তো বাজবে না। হাত দিয়ে ধরে রেখে গান শোনবার সময় যে আমার ছিল না।  তাছাড়া আমি তো একটি দু’টি গান শুনি না। প্লে বাটনের উপরে একটি ভারী তালা দিয়ে চাপ দিয়ে রেখে তখনো আমি গান শুনি। আমার সেই তালার কারিশমা অদ্ভূত সুন্দর এক মহিমা ছিলো।  যাতে করে আমার গান শোনার কোনও ব্যাঘাত ঘটতো না।

    সবাই বললো টেপরেকর্ডার বিক্রি করে  দিয়ে একটা সিডি প্লেয়ার কিনতে, তাহলে অনেক অনেক গান শোনা যাবে। আমার সেই ভাঙা লাল টেপটি বিক্রয় করে  দিতে পারবো না।  একটি সিডি আনা হলো।সিডিতে এতো গান শোনা যাবে, সেই দেখে তো আমি আত্নহারা! এত গান ? একটি সিডিতে এত গান!  মন ভরে গেল এত গান দেখে। এ কেমন কথা ? যেখানে ক্যাসেটে মাত্র আট থেকে দশটি কিংবা ১২টি; তার বেশি তো গান হবে  না। অথচ সিডিতে এতো গান ? এখন কি করি ? টেপ রেকর্ডার তাহলে বিক্রয় করে দিই বায়তুল মোকাররমে নিয়ে। আর বারোটি করে গান কিনে দরকার নেই। সিডি কিনবো এখন থেকে।

    সারাদিন কাজের ফাঁকে ফাঁকে গান শুনি,  কবিতা  শুনি। জগজিৎ সিং এর গজল শুনি। তখন সবেমাত্র জগজিৎ সিং জীর ‘ পরওয়াজ ’ ডিভিডি এসেছে বাংলাদেশে। পরওয়াজের গজল শুনি। ‘ এক পরওয়াজ দেখাই দি হ্যয় ’। ‘ কভি খামোস বৈঠোগে, কভি কুছ গুনগুনাও গে’। ‘ তেরে আনে কি যব খবর মেহেকে ’। ‘ তমন্না ফির মচল যায়ে আগর তুম মিলনে আ যাও ’। এরকম এতো এতো গজল শুনেছি।

    কবিতা আর গানের তখন  শুরু হয়েছে রবীন্দ্র সঙ্গীতের কাজ। তারপর শুরু হলো, বেছে বেছে  কবিতাসহ গানের সংগ্রহ। সেইভাবেই জড়িয়ে পড়লাম গান আর কবিতার মোহে, আজও রয়েছি তেমনি।আর সেই গান ইন্দ্রাণী সেনের  কন্ঠে __

    “আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার”  আজও  সেই গান তেমনি  মুগ্ধতা ছড়ায়, সেই গানের প্রতি কী যে এক মায়া ঘিরে রাখে। এখন আমি সেই গানের স্বরলিপির সঙ্গে খেলা করি, গুনগুনিয়ে গেয়ে উঠি নিজের অজান্তে। কোনও ঝড়ের সাঁঝে, নয়তো বাদলা দুপুরে কিংবা রিমঝিম বৃষ্টিতে সেই গানের আবেদন এখনো আমার কাছে সেই এতগুলো বছর  পূর্বেও যেমন ছিল আজকেও তেমনি। সেই বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল, গানের বাণী এখনো মনে প্রশান্তির মূর্ছনা ছড়ায়, এখনো একটি কদম ফুলের জন্য মন আকুল হয়, এখনো দূরের গাছ থেকে কদম ফুলের সুঘ্রাণ ভেসে আসলে সেসব দিনের কথা মনে পড়ে।

     

     

     

     

     

     

    লাবণ্য কান্তা

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২
    ১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
    ২০২১২২২৩২৪২৫২৬
    ২৭২৮২৯৩০৩১