• শিরোনাম

    ছোট গল্প :

    একটি না তোলা ছবি : নিস্কৃতি মন্ডল

    | ০৩ মার্চ ২০২১


    একটি না তোলা ছবি : নিস্কৃতি মন্ডল

    প্রতীকি ছবি

    ফটোসাংবাদিক. হাতের মুঠোয় ডি এসএল আর। হঠাৎ মনে হল আজ সারা রাত ঘুরে সে একটা নিটোল ভাল বাসার ছবি ফ্রেম বন্দী করবে ।

    রাত একটা পার হয়ে গেল একটা শাটার ক্লিক করতে পারল না রুদ্র। উত্তরা থেকে এয়ারপোর্ট ,শাহবাগ থেকে মতিঝিল হয়ে কমলাপুর । রাত তিন টা এখন। না হবে না আজ ,সারা শহরে ভাল বাসার কোন ছবি নেই আজ।এই রাত্তিরে সব ভালবাসা চার দেয়ালের ফ্লাটে বন্দী ,ভাবতে ভাবতে নিজেই হাসে রুদ্রনীল।


    ঘুরে ফিরে কমলাপুর, সমর দা শিখিয়েছিলো ফটো সাংবাদিক হতে হলে ট্রেন স্টেশান । কিছু না কিছু পাবিই।

    ভোরের কোন ট্রেন ছাড়বে বলে প্লাটফর্মে দাড়িয়ে আছে ,সবুজ বাতি নেই। সময় হয়নি । যাত্রীরা ঘুম ঘুম চোখে এদিক সেদিক বসে আছে। সূর্য্য উঠতে বেশ দেরী । কিন্তু অন্ধকার নেই। বসে আছে রুদ্র ।  একটা ভালবসার ছবির দরকার।


    একটা সিগারেট হাতে লাইটার খোঁজে এ পকেট সে পকেটে। ভোর রাতে সিগারেট বেশ লাগে তার।,

    কিছুক্ষন আগে প্লাটফরম থেকে দুরে কয়েকটা ছেলে  বসে সিগারেট ফুঁকছিলো। একজনের হাতে আংগুলএর ঘসা ঘসি । হাতে কোন নেশার উপাদান। নেশা করে ওরা ।শেষ রাত বেছে নিয়েছে পুলিশের এর উৎপাত থেকে বাঁচতে। । নেশার জন্যে রাত জেগে থাকা ,অথবা কাজ শেষে নেশা ।


    ওরা যে খুব কাছের মনে হয় না, যতটা নেশা । মানুষের থেকে, বন্ধুর থেকেও প্রিয় হতে পারে নেশা।
    দুর থেকে ওদের পাশা পাশি দুরত্বহীন গোল হয়ে বসা দেখে মনে হয় বেশ চেনা । তেমন টা নয়। নেশা টানার পর হয়ত যে যার রাস্তায় ওরা হেঁটে যাবে। একটা মেয়েও আছে ওদের সাথে । সংকোচহীন।বেশ সুরে ভেংগে ভেংগে গান ধরেছে সে ..ইন্দুবালা গো… ইন্দুবালা গো…
    মাত্র এক ঘনটা আগের কথা এখন ওদের তিনজন প্লাটফর্মে অকাতরে ঘুমোচ্ছে ।

    ওদের জন্য রুদ্রর কোন খারাপ লাগা নেই। উপেক্ষাও নেই। , একদিন নেশা করে ঘুমাতে হবে এমন স্বপ্ন দেখতে দেখতে কেউ বড় হয়না। ভালবেসে কোন বন্ধু হয়ত হাতে ধরিয়ে দিয়ে হাসতে হাসতে বলেছিলো “টানো” অথবা নিতান্ত সখে কোন এক সুযোগে এলোমেলো হবার স্বাদ নিতে ‘দে না একটা টান দি”‘।

    সেই হয়ত শুরু। তারপর  শেষ  আর আসেনি।হয়ত কোন  যন্ত্রনার খামছি বুকে সহ্য করতে না পেরে হাত থেকে ফেলা হয়নি । যন্ত্রনা কে ভালবাসে ? মরার বিনিময়েও একটু সুখ  খোঁজে মানুষ। দেখেছি।

    হয়ত কারো স্বপ্ন ছিল সাকিব হবে ,কারও বুকে ছিলো শাবনুরের ছবির মত কোন সংসার , স্বপ্ন ছিলো ছিল রুনা লয়লা হবার অথবা কোন সুউচ্চ পর্বত আরোহী  হবে একদিন। অথবা কোন স্বপ্নই হয়ত ছিল না কোনদিন । তাতে কি আসে যায় ।

    ভোর রাতে নেশা করে ঘুমোতে হবে এমন স্বপ্ন দেখতে দেখতে কোন চালচুলো হীন ঘরের সন্তানও বড় হয়না ।কোথায় একটা টান অথবা ভালবাসা না কি মায়া কাজ করে রুদ্রর গভীরে।  ভেংগে যাওয়া টুকরো টুকরো কাচেঁর মত কোন স্বপ্ন।

    রুদ্র ভাবে,একত্রিত হয়ে নেশা করা এটাই আজকের একটা ভালবাসার ছবি হতেই পারত , নেশার প্রতি ভাল বাসা কম কি , যে ভালবাসার জন্যে অনেকদিন না দেখা ভালবাসার মানুষ কে দূরে বসিয়ে রাখা যায় , যে ভালবাসার জন্যে প্রিয় মানুষের অনুরোধ, আহবান উপেক্ষা করা যায়। উপেক্ষা করা যায় স্বামী, সংসার ,কেরিয়ার বড় হবার বিশ্বাস ,উপেক্ষা করা যায় কোন সম্ভাবনাময় আগামী, নিশ্চিতে  যা  বুকের গভীরে টেনে নেয়া যায় তাই তো ভালবাসা ।

