• শিরোনাম

    গল্প

    সে জন আছে মাঝখানে / দেবাশিস লাহা

    | ১৭ মে ২০২০


    সে জন আছে মাঝখানে / দেবাশিস লাহা


    “নাম কি?”

    “আলি । সহিদুল্লা আলি।”


    “আসুন। আর কিছু জানার নেই।”

    “বিশ্বাস করুন আমি ধর্ম মানি না। নাস্তিকই বলতে পারেন। তাছাড়া আমি সম্পূর্ণ নিরামিষাশী।”
    “তাই? বেশ। আমি একটু বেরবো।”
    “প্লিজ দাদা, ঘরটা আমার একান্তই দরকার। একটা মাথা গোঁজার জায়গা না হলে” —
    “এই বাড়িতে তো কোনো ঘর খালি নেই।”
    “কিন্তু পানের দোকানের ছেলেটা যে বলল! ওখানেই তো বাড়ি ভাড়ার বিজ্ঞপ্তিটা দেখলাম।”
    “ছিল একটা। আজ সকালেই বুক হয়ে গেছে। আচ্ছা আসুন। আমার আবার দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
    ” হোয়াটস ইন আ নেইম! নামে কি এসে যায় ! ” প্রবাদপ্রতিম উক্তিটা আবার মনে পড়ে গেল। কোলাপসিবল পেরোতে গিয়ে যথারীতি হোঁচট । ইদানীং দুটো প্রায় সমার্থক হয়ে উঠেছে। শেক্সপীয়র এবং হোঁচট। কবি তো বলেই খালাস! তৃতীয় বিশ্বের এই দেশটিতে নামে যে কত কিছু এসে যায় আলি সেটা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। মোট ২৭ টা বাড়ি হল। অর্থাৎ সাতাশ বার ঘাড় ধাক্কা। না, ঠিক ঘাড় বা গলা ধাক্কা নয়। নাম ধাক্কা। নাম শুনেই ধাক্কা। অদ্ভুত, অমানবিক এই প্রত্যাখ্যান ওকে ছায়ার মত অনুসরণ করছে। ছ মাস তো হয়েই গেল। ছেলেটা বলেছিল অন্য কোনো নাম বলতে। রাজা, অনিল, দীপক, বরুণ, এমনকি হরিপদ বটব্যাল হলেও চলবে। শুধু কি পানের দোকান? প্রথম যে দালালের সঙ্গে কথা বলেছিল সেই রতন মিত্তির, তিনিও ঠিক এভাবেই শুরু করেছিলেন …
    “সত্যি নামটা কইবেন না, বাকি আমি সামলাইয়া লইব! ”
    ” বাট হোয়াটস ইন আ নেইম! ”
    “কি কইলেন? ”
    “ইয়ে মানে নামে কি এসে যায়? ”
    ” কথা মতো না চললেই ট্যার পাইবেন! তহন এই অধমের কথা স্মরণ করবেন! ”


    নিজেকে অধমের আসনে বসানো রতন মিত্তির যে নেহাত ভুল বলেন নি, প্রথম বাড়িটাতে ঢুঁ মারার পরই বুঝেছিল। বাড়িওয়ালার নাম রমাপদ মুখার্জী। প্রথম নামধাক্কা খাওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতা গিলতে গিলতে কোনোমতে সিঁড়ি ভাঙছে। ফর্সা গালে অদ্ভুত একটা আভা, কান দিয়ে যেন আগুন বেরোচ্ছে। রতন মিত্তির তখনও মরীয়া।
    ” একটু দ্যাখেন না দাদা! পোলাটা ভারি ভালো। ভদ্দরলোক যাকে বলে! ”
    ” না রতন। তুমি আমায় এ অনুরোধ কর না। বাড়িতে রাধামাধবের বিগ্রহ । তোমার তো অজানা নয়। কখন অখাদ্য, কুখাদ্য এনে তোলে ঠিক আছে! ”
    ” সেদিক থেকে কোনো ভাবনাই নাই। পোলাটা নিরামিষ খায় যে! ”
    “তুমিও কি পাগল হলে রতন! মোল্লার পোলা আবার নিরামিষাশী হয়! কাঁঠালের আমসত্ত্ব! হা হা হা! শুধু গরু নয়, ওরা মানুষ পেলেও ছাড়ে না। সব কটা টেররিস্ট!


