• শিরোনাম

    মধ্যযুগীয় শক্তির বিরুদ্ধে লড়ছেন আফগান নারীরা : অনিকেত মহাপাত্র

    | ১১ অক্টোবর ২০২১


    মধ্যযুগীয় শক্তির বিরুদ্ধে লড়ছেন আফগান নারীরা : অনিকেত মহাপাত্র
    তালিবান শাসনে আফগানিস্তান।সেই তালিবান আবার পাকিস্তান পরিচালিত।কথা হচ্ছিল পঞ্চশিরবিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপকের সঙ্গে।ভয়ে সিঁটিয়ে আছেন। খুব সন্তর্পণে কথা বলছিলেন।পাকিস্তানি প্রযুক্তিবিদেরা আফগানিস্তানের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির মোবাইল, কম্পিউটার, ওয়েবসাইটে উঁকি দিচ্ছে এবং সামান্যতম বিরোধিতা দেখলে হাক্কানিদের লেলিয়ে দিচ্ছে।

    তাঁর কাছে শুনলাম শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত অনেকেই তালিবানের কাছেআত্মসমর্পণ করছে নিজেরও পরিবারের অন্যদের প্রাণ বাঁচাতে।আফগান বিদেশদপ্তরের আমলারা বিভিন্ন দেশে শরণার্থী হওয়ার জন্য আবেদন করেছেন।প্রায় প্রতিদিন আফগান নারীরা কালাশনিকভের গুঁতো আর বেতের বাড়ি খাচ্ছেন তালিবানের বিরুদ্ধে নিজেদের স্বরকে তুলে ধরতে গিয়ে।তালিবান রক্তচক্ষু কেউ পেক্ষা করে পথে নামছেন প্রতিদিন নিজেদের খুব সাধারণ ও মৌলিক কতকগুলি অধিকারের দাবিতে। সামাজিক মাধ্যমে তালিবানি-সংস্কৃতির বিকল্প হিসেবে তুলে ধরছেন চিরায়ত আফগান ঐতিহ্যকে।

    বর্বরদের মারের বিরুদ্ধে চোখে চোখ বলতে পারছেন’ আমরা  তোমাদের ডরাইনা’।আর সারা বিশ্বের সমস্ত শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ বসে বসে সেই খবর দেখছি আর নীরব থেকে তালিবানের বৈধতা নির্মাণের কাজ অজান্তে করে যাচ্ছি।আবার এই ভারতের ক্ষেত্রে আর এক রকম সমস্যা।এখানকার একটা দীর্ঘ রেওয়াজ হল সমাজের একটি অংশের ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ বা বর্বরতা দেখলেও চুপচাপ থাকতে হবে কিংবা ওদের পিঠ চাপড়ে দিতে হবে।না হলে আপনি ধর্মনিরপেক্ষ নন।


    যেহেতু ভারতের সমাজের একটি অংশ তালিবানদের নীরব বা সরব সমর্থন করছেন।তাই ভারতের বুকে দাঁড়িয়ে তালিবানের বিরুদ্ধে একটা কথা বললে এখানকার সাংস্কৃতিক সমাজ আপনার দিকে এমন ভাবে তাকাবে যেন আপনি অন্য গ্রহের প্রাণী আর মনে মনে আরও কয়েকটা গালাগালি দেবে। যার মধ্যে একটা হবে ‘ব্যাটা আর.এস.এস নিশ্চিত, ব্যাটা ফ্যাসিবাদী’ !ভারতে সেই তালেবান-রাজের কিংবা খিলাফতের খোয়াব দেখা লোকেদের পক্ষ নিয়ে দুটো কথা বলুন মিডিয়া এবং সাংস্কৃতিক সমাজের কাছে আপনি তখন হিরো।বাজারি পত্রিকাগুলো আপনাকে লেখার জন্য আমন্ত্রণ করবে, আপনার প্রতিবাদকে গ্রন্থের আকার দেবার প্রস্তাব ও আসবে।আর বর্বরতার বিরুদ্ধে কথা বলুন আপনি সাংস্কৃতিক জগৎ ও মিডিয়া কিং বা প্রকাশনা জগতের কাছে হয়ে যাবেন ব্রাত্য।কে আর এইভাবে জিরো হতে চায় !

