• শিরোনাম

    করোনায় একদিন : সিদরাতুল মুনতাহা

    | ২৭ জানুয়ারি ২০২১


    করোনায় একদিন : সিদরাতুল মুনতাহা

    ফাইল ফটো

    আমার লেখালেখির অভ্যাস নেই। কিন্তু কিছু কিছু সময়ের কথা , ঘটনার কথা, অভিজ্ঞতার কথা সবাইকে একশবার বলে বেড়ালেও মনের তৃপ্তি মিটেনা। আরো বলতে ইচ্ছে হয়। তাই মনের তৃপ্তি মেটাতে এই স্মরনীয় ঘটনা লিখতে বসছি।

    অনেক দিন পর এবার বাড়িতে নুহু আর উমাইর এসেছে…।আমি একজনের বড় বোন আরেকজনের ছোট বোন। লকডাউনে সবাই অনেকদিন গৃহবন্দী আছি, ভাবলাম এই সুযোগ, ঘুরাঘুরি করার। কিন্তু প্রশ্ন হলো ঘুরতে কোথায় যাব? দূরে  কোথাও যাওয়ার পারমিশন পাবনা, আমরা ছোট মানুষ,বড় কেউ সময় দিতে পারবেনা।তাই কাছেবিছে ঘুরতে হবে হাতে সময় মাত্র তিনদিন।যা হোক,সময় করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এখানে ওখানে অনেক ঘুরলাম, সব ফুফুর বাড়িতে গেলাম,স্কুল, উপজেলা, কলেজ কোনোটা বাদ নেই। আমার রাউজানে আমি ওদের গাইড।শেষ দিন, ২০ নভেম্বর,২০২০, শুক্রবার। সকালের সময় পাবোনা।


    বেড়াতে গেলে বিকালের দিকে বেরুতে হবে, কিন্তু যাবো টা কোথায়? নুহু বায়না ধরল ফারাজ করিম ভাইয়ার বাড়িতে যাবে, সে ভিডিওতে দেখেছে বাড়িটা খুব সুন্দর। আমি বাবাকে বললাম। বাবা বলল সে বাড়ির পাশেই,আমার এক ফুফাতো বোনের বাড়ি।তেমন একটা আসা যাওয়া নেই।  উনাকে ফোন করে দিলে উনি ঘুরিয়ে দেখাবেন ।আমরা তো খুশি, এমন সুযোগ আর কোথায় পাব!!! বাবা আপুকে ফোন করলেন, আমরা তিনজন যাব, আমাদের একটু ফারাজ ভাইয়ের বাড়ি ঘুরে দেখাতে হবে।যেই ভাবা সেই কাজ, বেরিয়ে পড়লাম আমরা তিনজন।

    গহিরা চৌমুহনি পর্যন্ত গাড়িতে গেলাম। তারপর হাটা ধরলাম। কিছু দূর গিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করি, “ ভাই, এমপি স্যারের বাড়ি কোনদিকে?”তারপর সেই মানুষ গুলোর দেখানো রাস্তা ধরে হাটতে থাকি।।আপুর হাসবেন্ড বিখ্যাত উকিল, তাই বাড়ি চিনতে তেমন বেগ পেতে হয়না। মাইক্রো সাইজের একটা রাজপ্রাসাদ। বাইরে দাঁড়িয়ে আপুকে ফোন করি…ফোনে উনার ঠান্ডা গলা শুনে একটু নার্ভাস হয়ে যাই।।তবু ওটা পাত্তা না দিয়ে বাড়িতে ঢুকি।


    আমার ওদের বাসায় যাওয়ার মূল পরিকল্পনা হলো জনাব দুলাভাই এর সাথে কথা বার্তা বলব।আর উনাকে মনে করিয়ে দিব  ক্লাস থ্রিতে পড়া অবস্থায় উনি আমাকে সিরাজগঞ্জের বাঘা বাড়িতে নিয়ে যাবার কথা দিয়ে বাঘা বাড়ির বাউন্ডারি পুরো ঘুরিয়ে এনেছিলেন, কিন্তু বাঘা বাড়িতে ঢুকাননি। যা হোক, পরিকল্পনা ভেস্তে গেল, জনাব দুলাভাই নাজমুন নেছা মীম এর ডুপ্লিকেট কে চিনতেই পারলেননা। আমি বললাম, “ আমি আবদুল হাই পেয়ারুর মেয়ে,তোয়াহা”। “ও!আচ্ছা আচ্ছা, তুমি পেয়ারু মামার মেয়ে, এই (আপুর নাম) কোথায় তুমি”… আপু এসে আমাদের রিসিভ করলেন। বরফ শীতল উষ্ণ অভ্যর্থনা!!!।তবু আমরা একটু সস্তি পেলাম(কয়েক সেকেন্ডের  জন্যে)।