    সব কেমন যেন ঝাপসা লাগছে। চশমা মুছতে গিয়ে বুঝল সমস্যাটা কাঁচে নয়, চোখে। নিজের প্রতি মাঝে মাঝে অনুকম্পা হয়। এত সহজে কেন যে কেঁদে ফেলে! সন্দেহ হয়, আদৌ পুরুষমানুষ তো ! জ্ঞান হওয়ার পর আব্বাকে কখনও কাঁদতে দেখেনি। দাদা ভাই তো বটেই, মহল্লার কোনো পুরুষের চোখেই জল দেখেনি। শুধু আম্মিই মাঝে মাঝে —-তবে কি ও মায়ের মত হয়েছে?
    বারোটা বাজতে এখনও মিনিট দশেক। শ্যামবাজারের এই পাড়াটা জনবিরলই বলা চলে। একে রবিবার তার উপর চড়া রোদ। মে মাসের দুপুরে খুব জরুরী না হলে কেউ তেমন একটা বাইরে বেরোয় না। আলির কথাই ধরা যাক। সুদূর বসিরহাট থেকে এসে কলকাতা চষে বেড়াচ্ছে। জরুরী না হলে এমন কাটফাটা গরমে কেউ ছুটে আসে? দিন দুয়েক হল অবশ্য একটা হোটেলে উঠেছে। শেয়ালদা স্টেশনের খুব কাছে। ঠিক করেছে এখানেই থাকবে। মানে যতদিন পারা যায়। কখন কোন দালাল ঘরের খোঁজ দিয়ে ফোন করবে আর একশ মাইল দূর থেকে ছূটে আসবে! হয় নাকি। তাছাড়া ইস্কুলের চাকরিটাও প্রায় হয়ে এসেছে। গত সপ্তাহে ইন্টার্ভিউ হল। কলকাতা রিজনেই এপ্লাই করেছিল। পিয়ারও সেটাই ইচ্ছে । এখন কেবল অপেক্ষা। যে কোনো দিন নিয়োগ হতে পারে। আলির যা রেজাল্ট তাতে না হওয়ার কোনো কারণ নেই। তারপর —–
    তারপর আর কি! পিয়া যা বলবে তাই হবে। আজই দেখা হওয়ার কথা। বাগবাজারে। লঞ্চ জেটি আর মন্দির ছাড়িয়ে একটা বাঁক। ওখানেই বসে ওরা। এখান থেকে গঙ্গাকে খুব ভাল করে চেনা যায়। কথাও বলা যায় ইচ্ছে হলে। কিন্তু পিয়ার আসতে আসতে পাঁচটা। এতক্ষণ ও কি করবে? হোটেলে ফিরে যাবে? না, তার চেয়ে বরং একটু হাঁটা যাক। রোদটা চড়া। তাতে কী! একটু পরেই বাড়ি ঘরের ছায়া পড়বে। তেমন হলে কোথাও বসা যাবে। একটু হাঁটলেই পাঁচ মাথার মোড়। গলির মুখে একটা চায়ের দোকান। সামনে ভাঙাচোরা বেঞ্চ। খরিদ্দার তো দূরের কথা, একটা মাছি পর্যন্ত নেই। বসে পড়লে মন্দ হয় না। চায়ের তো আর সময় অসময় নেই। বিস্কুটে কামড় বসাতেই গোটা দুয়েক কুকুর জুটে গেল। অপেক্ষাকৃত স্বাস্থ্যবান চতুষ্পদটি বিনা প্ররোচনায় কুঁইকুঁই করে উঠতেই বোঝা গেল খিদেটা ওরই বেশি পেয়েছে। আরও দুটো বিস্কুট নিয়ে ওদের দিকে ছুঁড়ে দিল। পায়ের কাছে চলে আসা কুকুরটি বেশ নির্ভীক।


