• শিরোনাম

    ভ্রমণ

    সীতাকুণ্ড ভ্রমণের ইতিবৃত্ত ।সাফায়েত জামিল নওশান

    | ২৮ আগস্ট ২০২০


    সীতাকুণ্ড ভ্রমণের ইতিবৃত্ত ।সাফায়েত জামিল নওশান

    বিকেলের আড্ডায় কথা বলতে বলতে একদিন আবির বললো ‘কোথাও ঘুরে আসা দরকার, প্রায় সব পর্যটন স্পট ই তো খোলা’ ৷ আমি , মাহিন, আতাউল্লাহ একজন আরেকজনের দিকে তাকাচ্ছি, সবার মনেই প্রায় একই ভাবনা ৷

    আবির থাকে খুলনায় , আমি আর আতাউল্লাহ চট্টগ্রাম , মাহিন ঢাকায়৷ একসাথে সময় মিলিয়ে অদূর ভবিষ্যতে কখনো ঘুরতে যেতে পারবো এমন সম্ভাবনা দেখিনা । কথায় কথায় ঠিক হয়ে গেল চট্টগ্রামে ঘুরে আসবো , সবারই পকেটের অবস্থা সঙ্গীন তাই বাজেটের ব্যাপারটাও এসে যায় । প্রত্যেকে মাত্র ২ হাজার টাকা সম্বল নিয়ে পরদিন ২৪ তারিখের চট্টগ্রামগামী মহানগর এক্সপ্রেস ট্রেনের টিকিট কেটে বসলাম ।

    আমাদের টিকিট ১০ টা , এবার ১০ জন সংগ্রহের পালা । প্ল্যান শুনে প্রথমেই তুষার বললো ‘আমি আছি’ , উল্লেখ্য আমরা সবাই একই স্কুলের ছাত্র ছিলাম ৷ ৫ জন হয়ে যাবার পর এক এক করে বাপ্পি ভাই, তাফহিম , সাব্বির , রাকিব কনফার্ম করে ফেললো , যাবেনা যাবেনা করতে করতে একেবারে শেষদিন পলাশও যোগ দিলো ।


    ১০ জনের বাহিনি নিয়ে আমরা যখন রাত ১২ টায় ট্রেনে চড়ে বসলাম আশেপাশের মানুষেরা অদ্ভুত দৃষ্টিতে আমদের দিকে তাকাচ্ছিলো কারণ আমাদের সবার পরনে হাফ প্যান্ট আর টি.শার্ট পায়ে স্যান্ডেল, কাধে বিশাল ব্যাগ৷ সারা রাত ট্রেনে গান গাইতে গাইতে সকালে যখন চোখটা বুজে আসবে তখনই ট্রেনের স্পিকারে ঘোষণা আসলো ‘অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে ট্রেনটি চট্টগ্রাম স্টেশনে প্রবেশ করবে ‘ । ঢুলুঢুলু চোখে আমরা ট্রেন থেকে নেমে নাস্তা সেরে নিলাম । লেগুনায় করে অলংকার মোড় গিয়ে সেখান থেকে বাসে নয়দুয়ারী বাজার ৷ নয়দুয়ারি বাজার থেকেই আমাদের যাত্রা শুরু হলো নাপিত্তাছড়া ট্রেইলের দিকে ৷ আমাদের অনেকেই এবারই জীবনে প্রথম ঝর্না দেখবে , সবার মনেই একটা অজানা উত্তেজনা, চোখেমুখে আসন্ন এডভেঞ্চারের প্রতীক্ষার ছাপ । নয়দুয়ারি বাজার থেকে ট্রেকিং এর জন্য বাঁশের লাঠি নিয়ে গ্রাম্য পথ ধরে হেঁটে ঝিরিপথের সামনে হাজির হলাম । আমাদের পা ছুঁয়ে নাপিত্তাছড়ার শীতল পানি বয়ে যাচ্ছে , সামনে আকাশ সমান ঘন পাহাড় রাজার হালে দাড়িয়ে ৷ পাহাড়ের রাজ্যে নিজেদেরকে বড় দূর্বল বড় দ্বীন মনে হলো । প্রজার হালে আমরা ঝিরিপথ ধরে হাঁটতে শুরু করলাম, প্রতি কদমের আগে হাতের লাঠি দিয়ে ঠুকে ঠুকে দেখতে হয় সামনের রাস্তা গভীর কীনা , সাথে আছে জোঁকের ভয় । একটু পরপরই সবাই নিজেদের হাত পা চেক করছিলো জোঁক আছে কি-না দেখতে ।