    প্রথম ধাপের সিড়ি পেরোতেই আপু আমাদের থামিয়ে দিলেন।“তোমরা জুতো খুলে স্যান্ডেল পরে নাও” । আমরা থতমত খেয়ে গেলাম। তিনি বললেন, “করোনাকালীন সময়ে আমরা বেশ কিছু নিয়মকানুন মেনে চলছি তো, তাই”। আমি এক জোড়া সেন্ডেল নিচে নামিয়ে পড়তে গেলাম।তিনি হা হা করে উঠলেন, “আরে আরে! নিচে নামাচ্ছো কেন? উপরেই পড়ো” । আমার মাথা ঘুরে উঠলো।আমি সেদিন সকালে বাড়ি খেয়ে নখ উল্টাই ফেলছি। কিন্তু তার জন্যে আমার ঘুরাঘুরি বন্ধ হতে দেয়া যাবেনা। তাই ঘুরাঘুরির খাতিরে নখের যন্ত্রনা বিসর্জন দিয়েছি। যা হোক উপরেই স্যান্ডেল পরে আপুকে ফলো করলাম।আপু দোতলায় একটা রুম এ নিয়ে গেলো।


    “তোমরা বাথরুমে গিয়ে পা ধুয়ে নাও”…।ও শিট!!!! আমি সারাদিন এত কাজ করেছি পায়ের ওই একটা নখ এ এক বিন্দু পানি লাগতে দিনাই। আমার বুকের ভিতর দুরু দুরু শুরু হয়ে গেলো। কত টুক যন্ত্রনা হলে আমি চিৎকার করবনা এই ক্যালকুলেশন করতে করতে বাথরুমে ঢুকলাম। পায়ের কিনারে কিনারে পানি দিয়ে সবাইকে বুঝ দেয়ার চেষ্টা করলাম যে এ আমি পা ধুইছি। কিন্তু আমি দেখিনি পিছন থেকে আমার আপু তিক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন।

    আমার পানি ঢালার অবস্থা দেখে তিনি “পানি আছে তো অনেক, এত কম পানি ঢালো কেন” বলে বালতি শুদ্ধ পানি আমার পায়ে ঢেলে দিলেন। আহহহহ!!!! আমার অবস্থা তখন “আমি চিৎকার করে কাঁদিতে চাহিয়া করতে পারিনি চিৎকার” এর মত। যা হোক “I am OK”  ফেস নিয়ে বেরুলাম বাথরুম থেকে। সবার পা ধোয়া শেষে তিনি আমাদের বসার ঘরে নিয়ে গেলেন। আমরা তখন “সাবধান!!!” অবস্থায় বসে আছি।

    তিনি আমাদের থেকে তিন ফুট দূরুত্বে বসে ২০ মিনিটের করোনা সম্পর্কিত লেকচার দিলেন। আমরা নিচের দিকে তাকিয়ে মনযোগ সহকারে শুনে গেলাম…“তিনি কি দিয়ে ঘর পরিষ্কার করেন, কয়বার ঘর পরিষ্কার করেন, কেমনে ঘর পরিষ্কার করেন, কেমন প্রতিটা ফার্নিচার এর কোণা পরিষ্কার করেছেন, কেমনে তিনি তাঁর বুয়া কে ট্রেইন্ড আপ করে নিজের মত বানিয়েছেন, এই সময়ে তিনি কতটা সচেতন,তিনি কিভাবে সকল নিয়ম কানুন মেনে চলেন, কিভাবে তিনি সিএনজি ড্রাইভারের সাথে মাস্ক না পড়ার কারণে ঝগড়া করেছেন” ইত্যাদি ইত্যাদি। আমাদের মাথায় তখন ঘুরছে, এমপি স্যারের বাড়িতে যাব, ছবি তুলব, কিন্তু সন্ধ্যা হই গেলে ছবি তুলতে পারবনা, তাই কেমনে এখান থেকে বেরুনো যায়।