    ” এই তোর নাম কিরে? চটপট বলে ফেল। কি রে এমন জুলজুল করে তাকিয়ে আছিস কেন? কি বললি? রসিদুল? সর্বনাশ! তোকে কেউ ঘর ভাড়া দেবে না! ”
    “রসিদুল? কি যে বলেন ভাই, ওর নাম তো লালু! আপনার শরীর ঠিক আছে তো? ইয়ে মানে কুকুরের আবার ঘর ভাড়া লাগে নাকি! তাছাড়া কুকুরের নাম রসিদুল হয় বাপের জন্মে শুনিনি! ”
    চায়ের ভাঁড় এগিয়ে দিতে দিতে দোকানদারটি বেশ সন্দেহজনকভাবে তাকালো।
    গাছ পালা, নদ নদী, গরু ছাগল, পাখপাখালি সবার সঙ্গেই কথা বলে আলি। কখনও চেতনে, কখনও অবচেতেনে। কবে থেকে এই পাগলামির সূত্রপাত জানে না। তবে পরিষ্কার মনে আছে নামাজের সময় মসজিদের দিকে না গিয়ে নদীর দিকে হেঁটে যেত। ঘাটের উপর বসে কি যেন বলত নিজের মনে । কোরান হাদিশের আয়াত নয়, মুয়াজ্জিনের আজানও নয়, ভাটিয়ালি গান ওকে অনেক বেশি টানত। জসীমউদ্দিন হাতে পাওয়ার পর দিনের পর দিন শুধু ইছামতীর ধারেই কাটিয়ে দিত। এমন ছেলের কি মাদ্রাসায় মন টেকে! পিটুনি কম জোটেনি। আম্মি না থাকলে হয়ত মরেই যেত। অনিচ্ছাসত্ত্বেও আব্বা ওকে একটা বাংলা মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিল। নদী পেরিয়ে বেশ খানিকটা হাঁটলে তবেই সেখানে যাওয়া যায়। প্রথম প্রথম আম্মিই ওকে নিয়ে যেত। বাঁশের সাঁকো পেরোনোর সময় মায়ের হাতের ছোঁয়া! কী সুন্দর ছিল সেই দিনগুলো!
    “লালু, ভুলু, টম হতে পারে, রসিদুল হলে কি সমস্যা! ” স্বগতোক্তির ভঙ্গিমায় আলি প্রায় বিড় বিড় করে উঠল।
    “কিছু বললেন ভাই? ”
    “না, তেমন কিছু নয়। আমাদের একটা নাটকের দল আছে। আগামী সপ্তাহেই স্টেজে উঠবে। তারই রিহার্সাল দিচ্ছিলাম। কুকুরের সঙ্গে কথোপকথন! আমার চরিত্রটা তেমনই। ”
    ” কি নাম নাটকের? ”
    “মহাভারত! ”
    ” কুকুরের বাড়ি ভাড়া! তাও আবার মহাভারতে! ”

    দোকানদারের চোখ কপালে ওঠার উপক্রম। আলি কোনো উত্তর দিল না।
    নিঃশেষিত ভাঁড়টা ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে আবার চলতে শুরু করল।

    তারপর সেন্ট পলস কলেজ, ইংরেজি অনার্স এবং জানি আলি হস্টেল। তারপর শেক্সপীয়র, শেলি, মিলটন, এবং রবীন্দ্রনাথ । তারপর জীবনানন্দ , নজরুল, হুমায়ুন আজাদ এবং পিয়ালি ! নদী এবং নারী একাকার ! তারপর — তারপর — তারপর

