• শিরোনাম

    যে ‘নক্ষত্রের’ পতন নেই

    | ১৬ নভেম্বর ২০২১


    যে ‘নক্ষত্রের’ পতন নেই

    হাসান আজিজুল হক

    মৃত্যুর মত অমোঘ সত্যকে অস্বীকার করে, কার সাধ্য! তবু, সাধের কী আর শেষ আছে? তাই বুঝি ‘আগুনপাখি’র স্রষ্টাকে পার্থিব জগতেই সীমাবদ্ধ করতে চেয়েছিলেন ভক্ত অনুরাগীরা।

    বলছি, বাংলা সাহিত্যের উজ্জল নক্ষত্র হাসান আজিজুল হকের কথা। যার প্রয়াণে শোকাতুর সাহিত্য অঙ্গণ তথা পুরো জাতি।


    ব্যক্তিজীবনে বরাবরই শান্তশিষ্ট এবং সন্তুষ্ট প্রকৃতির মানুষ ছিলেন হাসান আজিজুল হক। ভালো থাকতেই ভালোবাসতেন, তাই মানুষের সামনে কখনও দু:খবিলাস করতেন না। এক সাক্ষাৎকারে নিজেই বলেছিলেন তার এই বৈশিষ্টের কথা।
    এমন বোধের প্রকাশ ঘটেছে লেখকের লেখনিতেও। কারণ যত কষ্টের গল্পই লেখেন না কেনো, তার গল্পের চরিত্র গুলো ছিল নিরশ্রু।

    লেখকের ভাষ্য ছিল, “জীবনের মূল চেহারাটা আমি দেখি বলেই নিস্পৃহ থাকি।“ কিন্তু এই নিস্পৃহতাও যে কত বড় প্রতিবাদ তা বলার অপেক্ষা রাখে না।


    হাসান আজিজুল হকের লেখার হাতেখড়ি কৈশর থেকেই। তবে রাজশাহী কলেজে পড়ার সময় ‘চারপাতা’য় তার লেখা প্রথম ছাপা হয়, যার বিষয় ছিল রাজশাহীর আমের মাহাত্ম্য।

    এর পর ১৯৬০ সালে সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত সমকাল পত্রিকায় ‘শকুন’ শীর্ষক গল্প প্রকাশের মধ্য দিয়ে সাহিত্যাঙ্গনে সবার নজরে পড়েন তিনি। পরের গল্পটা তো সবারই জানা।


    হাসান আজিজুল হকের উল্লেখযোগ্য লিখনের মধ্যে রয়েছে ‘আগুন পাখি’, ‘সমুদ্রের স্বপ্ন শীতের অরণ্য’, ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’, ‘নামহীন গোত্রহীন’ প্রভৃতি গল্পগ্রন্থ। রয়েছে ‘কথাসাহিত্যের কথকতা’, ‘অতলের পাখি’র মতো প্রবন্ধ গ্রন্থও।

    লেখকজীবনে বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি, যার মধ্যে বাংলা অ্যাকাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, একুশে পদক উল্লেখযোগ্য।

    লেখার ক্ষেত্রে প্রতিটি বাক্য ও শব্দ প্রয়োগে অত্যন্ত সতর্ক ও অনুসন্ধিৎসু ছিলেন হাসান আজিজুল। যে কারণে পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় নিরবচ্ছিন্নভাবে লেখক জীবন পার করলেও মাত্র সত্তরটির মতো গল্প ও দুটি প্রকৃত উপন্যাস এবং দুটি ছোট উপন্যাস লিখেছেন।

    অনেকে হয়তো এক বছরেই সমপরিমাণ লিখে ফেরতে পারেন। কিন্তু তাতে কী আর সাহিত্যিকের আত্মা তৃপ্ত হয়?
    হাসান আজিজুল হকের মতে, প্রতিটি লেখাই তার কাছে সংগ্রামের। প্রতিবারই একজন তরুণের মতো সাহস নিয়ে লিখতে বসেন তিনি, যার একটি লক্ষ্য থাকে, যা পূরণ হলেই কেবল একটি স্বার্থক লেখার জন্ম হয়।

    লেখার চেয়ে ভাবতেন বেশি, নিজেকে দাবি করতেন ‘সার্বক্ষণিক এবং ক্লান্তিহীন লেখক’ হিসেবে। কারণ তার জীবন যাপনের পুরোটাই ছিল লেখা কেন্দ্রিক।

