• শিরোনাম

    কোয়ান্টাম জগত :

    শ্রোডিঙ্গারের বিড়াল : সম্বরণ চট্টোপাধ্যায়।

    | ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০


    শ্রোডিঙ্গারের বিড়াল : সম্বরণ চট্টোপাধ্যায়।

    কোয়ান্টাম থিওরি

    সুকুমার রায়ের হ য ব র ল পড়েনি এমন লোক বোধহয় কমই আছে।আচ্ছা, গেছোদাদা কে মনে আছে তো! হ্যাঁ, সেই গেছোদাদা, যার দেখা পাওয়া খুব শক্ত।

    গেছোদাদার সঙ্গে দেখা করতে হলে প্রথমেই জানতে হবে গেছোদাদা কোথায় কোথায় নেই। তারপর জানতে হবে গেছোদাদা কোথায় কোথায় থাকতে পারে। তারপর জানতে হবে তুমি যখন সেখানে পৌঁছাবে তখন গেছোদাদা কোথায় থাকবে।

    তারপর….. না, গেছোদাদাকে শেষ পর্যন্ত পাওয়া যাবে কিনা বা কোথায় পাওয়া যাবে তা জানা যায় নি। কিন্তু কে এই গেছোদাদা? আর কেনই বা তাকে পাওয়া এত কঠিন? বাস্তব জগতের সবকিছুই যদি গেছোদাদা হয়, তাহলে? আসুন ডুব দিই এক অকল্পনীয় রূপকথার জগতে, যেখানে বাস্তব অবাস্তব মিলেমিশে এক হয়ে যায়।

    কোয়ান্টাম ফিজিক্সের তত্ত্ব অনুযায়ী ইলেকট্রন, ফোটন ইত্যাদি সাব এটমিক কণার অবস্থান ও গতিবেগ একসাথে সঠিকভাবে নির্নয় করা সম্ভব নয়। একে হাইজেনবার্গ এর অনিশ্চয়তার সূত্র বলে।


    আমরা সহজভাবে জানি যে পরমাণুর ইলেকট্রন গুলো কেন্দ্রের নিউক্লিয়াস কে ঘিরে অতি দ্রুত বেগে ঘুরছে।
    এখন আমরা যদি ওর গতিবেগ সঠিকভাবে মাপতে যাই, তাহলে ওই সময় ইলেকট্রন টা ঠিক কোথায় আছে বলা যাবে না। আবার অবস্থান সঠিকভাবে নির্নয় করলে, ওই মুহূর্তের গতিবেগ সঠিকভাবে বলা যাবে না।

    অতি সুক্ষ্ম ও শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি দিয়েও দুটো একসাথে সঠিকভাবে মাপা যাবে না।
    এই কথার তাৎপর্য কিন্তু সাংঘাতিক! যথেষ্ট ভুতুড়ে এবং ভয়ংকর!
    মাপা মানে কী? মাপা মানে পর্যবেক্ষণ। মাপা মানে নজরদারি।


    যে মাপছে, অর্থাৎ দর্শক বা পর্যবেক্ষক, তার উপস্থিতিতে বাস্তব কণা তার পুর্ণ স্বরূপ নিয়ে ধরা দিচ্ছে না। যেন লুকোচুরি খেলছে। এই আছে, এই নেই। কোথায় আছে কেউ জানে না। আছে শুধু সম্ভাবনা। এখানে থাকার সম্ভাবনা বেশি। ওখানে থাকার সম্ভাবনা কম। ব্যাস! ওই পর্যন্তই। কিন্তু আমাদের বাস্তবের সম্পর্কে ধারণাটা তো সেরকম নয়। বাস্তব বলতে আমরা বুঝি নির্দিষ্ট একটা অবস্থান, নির্দিষ্ট একটা গতিবেগ। মানে একটা সলিড, বোল্ড পর্যবেক্ষণ। একটা সঠিক, সুনির্দিষ্ট পরিমাপ। সুক্ষ্ম, ত্রুটিহীন একটা মান। তাই নয় কী? তাহলে? আসলে হচ্ছেটা কী? অবপরমানুর অতিক্ষুদ্র জগতে বাস্তবের স্বরূপটা ঠিক কেমন?
    কোয়ান্টাম জগতের এই অদ্ভুত আচরণ আমাদের এক ভয়ংকর মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়।
    বাস্তব বলে কি আদৌ কিছু আছে? নাকি বাস্তব হল চেতনার দ্বারা নির্মিত এক হলোগ্রাম! সহজ করে বোঝার চেষ্টা করা যাক।