    কিন্তু নাহ, রুদ্র তো মানুষে মানুষের ভাল বাসার কোন ছবি তুলতে ছেয়েছিল আজ। হঠাৎ তার পাসে বসা একজন শীর্ণ লোকের দিকে চোখ যায়। অনেকক্ষন বসে আছে সে , এবার খেয়াল করে তার দুটো হাত নেই, কিন্তু সে একা বসে কেন ? নিজেকে প্রশ্ন করে রুদ্র ,রুদ্র তাকিয়ে থাকে, প্রশ্ন করে না , একটু পর একজন নারী ধীরে ধীরে কাছে আসে তার , চলার গতিতে বোঝা যায় সে অন্ধ।

    এসে বলে তুমি এখানে ? রুদ্র এবার মনোযোগী হয়ে ওঠে।

    লোকটা বলে -এতক্ষন ? অভিমানে অনুযোগের সুর ।

    হতেই পারে হয়ত দশ মিনিট বলে মহিলার আধাঘন্টা পার হয়ে গেছে । মহিলা রাগ করে না, হাসে। মিষ্টি ছিলো সে হাসিতে।
    বলে- এই যে রুটি এনেছি । কলাও এনেছি।  অন্যকিছু।

    ঘুরে ঘুরে অনেক দুরে একটা দোকান খোলা পেয়েছি  তাই। দেরীর কারন ছিলো ,আর কেউ হলে ফুঁসে উঠতো অহেতুক দেরীর অভিযোগে । মহিলা বোঝে স্বামীর এই অনুযোগ রাগ নয়।

    রুদ্র তাদের কথোপকথনে  কান রাখে অন্য দিকে তাকিয়ে। তারা ডাক্তার দেখাতে এসেছে ঢাকা , লোকটার দুই হাত নেই তাই মহিলা তাকে খাইয়ে দিচ্ছে । রুদ্র ভাবে আমার দুটো হাত না থাকলে বোধ হয় আমাকেও কেউ এমন করে খাইয়ে দিতো ? ভেবেই হাসে নিজে নিজে।

    লোকটা বলছে -তুই এতক্ষন পাশে না থাকলে কেমন যেন লাগে আমার।
    মহিলা আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলে -জানি।রুদ্র ভাবে এই আত্ম বিশ্বাস কি করে জন্মায় যে তার একা বেশী ক্ষন থাকতে না পারার কথা অন্য কেউ এত সহজে বিশ্বাস করবে।

    রুদ্রর মাথায় হঠাৎ প্রস্ন জাগে , আচ্ছা এরা হয়ত স্বামী স্ত্রী বাইরের কোন জেলা থেকে এসেছে ,মহিলা অন্ধ তাহলে কি করে বুঝল তার স্বামী এখানে বসে আছে ,কি করে ঘুরে ফিরে এলো তার কাছে?সে তো প্রতিদিন এখানে আসে এমন নয়।

    এবার প্রস্ন না করে পারে না রুদ্র ,
    মহিলা এবার লাজুকের মত হাসে ,মাথা নিচু করে বলে-আমি ওর গায়ের গন্ধ দূর থেকে বুঝতে পারি তো।
    রুদ্র চুপ হয়ে গেলো। অন্ধ মানুষটির দিকে তাকিয়ে থাকে ।দুটো হাত হীন স্বামীকে অন্ধ স্ত্রীর রুটি কলা খাওয়ানোর ছবি তোলার জন্য হাতে তোলা ক্যামেরা ধীরে ধীরে নামিয়ে নিলো রুদ্র।

    রুদ্র ভাবছে ছবি একটি মুহর্ত মাত্র ।টাইমিং ঠিক থাকলে সাপ ইঁদুর এর কপালে ছোবোল মারার আগের ছবি তে মনে করানো যেতে পারে সাপ চুমু দিচ্ছে। সহাস্যে তোলা কোন কাপলের ছবিতে মাখামাখি ভালবাসা মাখিয়ে দেয়া এক মুহর্তের খেলা। ,

    একটি সাপের ছোবল কে চুমুতে আড়াল করা যায়, যুগল এর ঘন ছবিতে আড়াল করা যায় সম্পর্কের দুরত্ব ।অনেক ছবি সত্যি নয় ,সত্যি হয়না। মুহুর্তের পরেও মুহুর্ত থাকে যার কোন ছবি হয় না। মুহুর্ত সামান্য কিন্ত সময় অনেক দীর্ঘ।

    গায়ের ঘ্রাণ খুঁজে কাছে আসা ভালবাসার ছবি কি করে তুলবে তুমি রুদ্র নীল ? নিজেকে প্রশ্ন করে রুদ্র।
    দুরের কোন  এক ট্রেন সারা রাত চলতে চলতে ক্লান্ত হয়ে প্লাটফর্মে ঢুকলো  ।আস্তে আস্তে ভালবাসার কথা গুলো হুইসেলের শব্দের সাথে মিলিয়ে গেল ।

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫১৬
    ১৭১৮১৯২০২১২২২৩
    ২৪২৫২৬২৭২৮২৯৩০
    ৩১