    গুণী এই সাহিত্যিকের লেখার বিষয়বস্তু বরাবরই তার বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা এবং চলমান সমাজ ব্যবস্থা।

    বেঁচে থাকার রসদ সরবরাহ করে যে সমাজ, সে সমাজের একজন ভোক্তা হিসেবে লেখকেরও কিছু ঋণ থাকে। লেখার মধ্য দিয়ে সেই ঋণ শোধ দেওয়ারই একটি দায়বোধ কাজ করেছে তার মাঝে।

    শেষ জীবনে অবশ্য তিনি মনে করতেন, মানুষের প্রকৃত জীবনযাপন হারিয়ে গেছে। নিজের বেঁচে থাকা নিজের ইচ্ছার ওপরে আর নেই, একটা ছকে ফেলে দেওয়া হয়েছে। টেলিভিশন, ইন্টারনেট মানুষকে চিন্তাবর্জিত শরীরসর্বস্ব এক বিশেষ প্রাণীতে রূপান্তর করে ফেলছে। যার কারণে মানুষ আর চাইলেও স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারে না।

    এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে সাহিত্য করতেই নাকি নিজের উপরে ধিক্কার হতো তার। কারণ কখনই পাঠকের কাছে শুধু আমোদ বিক্রির লেখক ছিলেন না হাসান আজিজুল হক।

    আলোচিত উপন্যাস ‘আগুনপাখি’ লেখার সময় হাসান আজিজুল হক পেরিয়ে এসেছেন জীবনের সাতষট্টিটি বসন্ত।
    পন্যাসটি বর্ণিত হয়েছে উত্তম পুরুষে। উপন্যাসের কথক নারী, বাড়ির কর্তা, কর্ত্রী ও অন্যান্য সদস্যের কেউ হাসান আজিজুল হকের জীবনবৃত্তের বাইরের নন।

    মূলত, মানবভাগ্যের চরম বিপর্যয়ের ইতিহাস লিখতে গিয়ে লেখক নিজের অস্তিত্বের শিকড়ের দিকেই তাকিয়েছেন।

    ১৯৩৯ সালে ভারতের বর্ধমান জেলার যব গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন হাসান আজিজুল হক। পরে দেশ বিভাগের পর চলে আসেন এপার বাংলায়। বাংলার খুব কম কথাসাহিত্যিকই আছেন তার মতো দেশত্যাগের প্রত্যক্ষ ক্ষতির শিকার হয়েছিলেন। এই কারণেই বোধয় তার লেখার অনেকাটাজুড়ে স্থান পেয়েছিল এই বিষয়টি।

    তার পিতা-মাতার মাঝে দেশত্যাগের যে মর্মান্তিক যন্ত্রণা ও রক্তক্ষরণ দেখেছেন, সেই যাতনার ইতিহাসই মূলত উঠেছে ‘আগুনপাখি’তে। উপন্যাসের মূল চরিত্র বৃদ্ধ নারীকে দিয়ে লেখক তার মায়ের রূপটিই এঁকেছিলেন।

    অর্ধ-শতাব্দীর বেশি সময় ধরে বাঙালির জাতীয় জীবনে ঘটে যাওয়া সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সকল পরিবর্তনই কোনও না কোনও সময় হয়ে উঠেছে হাসান আজিজুল হকের কথাসাহিত্যের বিষয়বস্তু।

    মা-মাটি ও শেকড়ের টানে পূর্ব পুরুষদের পথেই হেঁটেছেন হাসান আজিজুল হক। সে কারণেই জীবনের শেষ সময় পর্যন্তও রাজধানীকেন্দ্রিক জীবন যাপন করেননি তিনি।

    রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকা ‘বিহাস’ এর নিরিবিলি বাসাতেই স্বাচ্ছন্দ্য ছিলেন তিনি।
    দোতলার পুরোটাজুড়ে শুধু বই আর বই, সামনে খোলা ছাদ, চারিদিকে পাখির ডাক এই পরিবেশেই কাগজ কলম নিয়ে লেখার টেবিলে বসতেন। আর বিকেল হলে বাড়ির সামনে একটু হাঁটাহাটি, এভাবেই কেটে যেত লেখকের একেকটি দিন।

    ১৫ নভেম্বর জীবনাবসন হয় ৮৩ বছরের জীবন্ত এই ইতিহাসের।

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২
    ১৩১৪১৫১৬১৭১৮১৯
    ২০২১২২২৩২৪২৫২৬
    ২৭২৮২৯৩০