    নুহু আর না পেরে আমতা আমতা করে বলল, “আপু আমাদের আসলে উঠতে হবে, দেরি করা যাবেনা, সন্ধ্যা হই যাবে”।তিনি বললেন,”আরে বসো বসো, মামা আমাকে ফোন করেছে না!!আমি তোমাদের জন্যে নাস্তা পানি রেডি করেছি, কেমনে যাবা! বসো”… আমরা “মুখে হাসি মনে কষ্ট” নিয়ে বসে পড়লাম। তিনি ভিতরে গেলেন।পরক্ষনেই আবার ফিরে এলেন একটা ন্যাকড়া হাতে। যে জায়গাটায় তিনি বসে ছিলেন সে জায়গাটা ভালো করে মুছে ভিতরে ঢুকে গেলেন।আমরা অপরাধির মত আরো ১৫ মিনিট বসে ছিলাম।না পারছি গল্প করতে, না পারছি ছবি তুলতে, না পারছি উঠে পালাই যাইতে।

    যা হোক ১৫ মিনিট পর নাস্তা আসল।।আমাদের জন্যে স্পেশালি পকোরা আর কীমা বানানো হয়েছে। রসুনের সস সহ। আমরা তিনজন বসে একটা একটা পকোরা নিলাম। সব কিছুর মত পকোরাও যেন জীবাণু মুক্ত হয় তা মাথায় রেখেই ওটা ওভাবে বানানো হয়েছে। পকোরার অসাধারণ স্বাদ বর্ণনা করা যাবেনা।আমি পানি খাবার জন্যে টেবিলের আশেপাশে তাকালাম।জগ আছে, পানি আছে, গ্লাস আছে, কিন্তু ভয়ে ধরতে পারছিনা। পকোরাটা গলায় গিয়ে আটকালো। আমি কু কু করে বললাম, “আপু সন্ধ্যা হই গেলে আব্বু বকবে, সন্ধার আগে চলে যেতে হবে। এবার উঠি”। তিনি বললেন, “আরে আরে পানি ই তো খেলেনা, আমি পানি আনছিলাম তোমাদের জন্যে(২০ মিনিট ধরে সিদ্ধ করে মনে হয়)”।

    আমি আবার কু কু করে বললাম(গলায় পকোরা আটকে আছে তাই), “না না আপু, পানি খাবনা।দেরি হই যাচ্ছে”। তিনি তাড়াহুড়ো করে একটা ছোট বোতলে পানি এনে আমাদের দিলেন। আমরা বাসা থেকে বের হয়ে পানি দিয়ে পকোরা টা পেটে ঢুকালাম। যা হোক আপুকে ধন্যবাদ , এই সময়টায় এরকম সচেতনতার প্রয়োজন যাতে করোনার বাবা ও বাড়ির ত্রিসীমানায় ঘেসতে না পারে। যেখানে মানুষ ঘেসতেই ভই পায় সেখানে করোনা তো অনেক দূরের কথা।ভাবছি মাকে বুঝাতে হবে সচেতনতা কাকে বলে!!মা তো খালি কাশলেই বলে,”এই ফ্যান বন্ধ গর, কাশির সিরাপ খা।থাবড়ায় দাঁত ফ্যালায় দিয়ুম,অসৎ হডেয়ার।”তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। আমাদের হাতে সময় ২০ মিনিট, এমপি স্যারের বাড়ি ঘুরতে হবে, ছবি তুলতে হবে।

    আমরা সেই বিখ্যাত বাড়িতে ঢুকলাম। সবাই ওখানে ঘুরাঘুরি করতে পারে শুনে বেশ অবাক ও হলাম।।আমরা ভেবেছিলাম অনেক গুলো সিকিউরিটি গার্ড থাকবে, আমাদের অনেক বার চেক করবে, গার্ডদের অনেক বার পায়ে ধরলে তারপর ঢুকতে দিবে।।কিন্তু তেমন কিছুই না।।শান্ত নির্জন চুপচাপ বাড়ি। দুইটা ছোট ছোট ছেলে ঘুরছে।রাহাত আর রাকিব।আমরা তাদের কে ডেকে বললাম, “আজকে আমাদের গাইড হও তোমরা।।খানিক্ষনের জন্যে”। তারা খুব আগ্রহ নিয়ে আমাদের সাথে ঘুরতে লাগলো। আমরা প্রথমের মূল বাড়ির দিকে এগোলাম। দেখার মত একটা বাড়ি(বাড়ি সম্পর্কে আমার আইডিয়া নাই তাই বলতে পারছিনা সেটা কোন ধরনের)।