    ঝিরিপথ ধরে এগিয়ে সামনের পাহাড় ডিঙিয়ে আমরা জঙ্গলের পেটর ভেতর প্রবেশ করলাম । চারদিকে পাখির কিচিরমিচির আর ঝিরিপথের একটানা ঝিরঝির শব্দ শুনতে শুনতে আমরা প্রকৃতির জৌলুশ দেখতে লাগলাম ঘাড় ঘুরিয়ে । যতই ভেতরে যাচ্ছি পরিবেশ ততই শান্ত , গম্ভীর আর ছমছমে , যেন প্রকৃতি তার নিরব ভাষায় বুঝিয়ে দিতে চাচ্ছে এখানে মানুষের রাজত্ব এখনো শুরু হয়নি , এখনো প্রকৃতি যা চায় এখানে তাই হয় । হাজার বছরে পলি জমে জমে মাটি শক্ত হয়ে কোথাও পাথরের মতো শক্ত আস্তরণ সৃষ্টি করেছে এর উপর দিয়েই পানি বয়ে চলেছে , কোথাও বা প্রাচীন বৃক্ষের ফসিলের মতো প্রকাণ্ড পাথর কোথাও আবার শুধু নুড়ির রাস্তা ৷ সারাক্ষণ ই পানি তে পা ভিজে থাকার কারণে যাত্রাপথে খুব একটা ক্লান্তি ভর করলো না । নাপিত্তাছড়া ট্রেইল অন্য যেকোন ট্রেইল থেকে যথেষ্ট নিরাপদ , ঝিরি খুব গভীর নয় , পানির নিচের রাস্তাও মসৃণ পাথরের ৷ আমরা একটু দূর এগিয়ে গিয়েই ছবি তোল্য ব্যস্ত হয়ে পড়ছিলাম । বাপ্পি ভাই ট্যুর শুরুর আগেই ঘোষণা দিয়েছেন তিনি এই ট্যুরের অফিসিয়াল ফটোগ্রাফার, সকল ধরণের ছবি তোলার দায়িত্ব উনার । ফলাফল হলো পরবর্তী দুইদিন আমদের সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত বাক্য ‘বাপ্পি ভাই এইখানে একটা ছবি তুইলা দ্যান’৷ আর বাপ্পি ভাই ও প্রবল উৎসাহ আর ধৈর্য নিয়ে আমাদের সকল উদ্ভট পোজ এর ছবি তুলে দিয়েছেন৷ ঝিরিপথ দেখতে যতটা সুন্দর ছবিতে আমরাতার বিন্দু পরিমাণও তুলে আনতে পারছিলাম না তাই একটা আফসোস রয়েই গেলো । যাইহোক এভাবে থেমে থেমে হেঁটে হেঁটে আমরা প্রথমে ছোট একটা ক্যাসকেডের সামনে পড়লাম , ভাবলাম এটাই ঝর্না৷ এটা দেখেই আমাদের চক্ষু ছানাবড়া , ঘ্যাচাং ঘ্যাচ কিছু ছবি উঠানোর পর সাথে আসা গাইড বললো ‘এইতো সবে শুরু’ । আমাদের উত্তেজনা দ্বিগুণ হয়ে গেল , ক্যাসকেড এর পাশের রাস্তা দিয়ে হেটে উপরে উঠতেই সামনে কুপিকাটাকুম ঝর্না , এটা পাথরের একটু আড়ালে, খুব ভাল করে দেখা যায়না । কুপিকাটাকুম পেছনে ফেলে হাঁটতে হাঁটতে একটা মৃদু শব্দ শুনতে পেলাম, শব্দটা নিঃসন্দেহে আরেকটা ঝর্নার৷ যতই এগিয়ে যাচ্ছি শব্দ ততই প্রবল হচ্ছে ।