    তারপর আম্মির ফোন —
    “কিরে আলি, ঈদ তো চলে আসল। তুই কবে আসবি। আব্বা গোসা করে আছে। কোরবানির সময় যদি না আসিস —”
    “তুমি তো জানো আম্মি, আমি রক্ত দেখতে পারি না। আব্বাকে একটু বুঝিয়ে বলো। ধর্মের নামে প্রাণিহত্যা আমার না পছন্দ্! কোরবানির দিনগুলোতে আমার যে কি অবস্থা হয়! সেই দিনটা তুমি কি ভুলে গেছ, আম্মি? তুমিই তো আমায় বাঁচিয়েছিলে! ইছামতীর জলে— ”
    ” কিন্তু গত বছরও আসিস নি। এবার না আসলে তো গজব হয়ে যাবে! তোর আব্বাকে আমি যে কি করে সামলাই, সে আমিই জানি! –”
    আলি সেবারও যায় নি। ফল যা হওয়ার তাই হল। পার্ট থ্রি পরীক্ষার আগেই গ্রামের সবাই জেনে গেল হুজুর মৈনুদ্দিনের শিক্ষিত ছেলে সহিদুল্লা আলি মুরতাদ হয়ে গেছে। রোজা রাখে না, কোরবানি মানে না। শুধু কবিতা লেখে, গান শোনে আর নিরামিষ খায়।
    পিয়ালিও অবাক।
    ” তুই নিরামিষ খাস কেন রে? ”

    “আবার সেই প্রশ্ন! জানি না! কেমন যেন লাগে! গা গুলোয়, বমি পায়! ”

    ” বাপ রে! তুই তো দেখছি দৈত্যকুলে প্রহ্লাদ! আগেই বলে রাখছি আমি কিন্তু ইলিশ মাছ ছাড়তে পারব না। আরেকটা শর্ত যোগ হল কিন্তু! আগের গুলো মনে আছে? বল তো!
    “তুই-ই বল না! ”
    ” এক, ধর্ম পরিবর্তন করতে পারব না। দুই, বিয়ের পর তোদের বাড়িতে থাকতেও পারব না! ”

    “দূর পাগলি! আমি তো নিজেই এসব মানি না। আর বাড়ির দরজা তো বন্ধই হয়ে গেছে বলা যায়! আম্মির দয়ায় মাঝে মধ্যে একটু থাকতে পারি। চিন্তা করিস না। এত বড় শহরে মাথা গোঁজার একটা আস্তানা ঠিক পেয়ে যাব। তারপর শুধু তুই আর আমি। ”
    রোদটা আর তেমন গায়ে লাগছে না। পাঁচ মাথার মোড় ছাড়িয়ে অনেকটা এগিয়ে এসেছে। গন্তব্য বাগবাজার গঙ্গা। পিয়ালী যখন আসে আসুক। গাছের ছায়ায় বসে নদীর সঙ্গে কথা তো বলা যাবে। রাস্তার দুধারে কেবল বাড়ি আর বাড়ি। বেশির ভাগই চার বা পাঁচ তলা। আর এখন যে সব বাড়ি হচ্ছে সে সবই তো আট দশ তলা। নিউ টাউন, রাজারহাট এসব জায়গায় তো কুড়ি পঁচিশ তলা স্কাই স্ক্র্যাপার মেঘ ছুঁয়ে ফেলেছে। এত এত বাড়ি অথচ ওর জন্য একটুও জায়গা নেই! কেমন যেন অবিশ্বাস্য মনে হয়! যেন কোনো যাদু বাস্তব অথবা পরাবাস্তবের দুনিয়া। কোলরিজের ভাষায় বলতে ইচ্ছে করে —

    Building, Building everywhere and not a room to sleep.