    তাই সত্যকে এড়িয়ে সবাই সহজ পথকে অবলম্বন করে।এবার আমরা প্রায় তিন পক্ষকাল পূর্বে চলে যাব। সেই সময়ের আফগানিস্তানের প্রেক্ষাপট।সেই সময়ে আফগাননারীদের দৃঢ়তা, সর্বস্ব-পণ ও অস্ত্রহাতে লড়াইয়ের ময়দানে নামার চিত্রে খুঁজে পাওয়া যাবে আজকের আফগানিস্তানের বাস্তবতাকে। সেই তিন পক্ষকাল পূর্বে সংবাদ-প্রবাহের নির্যাস তালিবান নেতাদের ঘোষণা থেকে জানা যাচ্ছে তারা


    আফগানিস্তানের পঁচাশি শতাংশ ভূখণ্ড দখল করে ফেলেছে।আমেরিকা প্রায় পাততাড়ি গুটিয়ে ফেলার পর পাহাড়ের খাঁজ থেকে পিলপিল করে বেরিয়ে আসছে তালিবানেরা। সাধারণ নাগরিকদের একটা অংশ তাদের সমর্থন করতে বাধ্য হয়েছে।যেহেতু বহু গ্রামীণক্ষেত্র এখন তাদের দখলে, তাই সমর্থন না করেও উপায় নেই।আবার আফগান সামরিক বাহিনীর বহুসৈনিক আত্মসমর্পণ করেছে বা বাধ্য হয়েছে করতে তাদের কাছে।বেশ কয়েকজন যুদ্ধবিমান চালককে হত্যা করেছে তালিবানেরা।সংবাদ সূত্রে জানা যাচ্ছে পার্শ্ববর্তী দেশ তাজাকিস্তানে আশ্রয়

    গ্রহণ করেছে আফগান সামরিক বাহিনীর কেউ কেউ।রাতের অন্ধকারে প্রায় না জানিয়ে বিদায় নিয়েছে আমেরিকার বিমান বাহিনীর একটি কম্যান্ড। দূতাবাস গুটিয়ে ফেলেছে বহুদেশ।প্রাণ পণে লড়ে যাচ্ছে আফগান সামরিক বাহিনী।যদিও জয়ের আশা তারা দেখছেনা।হেরে যাওয়ার আগে একটা মরণ কামড় দেবার অপেক্ষায় যেন দিন গুনছে।আর সর্বশেষ সংযোজন অবশ্যই আফগাননারীদের অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়া। অস্ত্র চালাতে চাই প্রশিক্ষণ।সেই অস্ত্র চালনাকে অধিক কার্যকরী করে তোলার জন্য দীর্ঘ অভিজ্ঞতাও প্রয়োজন। কিন্তু একটা জাতি


    যখন মরতে বসে, দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যায়। তখন প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলা মানে বিলাসিতা। আসন্ন তালিবান শাসনে যুক্তি, সংস্কৃতি, মুক্ত চিন্তার কী হাল হবে সে নিয়ে কথা বলা মানে পরিহাস করা। কিন্তু নারীদের কী হতে চলেছে , তা নিয়ে কথা বলতে হবে বৈকি ! হয়তো ওখান থেকে কোনো মালালা ইউসুফযাই উঠে আসবেন। অবশ্য যদি প্রাণে বেঁচে থাকেন !আপনারা হয়তো নয়া মালালাকেও নোবেল

    দেবেন ! কিন্তু তারপর? ওখানে পড়ে থাকা বাকি মালালাদের কী হবে ? অবশ্য তাতে আপনাদের কী! আপনাদের সব আন্দোলন , সব আজাদির চেতনার ক্ষাকবচের মধ্যে থেকে। এর বাইরে আপনাদের স্বরনম্র। দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ। সমস্যা-বোধ নিয়ে যথার্থ চিন্তন সত্যিই কমে গেছে। সমস্যাকে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে হুজুগ কাজ করছে বেশি। তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ব্যক্তিগত লাভ-লোকসানের বিচিত্র হিসেব-নিকেশ।