    আকাশে চাঁদ উঠেছে। আমি দেখছি, আপনি দেখছেন না। কিম্বা আপনি দেখছেন আমি দেখছি না। এখন চাঁদ উঠেছে কিনা আমরা পরস্পরকে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারব। কিন্তু, যদি কেউ না দেখে? মানে ধরা যাক সারা পৃথিবীতে কেউ চাঁদের দিকে দেখছে না। অন্য কোন গ্রহের কোন এলিয়েন ও দেখছে না। মহাবিশ্বের কেউ দেখছে না, চাঁদ উঠেছে কিনা। আকাশে চাঁদ আছে কেউ দেখছে না। কেউ না। কোন দর্শক, কোন পর্যবেক্ষক উপস্থিত নেই। এ অবস্থায় কি আদৌ চাঁদটা আছে, না নেই?
    কী ভাবছেন? পাগলের প্রলাপ? আরে চাঁদটা তো আছেই, যেখানে থাকার সেখানেই আছে। কে দেখছে না দেখছে তাতে কী এলো গেল?
    ধীরে, বন্ধু ধীরে। খুব ঠান্ডা মাথায় শান্ত মনে এবার বিষয়টার গভীরে যাবার চেষ্টা করা যাক।
    এই যে বলছেন, ‘চাঁদটা তো আছেই’ এটা এতটা জোর দিয়ে কি করে বলছেন? পুর্ব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই তো বলছেন। এখন, এই মুহূর্তে তো কেউ দেখছে না। তাহলে নিশ্চিতভাবে কি করে বলা যাবে যে চাঁদটা আছেই আছে? বৈজ্ঞানিকভাবে কিভাবে প্রমাণ করবেন যে চাঁদটা আছে? আপনার বিশ্বাস চাঁদটা আছে। বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।


    বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করাই যাবে না, কারণ পর্যবেক্ষকই নেই। আর কে না জানে, বৈজ্ঞানিকভাবে কোন কিছু প্রমাণ করার প্রধান শর্তই হল পরীক্ষা- পর্যবেক্ষণ-সিদ্ধান্ত, এই তিনটি ধাপ পেরিয়ে আসতে হবে। পর্যবেক্ষকই যেখানে অনুপস্থিত, পর্যবেক্ষণ কিভাবে হবে? আর পর্যবেক্ষণ না করা গেলে সিদ্ধান্ত কি করে নেওয়া যাবে যে চাঁদটা আছেই?
    তাহলে দেখলেন তো, এই যে জোর দিয়ে বলছিলেন ‘চাঁদটা তো আছেই’ সেটা আসলে আপনার আমার বিশ্বাস মাত্র, কোন বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত নয়।
    এই অত্যাশ্চর্য ব্যাপারটা অনুধাবন করে মহাবিজ্ঞানী শ্রোডিঙ্গার অত্যন্ত অস্বস্তি অনুভব করেন। কোয়ান্টাম কণাদের এইরকম ভুতুড়ে আচরণ তাঁর মোটেই হজম হচ্ছিল না।
    কোয়ান্টাম ফিজিক্স কে বস্তুত চ্যালেঞ্জ করে বা ব্যঙ্গ করেই তিনি এক অসামান্য চিন্তন পরীক্ষা বা থট এক্সপেরিমেন্ট এর জন্ম দেন। বিজ্ঞানের ইতিহাসে সেটাই শ্রোডিঙ্গারের বিড়াল পরীক্ষা নামে খ্যাত।

