• শিরোনাম

    কালোমানুষের জীবনের দাম (পর্ব -৪) : রফিকুজ্জামান মহিদ

    | ৩১ জুলাই ২০২০


    কালোমানুষের জীবনের দাম (পর্ব -৪) : রফিকুজ্জামান মহিদ

    পৃথক কিন্তু সমান সাংবিধানিকভাবে এই নীতিতে মার্কিন সাদা কালো মানুষদের সমাজব্যবস্থা দক্ষিনের রাজ্যগুলোতে বিংশ শতাব্দীর সত্তুর এর দশক পর্যন্ত চলেছে, স্কুল, বাসস্থান এলাকা, হাসপাতাল, প্রর্থনার স্থান (গীর্জা), বাস, ট্রেন, এমনকি কবরস্থান পর্যন্ত আলাদা। যদিও কাগজে কলমে সমান অধিকারের কথা বলা তবুও কালো মানুষের প্রতি বৈষম্য ছিল এবং এখনও চলছে।
    ১১ সেপ্টম্বর ১৯৬৪ জন লেনন ঘোষনা করলেন, বিটলস্ জ্যাকসনভিল, ফ্লোরিডায় সাদা কালো মানুষদের আলাদা আলাদা বসার ব্যবস্থাপনায় গান গাইবেন না, সিটি কতৃপক্ষ এই ঘোষনায় সাড়া দিয়ে চুক্তি করলেন ১৯৬৫ সালের কাউ প্যালেস ক্যলিফোর্নিয়ায় বিটলস্ এর কনসার্টএ সেগ্রিগেটেড দর্শকদেক সামনে হবে না।

    রাজনৈতিক অসহায়ত্বকে আড়াল করতে জনগনকে বোকা বানানোর চেয়ে সহজ অস্র আর কিছু নেই। আইন সংশোধন করে সাদা কালোদের জন্য একই স্কুলে পড়াশোনার ব্যবস্থার কথা থাকলেও এখনও কার্যত সাদাদের জন্য স্কুলগুলোতে কৃষ্ণ বর্ণের ছেলেমেয়েদের ভর্তির সুযোগ খুবই সীমিত প্রায় অসম্ভব। স্থানীয় রাজ্যগুলো আইনের ফাঁক ফোকড় দিয়ে সাদা মানুষদের অগ্রাধিকারের ব্যবস্থাই বজায় রেখে চলেছে। এর সাথে মুলত আবাসন ব্যবসায়ীদের কারসাজী ও আবাসন ঋণ ব্যবস্থাপনার শর্ত সমুহ চাইলেও নিম্ন ও মধ্যম আয়ের কালো মানুষদের পক্ষে পালন করা সম্ভব হয় না। এ হেন পরিস্থিতিতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম যে আলাদা মানসিকতায় বড় হচ্ছে তার জন্য মার্কিনীদের মুল্যও কম দিতে হচ্ছে না। এপ্রিল ২০১৭ তে, শিকাগোর মেট্রোপলিটন পরিকল্পনা কাউন্সিল এবং ওয়াশিংটন, ডিসিতে অবস্থিত একটি থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক আরবান ইনস্টিটিউট একটি সমীক্ষা প্রকাশ করেছে যাতে অনুমান করা হয় যে জাতিগত এবং অর্থনৈতিক পৃথকীকরণ প্রতিবছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে কোটি কোটি ডলার ব্যয় করতে হয়। কমপক্ষে ১০০ টি নগর কেন্দ্র থেকে ১৯৯০ থেকে ২০১০ এর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে পৃথকীকরণ কৃষ্ণাঙ্গদের অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবিত করে দরিদ্র হতে এবং তাদের হত্যাকাণ্ডের উচ্চ হারের সাথে ও সম্পর্কিত।


    ব্যাংকিং, বীমা, চাকরিতে অ্যাক্সেস, স্বাস্থ্যসেবা অ্যাক্সেস, বা এমনকি অগ্রাধিকার ও নির্দিষ্ট যা রেডলাইনিং নামে পরিচিত।
    বর্ণগতভাবে নির্ধারিত অঞ্চলে বাসকারীদের সুযোগ সুবিধাগুলোও সমান নয়। রেডলাইনের সবচেয়ে বিধ্বংসী রূপ এবং শব্দটির সর্বাধিক সাধারণ ব্যবহার বন্ধকী বৈষম্যকে বোঝায়। যা বাড়ির দাম ও আবাসন ব্যবসায়ীদের তার ক্রেতাদের বর্নগতভাবে আলাদা করে দেয়। যদিও আইন এই আলাদা করাকে সমর্থন করে না।

    উপনিবেশিক যুগ থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণবাদ বিদ্যমান , এবং আইন, অনুশীলন যা তাদের বর্ণ বা বর্ণের ভিত্তিতে বিভিন্ন গোষ্ঠীকে বৈষম্যমূলক বা অন্যথায় বিরূপভাবে প্রভাবিত করেছে যখন বেশিরভাগ শ্বেতাঙ্গ আমেরিকান আইনত বা সামাজিকভাবে বেশী সুযোগসুবিধা এবং অধিকার ভোগ করে যেগুলি অন্যান্য জাতি এবং সংখ্যালঘুরা ভোগ করতে পারে না।