    ফলে যে বুদ্ধিজীবী-সমাজের কাছে সমাজের , দেশের অনেক প্রত্যাশা থাকে ; তাঁরা প্রায়শ হয় যথার্থ সমস্যাকে এড়িয়ে যান কিংবা বিচিত্র তথ্য ও তত্ত্বসহযোগে  ‘সমস্যা-নির্মাণ’ করেন। আসন্ন তালিবানি আমলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন আফগান মহিলারা।পূর্বের তালিবানি শাসনের সময়ের কথা বাদই দিলাম। এই সময়ের প্রেক্ষিতে কী হতে চলেছে তার দুই-একটি দৃষ্টান্ত আমাদের চোখে পড়ছে বৈকি! তালিবান

    বাহিনীর অগ্রগমনকে নিয়ে সংবাদ করতে যাওয়া ইউরোপীয় মিডিয়ার শ্বেতাঙ্গ ও খ্রিস্টান নারী সাংবাদিককে চোখটুকু বাদে সর্বাঙ্গ বোরখায় ঢেকে নিতে হয়েছে। কেন করতে বাধ্য হলেন ? কেউ প্রশ্ন করেনি ?কেন প্রশিক্ষণহীন আফগান নারীদের হাতে অস্ত্র তুলে নিতে হচ্ছে এখন? যখন আফগানি তখতে বসতে চলেছে তালিবানেরা। এই প্রশ্ন কেউ করছেনা, হয়তো করার প্রয়োজন মনে করছেনা ! যাঁরা ইসরায়েল-হামাস

    কিংবা প্যালেস্টাইন সংঘর্ষের সময় সক্রিয় বা অতি সক্রিয় ছিলেন, তাঁরা কোথায় ? কোথায় নারীবাদীরা ? আমরা সাধারণ মানুষ , আমাদের কোনো দায় নেই রাজনৈতিকভাবে ঠিক কথা বলার। কূটনৈতিক-সাম্য বজায় রাখাও আমাদের কাজ নয়।সাদা চোখে যা দেখব , যা অনুভব করব—তা অকুন্ঠভাবে ব্যক্ত করব। তাহলে আমরা নীরব কেন! আমরা তবে কারা ? ‘গুল-মকাই’ নামের সিনেমাটির কথা বার বার মনে

    পড়ছে।সোয়াট উপত্যকার অবস্থা যদি ওই হয়। তাহলে হেরাট, কান্দাহার,কাবুলেকী হতে চলেছে তা সময়ই বলে দেবে।আফগানিস্তান ছিল সেই রাষ্ট্র যারা আমেরিকার ও আগে নারীদের ভোটাধিকার দিয়েছিল।১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে আফগান নারীরা প্রথম ভোটাধিকার পান।যা ইংল্যান্ডের নারীদের ভোটাধিকা পাওয়ার একবছর পরের ঘটনা এবং আমেরিকার নারীদের ভোটাধিকার পাওয়ার একবছর আগের ঘটনা। ১০ই জানুয়ারি ১৯১৮-তে ইংল্যান্ডে এই ঘটনা ঘটে আর ১৯২০- এর ১৮-ই অগাস্ট আমেরিকায় এই অধিকার প্রাপ্তির কাজ সম্পূর্ণ হয়।গত শতাব্দীর ষাট

    কিংবা সত্তর দশকে স্বাধীনতার, মুক্তচেতনার লহর বইত ওই দেশে।আফগানিস্তানে সোভিয়েত রাশিয়ার ‘আগমন’ এবং তারপর মুজাহিদিনদের উত্থান আর প্রথম পর্বের তালিবানি শাসন; ক্রমেই অন্ধকারের দিকে চলেছিল আফগানিস্তান। আর ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল আফগাননারীদের অবস্থা।কিন্তু এই শতাব্দীর শুরুতে আমেরিকাসহ পশ্চিমাশক্তির আফগানিস্তান আক্রমণ এবং তালিবান রাজত্বের পতন