    একসময় আমরা পৌছে গেলাম রহস্যময় বাঘবিয়ানি ঝর্নার সামনে ৷ আমাদের অনেকের নিঃশ্বাস কিছুক্ষণের জন্য থমকে গেলো , সামনে বিশাল পাহাড়ের উপর থেকে পানির এক বিশাল স্রোত নেমে আসছে একদম সোজা নিচের দিকে , পাথরের উপর পানি পড়ে সেখান থেকে সেখান থেকে সৃষ্টি হচ্ছে ঠাণ্ডা জলীয়বাষ্প । আমি সেখানেই বসে পড়লাম, আর বাকিরা পানিতে নেমে বিভিন্ন পোজে ছবি তোলায় ব্যস্ত হয়ে গেল৷ কিছুক্ষণ ছবি তোলার পর এক এক করে সবাই ঝর্নার দিকে মুখ করে বসে পড়লো , এই রূপ তো আর প্রতিদিন দেখা যায়না তাই আমরা যতটা পারি চোখ দিয়ে গিলে নিচ্ছিলাম বাঘবিয়ানি ঝর্নাকে৷ আমাদের সবার হাতে নাটি বিস্কুট, আমরা ঝর্নার পানিতে বিস্কুট ভিজিয়ে খাচ্ছি আর অপলক দৃষ্টিতে ঝর্না দেখছি, এ এক অদ্ভুত দৃশ্য ৷ বাঘবিয়ানী ছেড়ে যেতে ইচ্ছা না থাকা

    সত্বেও আমরা উঠে রওয়ানা হলাম বান্দরাকুমের উদ্দেশ্যে , আমরা বুঝতে পারছিলাম না এরচেয়ে সুন্দর ঝর্না কীভাবে হতে পারে ৷


    ঝিরিপথ ধরে আবার হেঁটে হেঁটে বান্দরকুম যা দেখলাম তা আসলে বই এর তথাকথিত ‘নির্বাক হয়ে গেলাম, চোখদুটো বের হয়ে আসতে চাইলো’ এইসব বাক্যে প্রকাশ করা যাবেনা ৷ এক কথায় ‘আমরা বান্দরাকুম দেখে ভেঙে চুরমার হয়ে গেলাম’৷ আতাউল্লাহ আর মাহিন পাগলের মতো বাপ্পি ভাইকে ডাকতে শুরু করলো একটা ছবি তুলে দেয়ার জন্য , তুষার তাফহিম ওদিকে নিজেদের মোবাইল দিয়ে বান্দরাকুমকে ফ্রেমবন্দি করায় ব্যস্ত, পলাশ আর আমি এদিকে তখনো হা করে চেয়ে আছি ৷ প্রেমিক পুরুষের মত আমরা প্রেয়সীর চেয়ে রূপবতী বান্দরাকুমের রূপ কখনো চোখ খুলে কখনো চোখ বন্ধ করে উপভোগ করার চেষ্টা করছিলাম । সবার সাথে ছবি তোলায় যোগ দিতে পানিতে নেমে শরীরটা জুড়িয়ে গেল , মনে হলো সারাটাদিন এখানেই পরে থাকি, কিন্তু সময় যে নেই৷ বান্দরাকুম ছেড়ে আমরা যখন ফিরতে শুরু করি তখন দুপুর প্রায় ১.৩০ । নয়দুয়ারি বাজারে সবাই হালকা নাস্তা খেয়ে খৈয়াছড়ার দিকে রওয়ানা হলাম ।

    কারো মুখে কোন কথা নেই , চোখে যা দেখে এসেছি সবাই এখনো সেই ঘোর থেকে বের হতে পারেনি৷ লেগুনা থেকে নেমে খৈয়াছড়া যাওয়ার রাস্তায় হেঁটে যাওয়ার সময় একটা দোকান থেকে আমাদের বারবার ডাকতে শুরু করলো খাবারটা যেন উনার এখান থেকে খাই , যদিও আমাদের প্ল্যান ছিকো সীতাকুণ্ড বাজারেই খাওয়াদাওয়া হবে তবুও আমরা আবিরের জোড়াজুড়ি আর হোটেলওয়ালার ডাকাডাকিতে সেখানেই খাবার অর্ডার করে গেলাম ৷ খৈয়াছড়ার রাস্তা নাপিত্তাছড়ার মত অতটা সহজ না । পাহাড়ি রাস্তা ধরে বাড়িঘর পেরিয়ে অনেকটা দূরে খৈয়াছড়ার মূল রাস্তার শুরু , এখানে আমরাই প্রথম না, সকাল থেকে প্রচুর পর্যটকের চলাচল আর বৃষ্টির কারণে পুরো রাস্তাই কাঁদা দিয়ে ভরা ৷ কোথাও কোথাও পা হাঁটু পর্যন্ত দেবে যাচ্ছিলো , যেকোন সময় পিছলে পড়ে অঘটনের প্রবল সম্ভাবনা ৷ কোথাও রাস্তা প্রচণ্ড পিচ্ছিল আর খারা , কীভাবে উঠবো তা কেউ জানেনা, সবাই যার যার মতো রাস্তা বানিয়ে নিয়ে উপরে উঠার চেষ্টা করছিলো । কিছুক্ষণ হাঁটার পর পর অল্প ঝিরিপথের দেখা মিলে , সেখানেই আমরা শরীর ভিজিয়ে একটু করে জিরিয়ে নিচ্ছিলাম । এভাবে অনেকটা কষ্টকর পথ পাড়ি দিয়ে আমরা পৌছুলাম খৈয়াছড়া ঝর্নায়৷ খৈয়াছড়া ঝর্না অনেকটা প্রশ্বস্ত আর একটু আগে বৃষ্টির কারণে পানির স্রোত ছিল প্রচণ্ড । এবার আর ঝর্নার বর্ণনা দিচ্ছিনা , পাঠক কল্পনা করে নিন আমাদের মনের অবস্থা ৷