    দশ নম্বর বাড়িটা হাতছাড়া হওয়ার পর রতন মিত্তির হাল ছেড়ে দিলেন।

    ” দ্যাখলেন তো ! অহনও সময় আছে। অন্য একটা নাম বাছেন। আপনিই তো কইছেন নামে কি আসে যায়! ”
    সত্যি, অনেক কিছু এসে যায়! আলিও এখন বোঝে। আর তাই জেদটা বেড়েই চলেছে। রবি ঠাকুর, নজরুলের দেশে একটা ঘরের জন্য মিথ্যে বলতে হবে? কেন? কি অপরাধ ওর? পৃথিবী জুড়ে যে সব মানুষ নৃশংস হত্যালীলায় মেতেছে তাদের নামের সঙ্গে ওর নামের সাদৃশ্য আছে বলেই ও সন্ত্রাসবাদী? প্রধানমন্ত্রীর হত্যাকারীর মাথায় পাগড়ি ছিল বলে যে দেশে হাজার হাজার শিখকে হত্যা করা হয়, সেই দেশের কাছে কিই বা আশা করা যায়! অথচ কোনো সন্ত্রাসবাদী হামলার খবর পেলে আলি ঘুমোতে পারে না। ফ্রান্স থেকে আফগানিস্তান, ইংল্যান্ড থেকে ইরাক, ভারত থেকে পাকিস্তান — কতবার যে ও মরে যায়! কলম থেকে শুধুই আর্তনাদ বেরিয়ে আসে। বড় অসহায় লাগে । মানুষ এত নির্মম হতে পারে!
    “তবে আপনি রাজাবাজার, এন্টালি, গার্ডেনরিচ এই সব জায়গায় দেখুন। খামোখা কেন যে —”
    খামোখা? কিভাবে বোঝাবে ওসব জায়গায় থাকলে ওর দম বন্ধ হয়ে যাবে! প্রাণটাও চলে যেতে পারে।মুরতাদ কি এবং কেন সেই বিশ্লেষণে যাওয়ার চেয়ে আকাশ দেখা ঢের ভাল। একজন তো বোঝে! নদীর নামে যার নাম। পিয়ালী — পিয়ালী!


    কখন যে নদীর কাছে চলে এসেছে খেয়াল করেনি। ইদানীং বড় অন্যমনস্ক থাকে। মন্দিরটা ডান হাতে রেখে একটু এগিয়ে যেতেই মোবাইলটা বেজে উঠল। পিয়া নয় তো! আসবে তো আজ? নাকি সমস্যায় পড়েছে বলে —
    না, একটা অচেনা নাম্বার।
    “হ্যালো, কে বলছেন?”
    “তোর বাপ বলছি রে কাটাচোদা !”
    হকচকিয়ে গেলেও নিজেকে সামলে নিল।
    “আপনি নিশ্চয় ভুল নাম্বারে ফোন করেছেন। ”
    ” এই কুত্তার বাচ্চা। ডায়ালগ মারাবি না। চুপচাপ শুধু শুনে যা। পিয়ালী আমার বোন। এবার নিশ্চয় চিনেছিস। ভালই ভালই কেটে পড়। নইলে তোর লাভ জিহাদ গাঁড়ের মধ্যে ঢুকিয়ে দেব! ”
    কিছু বলার আগেই কলটা কেটে গেল। বলবেই বা কি! কখনও কখনও মহাপুরুষকেও নীরব হয়ে যেতে হয়। আলি তো সামান্য মানুষ। স্বাভাবিক হতে বেশ খানিকটা সময় লাগল! পিয়া ঠিক আছে তো?

    ওর দাদা কিভাবে নাম্বারটা পেল? ফোনটা কি ওরা কেড়ে নিয়েছে? নাকি পিয়া নিজেই —-
    হাত পা রীতিমত কাঁপছে। কল করবে নাকি? না,থাক। সমস্যা বাড়তে পারে। পাঁচটা বাজতে এখনও ঘন্টা দুয়েক বাকি। দেখা যাক কি হয়। তারপর না হয়। ও অবশ্য প্রথমেই বলেছিল বাড়ি থেকে মেনে নেবে না। কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না। ও আলিকেই বিয়ে করবে। বাবা খুব নরম মনের মানুষ। প্রথম প্রথম আপত্তি করলেও একবার বিয়ে হয়ে গেলে —-শুধু একটা মাথা গোঁজার আস্তানা চাই। ব্যাস!

