• শিরোনাম

    গল্প:

    মেঘনায় ওঠে ঝড় : পলাশ মণ্ডল

    | ১০ আগস্ট ২০২০


    মেঘনায় ওঠে ঝড় : পলাশ মণ্ডল

    ‘তেলের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে চলমান পরিবহন ধর্মঘট আজ তুলে নেওয়া হয়েছে। সাত দিন বন্ধ থাকার পর আজ রাত থেকে সব ধরনের যানবাহন চলবে।’

    সন্ধ্যায় বিবিসি রেডিওতে এই খবর শুনে যারপরনাই খুশি হয় অনিকেত। এসএসসি পরীক্ষা শেষে ঢাকায় বেড়াতে এসেছিল সে। ঢাকায় বেড়ানো শেষে নারায়ণগঞ্জে সপ্তাহ খানেক থেকে মাদারীপুরে, অর্থাৎ, বাড়ি ফিরে যাওয়ার কথা ছিল তার।


    ১৯৯০ সালের এই সময় উপসাগরীয় যুদ্ধ (গালফ ওয়ার) চলছিল। যুদ্ধের প্রভাবে তেলের সরবরাহ হঠাৎ কমে যায়। ফলে তেলের দাম যায় বেড়ে। পরিবহন মালিক সমিতি অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট ডাকে। আর নারায়নগঞ্জে আত্মীয়ের বাসায় একরকম অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে সে।

    যান চলাচলের খবর তাই তার জন্য ভীষণ আনন্দের। আত্মীয়ের মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে জানতে পারে, ঐ রাতেই নারায়ণগঞ্জ থেকে একটি লঞ্চ শরীয়তপুরে ছেড়ে যাবে। এক মুহুর্তও দেরি না করে সিদ্ধান্ত নেয় সে, না আজ রাতেই বাড়ির উদ্দেশে রওনা দেবে সে। বাড়ির জন্য তার মন এতোটাই উতলা যে, এই রাতে একা ভ্রমণের সাহস করেছে। আত্মীয় তাকে লঞ্চে তুলে দেয়। দ্বি-তল লঞ্চের প্রশস্ত বেঞ্চ পাতা একটি কেবিনে অন্য ৮-১০ জন যাত্রীর সঙ্গে কিশোর অনিকেতের বসার ব্যবস্থা হয়। নিচে গণ ডেকে বসতে হয়নি এটা ভেবে খুশি হয় সে।


    শীতলক্ষ্যা নদীর জেটী থেকে লঞ্চ চলতে শুরু করে যথাসময়ে। লঞ্চের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে

    অনিকেত দেখে হেডলাইটের আলো ছাড়া চারপাশের পুরোটাই অন্ধকার। জেটীতে বসে অন্ধকার এতোটা নিকষ বোঝা যায়নি। একবারেই ভূতুরে অন্ধকার যাকে বলে। একটু গা ছমছম বোধ হয় ওর।


    কেবিনের একজন সহযাত্রীর আগ্রহে তার সঙ্গে দু’ একটা কথা হয় তার। একা একটি কিশোর ছেলে রাতে ভ্রমণ করছে এই কারণেই বোধহয় ভদ্রলোক তার ভরসা হবার চেষ্টা করেন । ভদ্রলোক একজন পেশাদার ফুটবলার। টুর্নামেন্ট খেলতে শরীয়তপুর যাচ্ছেন।

    শীতলক্ষ্যার মৃদুমন্দ বাতাসে ছলাৎ ছলাৎ করে চলতে থাকে লঞ্চ। সাইরেনের শব্দ মাঝে মাঝে রাতের নিস্তব্ধতা বিদীর্ণ করছিল। লঞ্চে বসে বাইরে তাকিয়ে থাকতে ভালোবাসে অনিকেত। লঞ্চের সঙ্গে গ্রাম, গাছপালা সব দৌঁড়ায় বলে মনে হয় ওর। কিন্তু অন্ধকারের কারণে বাইরে তাকাতে পারছিল না আজ। তাকালেই মনে হয় যেনো ব্ল্যাকহোলে সেঁধিয়ে যাচ্ছে জলযানটি।

    একসময় দু’চোখ ছাপিয়ে ঘুম আসে। পেছনে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে অনিকেত। স্বপ্ন দেখে পরীক্ষার ফল বেরিয়েছে। মা খুশিতে সবাইকে মিষ্টি বিলি করছেন। ভাঙ্গা স্বপ্নের পরবর্তী অংশে ভাই-বোনকে ঢাকার গল্প বলছে। চিড়িয়াখানার পশুপাখির গল্প। বন্ধুদের কাছে মধুমিতা হলে সিনেমা দেখার গল্প। জাদুঘর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভ্রমণের গল্প ছাড়াও বিভিন্ন চরিত্র স্বপ্নে আসতে শুরু করে।

