• শিরোনাম

    আমার মুক্তি আলোয় আলোয় : জেরিন তাসনিম

    | ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২০


    আমার মুক্তি আলোয় আলোয় : জেরিন তাসনিম

    লোকে বলে, মেয়েদের তৈরি হতে বড্ড দেরি হয়। চুল আঁচড়াও, চুল বাঁধো। মুখে এটা মাখো, ঠোঁটে ওটা মাখো। হাজারখানেক নাম না জানা প্রসাধন, হাতব্যাগে সংসার, আর জামার ভাঁজে পিনের দোকান।

    কথা নেহাত মন্দ বলে না। রোজ সকালে ক্লাসে যেতে বড্ড হয়রানি পোহাতে হয়। সকালে জলদি ঘুম না ভাঙলে কেলেঙ্কারি, সময় পাই না বলে ব্যাগটা আগে থেকেই গুছিয়ে রাখি।

    সকালবেলাটা কাটে একটা সভ্য পোশাকের খোঁজে। চটজলদি চুলে একটা কাঁকড়া গুঁজে মাথা ঢেকে নিই এক টুকরো কাপড়ে।


    শ’খানেক আলপিনের খোঁচা খেতে খেতে শক্ত করে বেঁধে নিই হিজাব। ওড়নাটার দিকে বেশ নজর দিই- কোনোভাবেই যাতে নড়ে না যায়!

    তারপর দেখে নিই- সব ঠিক আছে তো? হিজাবটা কি ছোট হয়ে গেল? জামাটা কি আঁটসাঁট? বাজে লাগছে দেখতে? ওড়নাটা কি বেশি পাতলা? অবয়ব বোঝা যাচ্ছে? এইসব হাবিজাবি ভাবতে ভাবতেই এক সময় বেরোবার সময় হয়।
    এক কাপ চা বানানোর সময় পাই কালেভদ্রে…
    অন্যথায় অগত্যা মধুসূদন ক্লাসযাত্রা।


    ভীষণভাবে নারীবাদী আমি, তবে কখনওই উগ্র হতে চাই না। আমি চাই, আমার নারীবাদ আর আদর্শ যেন পবিত্র থাকে। আমার নারীবাদের প্রতি যেন কেউ আঙুল না তোলে।

    ছোটবেলা থেকেই একবারের জন্যও কেউ ভুলতে দেয় নি – আমি মেয়ে।


    স্কুলে যাবার পথে রাস্তার একপাশে কোনো দশবারোটা কিশোরের দলকে হাঁটতে দেখলে আমি ভয়ে দাঁড়িয়ে যেতাম। ভাবতাম, অন্যপাশ দিয়ে যাবো? নাকি অন্য রাস্তা?
    ভয়টা কলেজে উঠে কেটে গেছে, কিন্তু নৈঃশব্দটা কাটতে পার হয়ে গেছে আমার তারুণ্য।

    সেদিন এক বন্ধু বলে বসলো, “ভালো লাগছে না, ঘুরে আসি কোথাও দূরে।”
    আমি হেসে শুধু সায় দিই, বলি– “ঘুরে আয়।”
    সাহস করে আমার বলা হয় না– “চল, ঘুরে আসি।”
    বললে হয়ত বেচারা ভড়কে যেত। একা একা ঘুরে আসতে তার আমার মত ভয় নেই, তবে, আমায় নিয়ে ঘুরে আসতে তার বেজায় ভয় হবে, নিশ্চয়ই?
    মেয়েমানুষ বড়ই বোঝা! লোকে পাঁচকথা বলবে।

    আমি অবশ্য বলি না, কারণ– সাহস করে যে, পিতাশ্রীর কাছে আমার যাওয়ার অনুমতিটাও চাইতে হবে! তাঁকে আমার আস্পর্ধার কথা ভাবিয়ে দুশ্চিন্তায় ফেলতে আমি রাজি নই, অভ্যস্তও নই।

    পিতা তিনি, কন্যার সাথে তার কোনো রেষারেষি নেই। কিন্তু, তিনি তো জানেন– সব মানুষ মানুষ হয় না। সব পুরুষ পুরুষ হয় না।

    বাবাকে যখন ক্যাম্পাসে ফেরার কথা বললাম, তিনি বললেন, “যাও, তবে অন্য বন্ধুরা সাথে গেলে যেয়ো।” আমি উচ্চবাচ্য না করে ধৈর্য নিয়ে আমার সহযাত্রী খুঁজতে আরম্ভ করলাম। কারণ, আমি নিজেও ভুলতে পারি না যে, আমি মেয়ে।
    আমি আমার সীমাবদ্ধতা জানি।