    ইউরোপীয় আমেরিকানরা – বিশেষত ধনী সাদা অ্যাংলো-স্যাকসন প্রোটেস্ট্যান্টরা – আমেরিকান ইতিহাস জুড়ে শিক্ষা, অভিবাসন, ভোটাধিকার, নাগরিকত্ব, জমি অধিগ্রহণ এবং অপরাধমূলক পদ্ধতি বিষয়ে সুবিধা ভোগ করেছে। বিশেষত প্রভাবিত হওয়া গোষ্ঠীগুলির মধ্যে আইরিশ, পোলিস এবং ইতালীয়রা সহ ইউরোপ থেকে আসা প্রোটেস্ট্যান্ট অভিবাসীদের অন্তর্ভুক্ত ছিল, যাদের প্রায়শই উনিশ এবং বিশ শতকের গোড়ার দিকে আমেরিকান সমাজে জেনোফোবিক বর্জন এবং অন্যান্য ধরণের জাতিগত ভিত্তিক বৈষম্যের শিকার হয়েছিল। ঐতিহাসিকভাবে, হিস্পানিকরা অনেকের ইউরোপীয় বংশধর থাকা সত্ত্বেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবিচ্ছিন্ন বর্ণবাদের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। ইহুদি, আরব এবং ইরানীয়দের মতো মধ্য প্রাচ্যের গোষ্ঠীগুলি যুক্তরাষ্ট্রে অবিচ্ছিন্ন বৈষম্যের মুখোমুখি হয়েছে এবং ফলস্বরূপ, এই গোষ্ঠীভুক্ত কিছু লোক শ্বেত হিসাবে চিহ্নিত করে না এবং তাদের হিসাবে চিহ্নিতও হয় না। আফ্রিকান আমেরিকানরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনেক ইতিহাসে তাদের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতার উপর বিধিনিষেধের মুখোমুখি হয়েছিল। স্থানীয় আমেরিকানরা গণহত্যা, জোরপূর্বক অপসারণ, গণহত্যা এবং বৈষম্যের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। এছাড়াও, প্যাসিফিক দ্বীপপুঞ্জীদের পাশাপাশি পূর্ব, দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশীয়রা বৈষম্যমূলক আচরণ এর স্বীকার হয়েছে।

    প্রধান জাতিগত ও জাতিগতভাবে কাঠামোগত প্রতিষ্ঠান এবং বর্ণবাদের প্রকাশের মধ্যে রয়েছে গণহত্যা, দাসত্ব, বিচ্ছিন্নতা, নেটিভ আমেরিকান রিজার্ভেশন, নেটিভ আমেরিকান বোর্ডিং স্কুল, অভিবাসন ও ন্যাচারালাইজেশন আইন এবং ইন্টার্নমেন্ট ক্যাম্প। আনুষ্ঠানিক জাতিগত বৈষম্য মূলত বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে নিষিদ্ধ হয় এবং সময়ের সাথে সাথে এটি সামাজিক ও নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য হিসাবে ধরা হয়। বর্ণবাদী রাজনীতি একটি বড় ঘটনা হিসাবে রয়ে গেছে, এবং বর্ণবাদ সমাজ-অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রতিফলিত হয়ে চলেছে। গবেষণায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে অপরাধ, বিচার, ব্যবসা, অর্থনীতি, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, মিডিয়া এবং রাজনীতি সহ আধুনিক মার্কিন সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাতিগত বৈষম্যের ব্যাপক প্রমাণ পাওয়া গেছে। জাতিসংঘ এবং মার্কিন মানবাধিকার নেটওয়ার্কের দৃষ্টিতে, “যুক্তরাষ্ট্রে বৈষম্য জীবনের সর্বস্তরে ঘিরে আছে এবং বর্ণের সমস্ত সম্প্রদায়কে প্রভাবিত করে।”


    কিছু আমেরিকান বারাক ওবামার রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থীতাকে দেখেছিলেন, যিনি ২০০৯ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং দেশটির প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপতি ছিলেন, এই লক্ষণ হিসাবে যে জাতি একটি নতুন, বর্ণ-উত্তর যুগে প্রবেশ করেছে। কিন্তু ওবামা পরবর্তী ডোনাল্ড ট্রাম্প একেবারে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন এই বৈষম্য ঐতিহ্যগতভাবেই চলছে এবং থাকবে।

    উপনিবেশ থেকে স্বাধীন হওয়া প্রথম ভূখন্ড আজকের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্জন অনেক কিন্তু বর্নবৈষম্যের এই জায়গায় যেন বেশ ধীরে এগিয়েছে। আশার কথা হল সময়ের স্রোতে অনেক কিছুই ভেসে চলে যায়। ইতাহাস সত্যকেই তুলে আনে তা সে যেমনই হোক না কেন।

    চলবে……….

     

    রফিকুজ্জামান মহিদ
    লেখক ও মানবাধিকার কর্মী

     

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫
    ১৬১৭১৮১৯২০২১২২
    ২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
    ৩০৩১