    যাত্রীবোঝাই লঞ্চ শীতলক্ষ্যা থেকে মেঘনার প্রশস্ত বুকে পরলে ঢেউয়ের ঝাপটা বড় হয়। শীতলক্ষার ঘুমপাড়ানি ছলাৎ ছলাৎ দুলুনির পরিবর্তে লঞ্চ হঠাৎ খ্যামটা নাচন শুরু করে। অনিকেতের ঘুম পাকাপাকি চলে য়ায়। একটু ভয়ভয় করলেও অনেকদিন পর বাড়িতে ফিরছে এই ভেবে আনন্দ হচ্ছিল। আসল ব্যাপার হলো বন্ধুদের বলার মতো অনেক গল্প জমেছে ওর মনে; বলার জন্য তর সইছিল না আর।

    একটু বাদে দমকা হাওয়ায় লঞ্চ কেঁপে উঠলো। ঝড় উঠেছে। প্রমত্ত বাতাসের বিপরীতে লঞ্চ চলতে পারছি না। লঞ্চের অগ্রগতি থেমে গেল। অনিকেত ভয় পাচ্ছিল। এত বড় নদী, তায় বাইরে কিছু দেখা যায়না। ওর মনের অবস্থা বুঝে ফুটবলার ভদ্রলোক বলল ভয় পেওনা। এক কাজ করো তোমার কাছে শর্টস আছে? এই কথায় মুখ শুকিয়ে গেল কিশোরের। যাহোক তার কথামতো শার্ট-প্যান্ট খুলে শর্টস টি-শার্ট পরে নিল ও। অন্যরা যার যার মত প্রস্তুতি নিল। দুর্ঘটনায় জীবন বাঁচানোর শেষ চেষ্টা! ভয়ে ওর হাত-পা হিম হয়ে গেছে। অনিকেত জানে এসব করে কোন লাভ নেই। বর্ষায় সাগর সম উত্তাল মেঘনার জলে বেঁচে থাকা দূরাশা মাত্র।

    হঠাৎ তার একটু আগে দেখা স্বপ্নের কথা মনে পড়ল। মায়ের মুখ, ভাই-বোন, বাবার মুখ। আরো একজনের মুখ বুকের ভেতর ঢেউয়ের মতোই আছড়ে পরছিল। যার কথা কেউ জানে না। যার চোখ এই মেঘনার মতোই কালো আর গভীর। তবে এতটা রুদ্র অবশ্যই নয় বরং নাটোরের বনলতা সেনের মতো ‘পাখির বাসার মতো’ আশ্রয়ের চোখ।

    ঝড়ের উন্মত্ত তাণ্ডবে জলযানটি একবার পাহাড় প্রমাণ ঢেউয়ের চূড়ায় উৎক্ষিপ্ত হচ্ছিল আবার গভীর খাদে নিপতিত হচ্ছিল। প্রতিবারই মনে হচ্ছিল এইবারই রাক্ষুসী মেঘনা গোটা লঞ্চসহ এর যাত্রীদের ওর ক্ষুধার্ত পেটের ভেতর নিয়ে নেবে। নর-নারীর আর্তচিৎকার, আজান আর প্রাণভিক্ষার আহাজারিতে এক বিভীষিকা তখন লঞ্চের ভিতর। এরমধ্যে ঢেউয়ের ঝাপটায় বারকয়েক লঞ্চের নিচতলায় পানি ঢুকে পরেছে। বাতাসের তোড়ে কেবিনের দরজা-জানালা আটকে রাখা যাচ্ছিল না। মৃত্যু অবধারিত অনিকেত মোটামুটি নিশ্চিত হয়। নিকটজনের মুখগুলো ঢেউয়ের মতো মানসপটে আছড়ে পরতে থাকে। আর বুঝি কারো সঙ্গে দেখা হবে না!

    এরমধ্যেই খবর আসে লঞ্চের ইঞ্জিন বিকল হয়ে গেছে, আর চালু হবে না। কেননা এমন একটি পার্টস ভেঙ্গে গেছে যা মেরামত করা সম্ভব নয়। এই খবরে সবাই হা হা করে উঠলেন। অন্যদের মুখাবয়ব ও কথায় অনিকেত বুঝল বাঁচার আর কোন আশাই নেই। লঞ্চ এবার ঢেউ, বাতাস আর স্রোতের করায়ত্ত্বে। এর কোন নিয়ন্ত্রণ চালকের হাতে নেই আর। অবস্থা আক্ষরিক অর্থেই ‘বোট উইদাউট এ রাডার! অন্যদের মুখে শুনে বুঝা গেল এই অবস্থায় যেকোনো নৌ-পরিবহন বেশি নাজুক। ঝড়ের খেয়ালে এভাবে চলল আরো অনেকক্ষণ।