    আবার নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখায় আফগান নারীদের অজস্র ধ্বংসের মাঝেও।প্রায় দীর্ঘ দুইদশক প্রশ্বাস নেবার সুযোগ পান তাঁরা। তাই আবার অন্ধকার সময়ে ফিরতে একেবারেই রাজি নন।যেকোনো মূল্যে তাঁরা তালিবানি শক্তিকে আটকাতে বদ্ধপরিকর।তালিবান যেহেতু বন্দুকের ভাষা বোঝে তাই বন্দুক নিয়ে তাঁরা রাস্তায় নেমে পড়েছেন।এটা কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতীকী হলেও অনেক নারী ওয়ারফ্রন্টে চলে

    গেছেন। আফগান সরকারি বাহিনীতে নারীরা তো ছিলেনই, সেই সঙ্গে এমনও কোনো কোনো নারী আছেন যাঁদের রয়েছে রুশদের সঙ্গে এবং গৃহযুদ্ধে লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা।হেরাট বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ছাত্রী নিয়মিতবন্দুক,গ্রেনেড চালানোর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন বেশ কিছুদিন আগে থেকে।তাঁরা নিজেদের শিক্ষার অধিকার কোনো ভাবে হারাতে রাজি নন।বিশ্বের বিভিন্ন শক্তিশালী গোষ্ঠীর দাবার চালে আফগানিস্তানের জন্য

    যে অবস্থাই অপেক্ষা করে থাকুক না কেন ওখানকার নারীরা যেসহজে হার মানবেন না তা বোঝা যায়।পুরুষতান্ত্রিক চিন্তন ও প্রয়োগের চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকা তালিবান নরানারীদের হাতে মরার অগৌরব কে কীভাবেগ্রহণ করে,তাও দেখার অপেক্ষায় আছেন এই সব বীর নারীরা।এঁদেরএই মরণ পণ যুদ্ধ প্রস্তুতি দেখে বারবার চোখে ভাসছিল কুর্দিস্তানে তুর্কি-আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মরণপণ লড়তে থাকা কুর্দ নারীদের ছবি।

    সমর-সাজেসজ্জিত হয়ে নেমেছিলেনএবংনামছেন অসম এক লড়াইয়ে।আমরা যারা শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা করি, কী করে ভুলে গেলাম বামিয়ানের সেই ধ্বংসলীলার কথা।শিল্প কলার সেই অনবদ্য নিদর্শন গুলি ধর্মান্ধতার গ্রাসে যে ভাবে নষ্ট হয়ে গেছে তাকে নিন্দা করার ভাষা নেই।তাহলে আমরা চুপ করে কেন ,এই প্রশ্ন বারবার নাড়া দেয়।আমরা কি তাহলে ভয় পাই ! কাকে ভয় পাই ! যদি শান্তি প্রিয়তার দোহাই দিয়ে, ‘আমি কোনো ঝামেলায় থাকিনা’-

    এই নির্মোকের আড়ালে নিজেদের অদৃশ্য করে রাখার চেষ্টা করি নিজেদের,তাতে সমান্য কিছুদিন হয়তো নিজেকে সুরক্ষিত বোধ করব।তারপর আসবে অবধারিত সেই সময় যখন বোধ হবে আমরা আসলে এতদিন নিজেদের বিপন্ন করবার সুযোগ তৈরিতে লেগেছিলাম পূর্ণউদ্যমে ! উল্টোদিকে দেখুন আফগান নারীদের; তালিবানের মত বর্বর ও ধর্মান্ধ শক্তির বিরুদ্ধে লড়ছে। ধুকী তালিবানদের কয়েক লক্ষ জঙ্গি ? না লড়তে হচ্ছে পার্শ্ববর্তী দেশ পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর সঙ্গে।আর এই ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যে পুঞ্জিভূত মধ্যযুগীয় অভিপ্রায়ের বিরুদ্ধে।

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫
    ১৬১৭১৮১৯২০২১২২
    ২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
    ৩০৩১