    এতটা কষ্টের পথ হাঁটার পর এই ঝর্না শরীরের সব ক্লান্তি দূর করে দিলো ৷ ঘড়ির কাঁটা তখন ৪ টা ছুঁইছুঁই করলেও আশেপাশের পরিবেশ প্রায় সন্ধ্যের মতো , এবার বুঝলাম কেন বলা হয় জঙ্গলে সন্ধ্যে হয় তাড়তাড়ি । খৈয়াছড়ার অনেকগুলো স্টেপ আছে উপরের দিকে , পাহাড় বেয়ে বিপজ্জনক অবস্থা দড়ি ধরে ধরে উপরে উঠতে হয় , আমরা কেউ আর উপরে উঠার সাহস করলামনা৷ বৃষ্টির কারণে এমনিতেই রাস্তা পিচ্ছিল , সাথে আবার সন্ধ্যেও হয়ে আসলো বলে তাই কিছুক্ষণ খৈয়াছড়ায় কাটিয়ে আমরা আবার ফিরতি পথ ধরলাম । ফেরার সময় আশেপাশে অন্য কোন গ্রুপ না দেখে বুঝলাম আমরাই আজকের শেষ গ্রুপ ।

    চারপাশে ঝাপসা অন্ধকার, সামনে অনেকটা বিপজ্জনক রাস্তা , মনে একটা অজানা আশঙ্কা নিয়ে আমরা দ্রুত চলতে শুরু করলাম । ফেরার রাস্তা টা আরো বেশি ভয়ানক হলো, পিচ্ছিল রাস্তায় উপর থেকে নিচে নামার সময় কয়েকবার শুধু আল্লাহর নাম নিয়ে মাটিতে বসে পড়েছি , বাকি কাজ কাঁদা করে দিয়েছে । এভাবে কখনো হেঁটে কখনো বসে শরীরে প্রচণ্ড ক্লান্তি নিয়ে আমরা খৈয়াছড়ার দীর্ঘ পথ শেষ করলাম ৷ পাহাড়ের রাস্তা শেষ হলেও গ্রামের রাস্তা টা শেষ হতে চাইছিলোনা , খালিপায়ে নুড়ির উপর দিয়ে সারাদিন হাটার কারণে প্রতি কদমে পায়ের তলা ব্যাথার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌছে যাচ্ছিলো । এভাবে হাঁটতে হাঁটতে আমরা একসময় আমাদের খাবার অর্ডার করে যাওয়া দোকানটায় আসলাম, এখানেই আমাদের ব্যাগ জুতা রেখে গিয়েছিলাম ।

    হাতমুখ ধুয়ে যখন খেতে বসি তখন পেটে রাক্ষসের ক্ষিদে । খাবার আইটেম ছিল ডিম, আলুভর্তা, মুরগি আর ডাল । মনে হলো ফাইভ স্টার কোন হোটেলে বসে খাচ্ছি , দোকানদার চাচা আর ছেলে প্রায় বিয়ে বাড়ির মতো আমাদের প্লেটে খবার তুলে দিচ্ছিলো । আবির একা চার প্লেট ভাত খেয়ে যখন তৃপ্তির ঢেকুর তুলে তখনো বাকিদের খাওয়া চলছে৷ রাকিব, সাব্বিরের মতো ঘরকুনো ছেলেও তিন প্লেট ভাত সাবাড় করে দিলো শুধু মুরগির ঝোল আর ডাল দিয়ে । খাওয়া শেষে সবাই নিজেদের পেট নিয়ে যখন নড়েচড়ে বসার চেষ্টা করছি তখন দোকানদার চাচা নিয়ে আসলেন আগুন গরম চা । আমরা সামনের ধানক্ষেত আর তারপর উচুনিচু পাহাড় দেখতে দেখতে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে ভাবছিলাম , আহা জীবনটা কতই না সুখের৷