    বহুদিন পর শব্দটা আবার ফিরে এসেছে। কলেজ হস্টেলে শেষবার শুনেছিল। যদিও সঞ্জয়ের মুখে “কাটা” শব্দটা এতটা অশ্লীল লাগেনি। ধর্ম নিয়ে অনেক আলোচনাই হত। কিন্তু কখনই তা বিদ্বেষের কারণ হয়ে ওঠেনি।
    তেলেভাজা মুড়ি খেতে খেতে সঞ্জয়ই বিষয়টা শুরু করেছিল।
    ” ডিয়ার আলিবাবা, তুই যে দিনরাত নিরামিষ নিরামিষ করিস, চিংড়ির চপ পর্যন্ত মুখে তুলিস না, ব্যাপারটা খুব অস্বাভাবিক না? মুসলিম হয়ে– ”
    ” কেন, মুসলমান বলে আমি কি নিরামিষ খেতে পারি না? মিশাইল ম্যান কলামের নাম নিশ্চয় শুনেছিস। উনিও তো –”
    ” আরে বাবা অণুবীক্ষণ দিয়ে খুঁজতে হয়। হিন্দুদের মধ্যে যখন শতকরা ৩০/৪০ ভাগ নিরামিষাশী, তোদের মধ্যে সেটা দশমিকে ঠেকবে। ”
    ” জানি। কিন্তু আমরা মানে ভারতের মুসলমানেরা তো আরব দেশ থেকে আসিনি। সবাই কনভার্টেড। ধরে নে না কোনো সাত্ত্বিক হিন্দুর জিন আমার রক্তের ভেতর সক্রিয় হয়ে উঠেছে।আমার কি মনে হয় জানিস একদিন সবাই নিরামিষাশী হয়ে যাবে। বলা যায় না আমি হয়ত আবার হিন্দু হয়ে যাব! অথবা বৌদ্ধ। রক্তপাত একদম ভাল লাগে না।”
    ” পারবি না। হিন্দু থেকে মুসলিম হওয়া যায়। কিন্তু মুসলিম থেকে কখনও হিন্দু হওয়া যায় না। ”
    ” কেন যাবে না ? ”
    ” তোরা যে কাটার জাত। জোড়া লাগাবে কে? হা হা হা! কিছু মনে করিস না মাইরি তুই না একটা কিম্ভূত বস্তু — এত অবাস্তব — ইয়ে মানে কি বলি — একটা মূর্তিমান রূপকথা! জন্মসূত্রে মুসলমান, খাদ্যে জৈন, বিশ্বাসে নাস্তিক, দৃষ্টিভঙ্গিতে মানবতাবাদী! না ঘরকা, না ঘাটকা! না এ ধারে না ওধারে! তুই সত্যি আছিস তো? মানে এক্জিস্ট করিস তো ! ”