    যাত্রীবাহী যানটি নিয়ে মেঘনার পুতুল নাচ একসময় থামে। বাইরে তাকিয়ে অনিকেত যা দেখলো তাতে তার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল। জলদানব! লন্ঠনের মতো দেখতে একাধিক বস্তু একবার উপরে ভেসে উঠছে আবার পানিতে ডুবে যাচ্ছে। অন্যরাও দেখল কিন্তু কেউই বলতে পারল না এটা কী? সে ধরে নিল এটা জলদানব। যখন তখন ডুবিয়ে দেবে লঞ্চ! জলদানবের অনেক গল্প সে বইয়ে পড়েছে। এই ভয় মনে নিয়ে কাটল অনেকক্ষণ। ঘোর অন্ধকার তখনো। লঞ্চ চলছে একইভাবে স্রোতের খেয়ালে।

    এমন সময় মুক্তির দূত হয়ে উল্টো দিক থেকে আসে একটি লঞ্চ। সবাই সাহায্যের জন্য চিৎকার করতে শুরু করলো। চলে যেতে যেতে কী ভেবে গতি কমিয়ে কাছে এলো। মোটা রশিদিয়ে বেঁধে নিটবর্তী চরে ভেড়াতে সহায়তা করলো। চাঁদপুরের অদূরে যে চরে লঞ্চটিকে ভিড়িয়ে দেওয়া হলো তার নাম ষাটনল। নাম শুনে অনেকেই আঁতকে উঠলেন। ডাকাতের ঘাঁটি হিসেবে বিশেষ বদনাম আছে এই চরের। রাতে লঞ্চ চলাচলের পথে এই জায়গার বিষয়ে সবাই বাড়তি সতর্কতা নেয়। এই সব আলোচনার মধ্যেই হঠাৎ নিচে ‘ডাকাত, ডাকাত’ চিৎকার। লঞ্চের নিরাপত্তায় নিয়োজিত আনসারের রাইফেল নিয়ে গেছে ডাকাতরা। দু’জন যাত্রীকে ছুরি মেরেছে। আতঙ্কিত নর-নারীর ভয়ার্ত চিৎকার। যাত্রীদের সর্বস্ব ছিনিয়ে নিচ্ছে। একটু পরে খবর এলো সাহসী তরুণ যাত্রীরা একজন ডাকাতকে পাকড়াও করেছে। প্রহার করছে। বেকায়দা দেখে অন্য ডাকাত নদীতে ঝপাৎ ঝপাৎ লাফিয়ে পরছে।

    কেবিনের ভেতরের এরপরের জল্পনা-কল্পনা আরো ভয়ঙ্কর। ডাকাতরা এবার দ্বিগুণ শক্তি নিয়ে ফিরে আসবে ওদের লোককে উদ্ধার করতে। এবার সবাইকে মেরে ফেলবে। আবারও ভয়ে কুঞ্চিত হয়ে গেল অনিকেত। খেলোয়ার ভদ্রলোক সাহস দিয়ে বললেন, ‘তোমার টাকা-পয়সা হাতে রাখো। আর দামি কিছু থাকলে জুতোর ভেতর লুকিয়ে ফেল। ওরা কিছু নিতে গেলে বাধা দিও না। বাধা দিলে আঘাত করবে। কী দরকার শুধু শুধু জীবনের ঝুঁকি নেওয়ার।’

    ভয়ের মধ্যে কাটতে লাগলো প্রতিটি মুহুর্ত। এক একটি মিনিট যেনো এক একটি নির্ভেজাল ঘন্টা! প্রাণ শুকানো ভয়ের পাথর সময় কাটিয়ে কখন ভোরের আলো ফুটবে?

    এবারের ভয় সত্য হলো না। ডাকাতরা ফিরে এলো না। যেটি ধরা পরেছে তার আবস্থা সঙ্গিন। যখন তখন অবস্থা। এতো অপরাধের পরও কেন যেন ডাকাতটির জন্য মায়া হতে লাগল অনিকেতের। মনে মনে চাইল ও যেন মরে না যায়। অথবা ওকে যেনো আর মারা না হয়।

    ধীরে ধীরে পূব আকাশ আলোকিত হতে শুরু করল। এমন সময় একটি মাছ ধরার ইঞ্জিন নৌকো পাশ দিয়ে যেতে দেখে লঞ্চ থেকে সংকেত দেওয়া হয়। এমন জায়গায় লঞ্চ দেখে ট্রলারের লোকজন ভাবলো কিছু একটা সমস্যা নিশ্চয় হয়েছে। নিকটবর্তী ট্রলারটি। সব শুনে যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছে দিতেও রাজী হয়।

    রাতভর উপর্যুপরি বিপদ আর মৃত্যুশঙ্কা কাটিয়ে সবাই ট্রলারে উঠে বসে। ভটভট শব্দে গন্তব্যের দিকে ছুটতে শুরু করে ট্রলার।

    ভোরের উদীয়মান আলোর সাথে সাথে প্রিয় মুখগুলো মনের আয়নায় ভেসে ওঠে অনিকেতের। আবার সবার সঙ্গে দেখা হবে এই ভেবে আনন্দাশ্রু বইতে শুরু করে ওর।

    *******

    পলাশ মণ্ডল

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫
    ১৬১৭১৮১৯২০২১২২
    ২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
    ৩০৩১