    প্রথমদিনের মতো আমাদের ভ্রমণ শেষ হলো । রাতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গেলাম থাকার জন্য , সেখানে আমি আতাউল্লাহ আর পলাশের বাসা ৷ সেই যে লকডাউনের শুরুর সময় বাসা ছেড়ে এসেছিলাম তার ৫ মাস পর আমরা আবার ক্যাম্পাসে ফিরলাম , সেই পরিচিত জিরো পয়েন্ট , সেই পরিচিত পথ । বিকেলে এত খাবার পর রাতে আর কারো কিছু খাওয়ার ইচ্ছে ছিলনা, বাসায় ঢুকেই যে যেখানে জায়গা পেলো সেখানেই শুয়ে পড়লো ।

    পরদিন সকাল ৫ টায় আবার আমরা সিএনজি নিয়ে রওয়ানা হলাম সীতাকুণ্ডের দিকে । সকালে পলাশ “আমার পক্ষে আর এক কদম যাওয়া ও সম্ভব না” বলতে বলতে যখন দেখে সবাই ওকে ফেলে চলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত তখন তড়িঘড়ি করে রেডি হয়ে আবার দলে যোগ দিলো । এবারের গন্তব্য কমলদহ ট্রেইল । সীতাকুণ্ড থেকে লেগুনায় করে প্রথমে গেলাম বড়দারগার হাট, সেখান থেকে হেটে কমলদহের দিকে যাত্রা শুরু৷ রাস্তায় একজন গাইডের সাথে কথা হলো, কিছু টাকার বিনিময়ে উনি সবটা ঘুরিয়ে দেখানোর দায়িত্ব নিলেন । কমলদহ ট্রেইল অনেকটাই সহজ রাস্তা, অনেকটা নাপিত্তাছড়ার মতো । পুরো পথটাই ঝিরি ধরে এগোতে হয়ে, বেশিরভাগ জায়গায় ঝিরির পানির নিচে মসৃণ পাথর । মৃদুমন্দ বাতাস গায়ে লাগিয়ে আমরা খুব স্বচ্ছন্দেই হেঁটে চললাম, শুরুর দিকে সবার পায়ে ব্যাথা করলেও আস্তে আস্তে সবাই অভ্যস্ত হয়ে গেল । ঝিরিপথ ধরে হাটার মজা অন্যরকম, না হাঁটলে এটা লিখে বুঝানো সম্ভব না ৷

    হেঁটে হেঁটে আমরা প্রথমে গেলাম ছাগলকান্দা ঝর্নায়৷ ছাগলকান্দা অনেকটা খৈয়াছড়ার মতোই, যদিও খৈয়াছড়ায় ছাগলকান্দার চেয়ে পানি কম । ছাগলকান্দায় এসে আতাউল্লাহ, তুষার আর তাফহিম ঝর্নার নিচের পাথরে বসে দেড় হাজার ছবি তুলে ফেললো বিভিন্ন পোজে ৷ এদিকে গাইড তাড়া দিচ্ছে রূপসীর দিকে রওয়ানা দেওয়ার জন্য , কে শোনে কার কথা । আরো কিছুক্ষণ ছাগলকান্দায় দাপাদাপি করে ভেজা শরীরে রূপসীর দিকে যাত্রা শুরু করলাম । এবার গাইড শর্টকাটে পৌছানোর জন্য সরসরি ঝর্নার উপরে নিয়ে আসলো ৷ এই পথ ব্যবহার না হওয়ার কারণে শ্যাওলা জমে যথেষ্ট পিচ্ছিল হয়ে আছে , খুব সাবধানে পা না ফেললে পড়ে গিয়ে একদম থেঁতলে যাওয়ার মত বিপদ ঘটিতে পারে । আমরা ভয়ে ভয়ে একট ছোট ক্যাসকেড থেকে নেমে আসলাম , ক্যাসকেড থেকে নেমেই রুপসী, আমরা তখন সরাসরি রূপসীর মাথায় দাড়িয়ে , আমাদের পা ঘেষে পানি প্রবল বেগে নিচের পাথরে আছড়্ব পড়ছে । রূপসী ঝর্না আগের ৪ টা ঝর্ণা থেকে সবচেয়ে উঁচু আর সবচেয়ে বড় । ঝর্নার উপর বসেই আমরা বিভিন্ন ভঙ্গিতে ছবি উঠিয়ে ফেললাম বেশ কিছু , রূপসীর ঘের অনেক বড়, একপাশে রূপসী, আর দুইপাশে অনেক উঁচু পাহাড় দিয়ে বেষ্টিত । রূপসী থেকে নেমে আমরা তার আসল রূও বুঝতে পারলাম ।