    তিন নাম্বার সিগারেটটা ধরাতেই সূর্যটা ঝুঁকে পড়ল। কিন্তু কী আশ্চর্য ! এবারও পিয়া কিছু বলল না। অথচ ঠোঁট থেকে সিগারেট কেড়ে নেওয়া ওর চিরকালের অভ্যেস। সময় মতই এসেছে। প্রায় ঘড়ি ধরে। হেসেছে, গান শুনিয়েছে। আলির হাতও ধরেছে একবার। চোখ থেকে চুল সরাতে সরাতে ওর আঙুলগুলো বেশ কয়েকবার কবিতাও লিখে ফেলেছে। কিন্তু এ কেমন পিয়া! গন্ধ ছড়াচ্ছে, অথচ পাপড়ি মেলছে না। মাঝে মাঝে কেবল আড়চোখে দেখছে। দাদার ব্যাপারটা কি ও জানে? পিয়ার উপস্থিতিতেই কি ফোনটা করেছিল ? আলি কি প্রসঙ্গটা তুলবে? যদি ভয় পায়? অনেক প্রশ্ন। ওই যে আবার! সরাসরি নয়, তির্যক ভঙ্গিমায় তাকিয়ে আছে পিয়া। প্রিয় কবির লাইনগুলো এখন আর পিছু ছাড়তে চায় না।
    “আজকে অস্পষ্ট সব? ভালো করে কথা ভাবা এখন কঠিন
    অন্ধকারে অর্ধসত্য সকলকে জানিয়ে দেবার নিয়ম এখনও আছে ; তারপর একা অন্ধকারে বাকি সত্য আঁচ করে নেওয়ার রেওয়াজ রয়ে গেছে; সকলেই আড়চোখে সকলকে দেখে।”

    কিন্তু একী! এত বৃষ্টি কেন? চোখ থেকে গাল, গাল থেকে চিবুক! রীতিমতো বানভাসি!
    “এই পিয়া! তুই কাঁদছিস কেন? এই –”
    কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটা আর্তনাদ।
    ” আমি আর পারছি না আলি ! একদিকে বাবা, দাদা আর একদিকে তুই আর তোর নাম! আমি যে কি করি! খুব মরে যেতে ইচ্ছে করে জানিস! তোর সঙ্গে দেখা না হলেই বোধহয় — যাক আজ তো আর একটা ঘরের খবর ছিল! কিছু হল? কি রে! বল কিছু। থাক বুঝেছি। নিশ্চয় আবার সত্যি নামটা বলেছিস। অন্য একটা নাম বললে কি এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায়, বুঝি না! ”
    “পিয়া, তুইও! ”
    গলাটা কেমন জড়িয়ে যাচ্ছে।
    ” তোর যা ইচ্ছে কর। আজ উঠি । ”
    ” চল, তোকে বাড়ি দিয়ে আসি। ”
    ” না রে। আজ শপিংয়ে যাওয়ার কথা।
    শ্যামবাজারের মোড়ে বাবা মা ওয়েট করছে। ”
    ” বেশ তবে আয়। সাবধানে যাস। তুই যা লাফাস মাঝে মধ্যে! ”
    ” বাব্বা ছেলেটা কত্ত খেয়াল রাখে আমার! কিন্তু তুই যাবি না? ”
    ” যাব। একটু পরে। নদীর সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে।”


    এপারেও নয়, ওপারেও নয়, এ ঘাটেও নয়, ও ঘাটেও নয়, জলের ঠিক মাঝখানে একটা লাশ ভেসে উঠেছে। চোখ খোবলান কাক আর বুক ঠোকরান পানকৌড়ি দেখে অবশ্য বুঝে নেওয়া যায় দুদিন আগেও সে মানুষ ছিল। নদীর সঙ্গে কথা বলতে চাইলে প্রয়োজনে যে জলকেও ছুঁয়ে ফেলতে হয়, একথা তার চেয়ে ভালো আর কেই বা জানবে। স্রোতের সঙ্গে তার এই জানাশোনাটা কিন্তু নতুন নয়। কোরবানির উদ্দেশ্যে কিনে আনা গরুটাকে যখন জোর করে জবাই করা হচ্ছিল ঠিক সেই সময় ক্লাস নাইনের একটি কিশোর ইছামতীর বুকে লাফ দেয়। মাত্র চারদিনের মধ্যে সে একটা নামও দিয়ে ফেলেছিল প্রাণিটার । কী যেন নামটা —-কী যেন –কী যেন —-কী যেন!

    ছাড়ুন তো ! নামে কী এসে যায়! হোয়াটস ইন আ নেইম!

    -দেবাশিস লাহা

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫
    ১৬১৭১৮১৯২০২১২২
    ২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
    ৩০৩১