    তবে বাড়ির সৌন্দর্য দেখে বাড়ির কর্তার মন মানসিকতার সৌন্দর্যের পরিচয় পাওয়া গেছে।  আমি আর ঊমাইর ঠিক করলাম বাড়ির বারান্দার সামনের সিঁড়িতে বসে ছবি তুলব।তুলে দিবে নুহু। তাকে বলা হলো পুরো বাড়িটা নিয়ে ছবি তুলতে,তাই সে বেশ খানিকটা দূরে গিয়ে দাঁড়ালো। উমাইর আমাকে বলল, “তুই এক পাশে দাঁড়া, আগে আমি তুলব”।তার কথামতো আমি এক পাশে দাঁড়ালাম।।উমাইর বসল সিঁড়িতে। সুন্দর করে পোজ দিয়ে। নুহু বলল, “রেডি?”।।উমাইর সম্মতি দেয়ার আগেই পিছন থেকে “ঘাউ ঘাউ ঘাউ” আমি চমকে পিছনে তাকানোর আগে দেখি কোনো কিছু না ভেবে না বলে না দেখে উমাইর জায়গা থেকে উঠে ভোঁ দৌড়।

    আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। আমি জানি কুকুর চিল্লালে দৌড়াতে নেই…সাহস করে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে, তাছাড়া কুকুরটা কোথায় আছে, নেড়ি কুকুর নাকি বিদেশি কুকুর তাও জানিনা। তার চেয়ে বড় কথা , আমি ওখানে দাঁড়িয়ে আছি, সে আমাকে ফেলে কেমনে দৌড় দিল!! “বিপদে বন্ধুর পরিচয়” এরকম একটা কথা আছে।আমি মেয়েটাকে একলা ফেলে সে “চাচা আগে আপন প্রাণ বাঁচা” মত করে দৌঁড় দিয়েছে কিছু না বলে না ভেবে। আমি পিছে তাকিয়ে দেখলাম কুচকুচে কালো একটা কুকুর, গ্রিল এর অন্য পাশ থেকে তুমুল স্বরে চেচাচ্ছে।নুহু ভাবছে “উমাইর এর মত পার্ট ওলা ছেলে ভয়ে দৌড় দিছে আর তোয়াহার এত সাহস কোথা থেকে আসল”(আসলে আমার স্যান্ডেল এর তলানি উড়ে গিয়েছিল, প্রেসটিজের কারণে ব্যাপারটা ওদের কাছে এতক্ষন পর্যন্ত গোপন ছিল”।

    যা হোক আমি যখন দেখলাম  কুকুর টা বাঁধা না থাকলে সহজেই গ্রিল পার হয়ে এসে আমাকে কামড়ে দিতে পারবে তখন আমি জোরে জোরে হাঁটা শুরু করলাম। পুরো দস্তুর মেয়ে হয়ে আছি, স্কুলের দৌড় প্রতিযোগিতার মত দৌড়ানোর অবস্থায় নেই,কেমনে দৌড় দিই??!!!! ।  যা হোক ওখানে ছবির কথা বাদ দিয়ে আমরা পুকুরে বোট এ উঠে ছবি তুলতে গেলাম। চটপটে পিচ্চি রাহাত আমাদের জিজ্ঞেস করল “আপনারা কি নব বিবাহিত দম্পতি?”…উমম।।এই জায়গাই আমার একটা বিখ্যাত অট্টহাসি।উমাইর বলল, “তোর মাথা দম্পতি।আমরা কাজিন” বলে বোটে উঠল।।ছবি তুলা হলো। এবার সেই রাহাত আবার বলল, “আন্টি ওই দিকে কবুতর আছে, মুরগি আছে, দেখবেন?” নুহু বলল, “এটা আন্টি না আপু”…।

    এই জায়গায় এসে আবার আমার একটা বিখ্যাত অট্টহাসি।  যা হোক এবারো উমাইর আগে আগে রাহাতের পিছে গেল।আমি আর নুহু ধীরে সুস্থে আসছি। ওখানে পৌঁছানোর আগেই আবার ঘাউ ঘাউ…।আর উমাইর এর আবার দৌঁড়। “ঐ জায়গায় জীবনে যাওয়া যাবেনা।চলো চলো” বলল উমাইর। তারপর একটু ঘুরতে না ঘুরতেই মাগরিবের আযান পড়ল।।আর আমরা সিফাতের বাসায় পেট পূজা করার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।।।সেই দুপুরে খাওয়ার পর পেটে খামি যুক্ত জীবাণু মুক্ত পকোরা ছাড়া আর কিছু পড়েনি যেহেতু……।

    সিদরাতুল মুনতাহা

    Facebook Comments

    বিষয় :

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫১৬
    ১৭১৮১৯২০২১২২২৩
    ২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
    ৩১