    আমি কাউকে বিশ্বাস করতে পারি না। ক্ষণিকের জন্য যদি ভরসা করি, তারপর সেই ভরসা উঠিয়ে নিই। বন্ধুদের আড্ডায় হাসি-ঠাট্টায় কেউ কোনো ইঙ্গিত দিলে আমার ঠোঁটের হাসি মিলিয়ে যায়, কথা থেমে যায়, ভ্রূ কুঁচকে যায়।

    আমার চোয়াল শক্ত হয়ে যায়, আমি ঘাড় সোজা করে বসি। তীক্ষ্ণভাবে তাকাই, কঠিন আর উহ্য উত্তর দিই।

    কেউ আমার পাশ কেটে গেলে আমি সতর্ক হয়ে যাই। কারো ছোঁয়া ভালো লাগে না। কারোরই না।
    আমি না দেখেও বুঝতে পারি, কারা আমার দিকে কোন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। নানা দিক থেকে নানা ডাক আশে, কখনও পরোক্ষ, কখনও প্রত্যক্ষ। তবু চুপচাপ মাথা নিচু করে হাঁটা ছাড়া আর কিছুই করি না।

    আমি স্বীকার করতে বাধ্য, সেই সাহস আমার আছে, সেই সামর্থ্য আমার নেই।
    কেউ আমাকে জায়গা ছেড়ে দেয় না। আমার জায়গা আমাকেই করে নিতে হয়।

    আমি হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারি না, হুট করে কোনো কথা বলতে পারি না, হুট করে কোনো কথা দিতে পারি না। দশদিক ভেবে আমি একটা সিদ্ধান্ত নিই, তার আবার অভিভাবকের অনুমোদন লাগে। অনুমোদনের পর, তার প্রয়োজন হয় সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার।

    ঐ যে বললাম, আমার পবিত্র নারীবাদিতা।
    আমি খুব ভালো করেই জানি, মুক্তির অন্য অর্থ অবাধ্যতা বা বিরোধিতা নয়। পরমতসহিষ্ণুতা নারীমুক্তির পরিপন্থী হতে পারে না।
    মুক্তির অর্থটা অনেক বিস্তৃত। আমি প্রতি রাতে আমার মুক্তির অর্থ খুঁজি। না পেলেও খুঁজি। পাবো না জেনেও খুঁজি। আমি পাই বা না পাই, কেউ না কেউ একদিন নিশ্চয়ই পাবে। এক রাতে তো আর মুক্তি মেলে না!

    দমকা হাওয়ায় সাবধানী হয়ে জামাকাপড় সামলাই।
    সন্ধ্যা হলেই আমার মনে হয়, যেতে হবে।

    হঠাৎ করেই আমার মনে হয়, বাড়ি ফিরতে পারবো তো? হঠাৎ করেই আমার মনে হয়, রাতের আকাশ আমার দেখা বারণ।
    বৃষ্টিতে গা ভিজিয়ে রাস্তায় হাঁটা আমার বারণ।
    সূর্যের আলোর আমাকে ছোঁয়া বারণ।

    মাঝে মাঝে তো এমনও মনে হয়, আমার শরীর জুড়ে কেউ ১৪৪ ধারা জারি করে দিয়েছে!

    নারীত্ব বেশ ক্লান্তিকর, পুরুষত্বের কথা জানি না।
    আমি আমার ক্লান্তিটা লুকিয়ে রাখি চুল আর পোশাকের ভাঁজে, মেজাজটা আটকে রাখি হিজাবের পিনে। আমার অভিমান, অভিযোগ জমিয়ে রাখি আমার হাতব্যাগের সংসারে।

    আমি চাই না, আমায় দেখে কোনো নারী আবারও নতুন করে ক্লান্ত হোক। ক্লান্তিটা ভুলতে হবে। তবেই না দুঃখটা একদিন সুখ হয়ে যাবে!
    বার বার নিজেকে বোঝাই, “নারীত্ব ক্লান্তি না, অহংকার।” আমি প্রতিদিন একটা শক্ত খোলসে ঢাকি নিজেকে।

    আমি সাহসী৷ আমি কৌশলী। আমি যোদ্ধা।
    নিজের এমন একটা অবয়ব আমার তৈরি করতেই হবে, যাকে দেখে পৃথিবীর সকল নারীরা একদিন খুব করে নারী হয়ে বাঁচতে চাইবে।

    অথচ, নির্মম সত্যটা হলো– দিনশেষে পৃথিবীর বুকে আমি একটা পণ্য হয়েই থেকে যাই। মুক্ত হওয়া আর হয়ে উঠলো না আমার।

    অথচ, রবীন্দ্রনাথ একদিন আমায় বলেছিলেন, আমার মুক্তি আলোয় আলোয়…

    জেরিন তাসনিম
    শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫
    ১৬১৭১৮১৯২০২১২২
    ২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
    ৩০৩১