    তিনি বললেন, ধরা যাক একটা ছিদ্র বিহীন বাক্সে একটা তেজস্ক্রিয় মৌল, একটা সেনসর, একটা হাতুড়ি, একটা বিষাক্ত গ্যাসের শিশি ও একটা জ্যান্ত বিড়াল রাখা হল। বাক্স বন্ধ করে দেওয়া হল। বাক্সটা এমনভাবে নির্মিত, যাতে বাক্সের ঢাকনা না খুললে কোনভাবেই জানা সম্ভব নয় ভেতরে কী ঘটছিল।

    এখন তেজস্ক্রিয় মৌল ঠিক কখন তেজস্ক্রিয় বিকিরণ করবে কেউ জানে না। কিন্তু বিকিরণ করলে সেনসর সেটা সেন্স করবে এবং হাতুড়িটাকে দিয়ে শিশিটাকে আঘাত করাবে। শিশি ভেঙে গেলে বিষাক্ত গ্যাস বেরবে এবং বিড়ালটি মরে যাবে।
    কিন্তু যদি মৌলটি বিকিরণ না করে তাহলে এসব কিছুই হবে না এবং বিড়ালটি জীবিত থাকবে।
    তাহলে, বাক্সটা বন্ধ করার কিছুক্ষণ পর যদি প্রশ্ন করা হয়, বিড়ালটি এখন জীবিত না মৃত? তাহলে সঠিক উত্তর কী হবে? বাক্স না খুললে কি করে সেটা বলা সম্ভব? সম্ভব নয়। তাহলে?

    কোয়ান্টাম থিওরি অনুযায়ী, বাক্স খোলার আগে পর্যন্ত বিড়ালটা একই সঙ্গে জীবিত আবার মৃত? কিন্তু, তা কি করে সম্ভব? কোন প্রাণী কি একই সঙ্গে জীবিত আর মৃত হতে পারে নাকি? কোন নির্দিষ্ট মুহূর্তে বাস্তব তো একটাই হবে, হয় জীবিত নয় মৃত!
    অথচ বাক্স না খুললে আমরা কিছুতেই বৈজ্ঞানিক ভাবে কোন একটি অবস্থা(জীবিত/মৃত)কে বাদ দিতে পারছি না। দুটো সম্ভাবনাই সমানভাবে থেকে যাচ্ছে।

    কোয়ান্টাম মেকানিক্স এর পরিভাষায় এই অবস্থাকেই বলে কোয়ান্টাম সুপার পজিশন। অর্থাৎ একই সঙ্গে দুটো ভিন্ন বাস্তবের সহাবস্থান।
    যেই ঢাকা খুলে গেল, পর্যবেক্ষক দেখল, সঙ্গে সঙ্গে একটা সম্ভাবনা বাতিল হয়ে গেল। আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারলাম বিড়ালটি জীবিত অথবা মৃত।
    একে বলে কোল্যাপসিং অফ কোয়ান্টাম সুপার পজিশন।
    তো সে বৈজ্ঞানিক পরিভাষা তো হল, কিন্তু ধোঁয়াশা তো রয়েই গেল। কিছুই তো পরিস্কার হল না। এ হেঁয়ালির উত্তর কী তাহলে?
    উত্তর খোঁজা এখনো চলছে। আর বিজ্ঞান যত অগ্রসর হচ্ছে, ধোঁয়াশাও বেড়েই চলেছে।

    শ্রোডিঙ্গারের বিড়াল পরীক্ষার থেকে পাওয়া অনুসিদ্ধান্ত পরবর্তীতে প্রমাণ হয়েছে আর একটি যুগান্তকারী পরীক্ষার দ্বারা। ইলেকট্রনের ডাবল স্লিট এক্সপেরিমেন্ট। তবে সে গল্প আরেকদিন বলব।
    কোয়ান্টাম মেকানিক্স আমাদের ভাবতে বাধ্য করছে -বাস্তব আসলে বস্তুনির্ভর নয়, বরং পর্যবেক্ষক নির্ভর। The reality is subjective and not at all objective as we think it is.

    আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদ / সম্বরণ চট্টোপাধ্যায়।

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫
    ১৬১৭১৮১৯২০২১২২
    ২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
    ৩০৩১