    রূপসীর রূপে পাগল মন নিয়ে কমলদহ থেকে বেরিয়ে আসতে আসতেই প্ল্যান হলো আজকে আর ঝর্না না , এবার সমুদ্র দেখবো৷ কমলদহ থেকে লেগুনায় করে আবার সীতাকুণ্ড বাজার চলে আসলাম, আসতেই প্ল্যান হলো আজকে দুপুরে আর খাওয়ার দরকার নেই, রাতে একেবারে চট্টগ্রামের বিখ্যাত হান্ডি বিরিয়ানি দিয়ে ট্যুরের সমাপ্তি ঘোষণা হবে৷ তাই সীতাকুণ্ড থেকে হালকা নাস্তা খেয়ে আবার দুটো সিএনজি ভাড়া করে চললাম বাঁশবাড়িয়া সমুদ্র সৈকতের উদ্দেশ্যে । সমুদ্রে তখন ভাটা শেষে জোয়ার শুরু হচ্ছে সবে , আর প্রায় দুপুরের কারণে সৈকতে আমরা ছাড়া আর কোন পর্যটক ছিলোনা । সূর্য মাথায় নিয়েই হেটে হেটে আমরা স্টিলের তৈরি পথ ধরে পানির কাছাকাছি গিয়ে পৌছুলাম । এই পথ সম্ভবত ভাটার সময়ে নৌকাগুলো যেন পানিতে রেখেই জেলেরা ফিরে আসতে পারে এজন্য বানানো৷ আমরা ওখানে থাকতে থাকতেই জোয়ার শুরো হলো , বিশাল ঢেউ আমাদের পায়ের নিচ দিয়ে চলে যাচ্ছে, এই অনুভূতি টা অন্যরকম ।

    বাঁশবাড়িয়া সৈকত থেকে এরপর চলে গেলাম গুলিয়াখালী সৈকতে । যারা এতদিন সৈকত মানেই বালি আর পাথর ভাবতো গুলিয়াখালি গিয়ে তাদের চুয়াল ঝুলে যাবে , কারণ এখানকার বীচ টা পুরোটাই সবুজে ঢাকা । ছোটছোট দ্বীপের মতো ঢিবি তার খাঁজে খাঁজে অল্প পানি জমে আছে , আমরা অনেকেই সবুজ ঘাসে শুয়ে পড়লাম৷ সমুদ্রের গর্জন, ঠাণ্ডা বাতাস সব মিলিয়ে ট্যুরের সমাপ্তিটা এত শান্তির হবে আমরা আগে ভাবিনি । গুলিয়াখালীতে সূর্যকে ডুবিয়ে আমরা শেষবার রওয়ানা হলাম হান্ডি বিরিয়ানির জন্য । দীর্ঘ বাস জার্নি শেষে হান্ডি বিরিয়ানি খেয়ে আমাদের ভ্রমণ শেষ হলো । রাতটা আবার বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কাটিয়ে পরদিন বাড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা । আমরা সবাই একটা বিষয়ে একমত হলাম যে জীবনে হয়তো অনেক ট্যুর দেওয়া যাবে কিন্তু কাছের এই বন্ধুবান্ধব মিলে ট্যুর দেওয়ার সুযোগ হয়তো আর হবেনা । প্রকৃতির রাজ্যে কাটানো দুইটা দিনের স্মৃতি বুকে নিয়ে আমরা আবার ইট পাথরের পৃথিবীতে প্রবেশ করলাম ।

    সাফায়েত জামিল নওশান

    আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ

    চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫
    ১৬১৭১৮১৯২০২১২২
    ২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
    ৩০৩১