• শিরোনাম

    হিস্টেরিয়াঃ অতীত থেকে বর্তমান, এখনো যে রোগ বুঝতে ও চিকিৎসা দিতে ভুল হয়।

    ডা. মেজবাউল খাঁন ফরহাদ | ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২০


    হিস্টেরিয়াঃ অতীত থেকে বর্তমান, এখনো যে রোগ বুঝতে ও চিকিৎসা দিতে ভুল হয়।

    এক, সোহানা, ১৬ বছরের কিশোরী, মারাত্বক শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। মাঝে মাঝে মনে হয় তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, আবার মাঝে মাঝে বুক চাপড়িয়ে, হাত-পা এলোপাথাড়ি ছোড়াছুড়ি করতে থাকে। আবার অজ্ঞান হয়ে অনেকক্ষন পরে থাকেন। ডাক্তারসহ মেডিকেল স্টাফরা দেখেই যেন বুঝে যায়, এটা কিসের রোগী। তারপরও তারা হিস্ট্রি নিয়ে এবং স্ট্রেথো দিয়ে বুক পরীক্ষা করে কনফার্ম হয়ে যায়।

    দুই, রাজিব নামে ২৫ বছরের যুবক। গত ৭ দিন ধরে হঠাৎ হঠাৎ এলোমেলো ব্যবহার করছে। হাতমুখ বাঁকিয়ে, এদিক সেদিক তাকিয়ে, চোখ বড় করে অসংলগ্ন কথাবার্তা বলতে থাকে। কয়েক মিনিট থেকেই আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়। যেন, অন্য মানুষ, কিছুক্ষণ আগে কিছুই হয়নি, কিছুই তার মনে নেই। কয়েকজন ফকির কবিরাজ, এবং নিউরোলজির ডাক্তার দেখানোর পর, এখন সে একজন সাইকিয়াট্রিস্টের চেম্বারে। সাইকিয়াট্রিস্ট সব হিস্ট্রি নিয়ে এবং তার মানসিক অবস্থা পরীক্ষা করে সহজেই ডায়াগনোসিসে পৌছে যায়।


    উপরের দুটো কেসের ক্ষেত্রেই ডায়াগনোসিস হচ্ছে “কনভার্সন ডিসঅর্ডার” বা “ফাংশনাল নিউরোলজিক্যাল সিম্পটম ডিসঅর্ডার”। সাধারন মানুষ যাকে “হিস্টেরিয়া” রোগ নামে চিনে থাকে।

    অজ্ঞতার কারনে এধরনের অনেক রোগিকেই আমরা জ্বিনে ধরা, ভূতে ধরা মনে করে ফকিরি, কবিরাজি চিকিৎসা করে থাকি। আবার, ডাক্তারদের জন্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রোগটা ডায়াগনোসিস করা সহজ হলেও, সাইকিয়াট্রিস্ট ছাড়া অন্যরা রোগী ম্যানেজমেন্ট করতে কিছু ভুল করে থাকেন। যাতে রোগীর সাময়িক উপকার হলেও দীর্ঘমেয়াদে খুব বেশি উপকার হয় না।


    “হিস্টেরিয়া” আমাদের অনেকের কাছে পরিচিত শব্দ, কিন্তু কেন এই রোগ নিয়ে আমরা এরকম ভুল করে থাকি। এর প্রধান কারন, রোগটা সম্পর্কে আমরা খুবই সামান্য জানি, তাছাড়া এর সাইকোপ্যাথোলজিও কিছুটা রহস্যময়।

    হিস্টেরিয়া বা কনভার্সন ডিসঅর্ডার হচ্ছে এমন কিছু শারীরিক বা মানসিক বা স্নায়ুবিক অথবা মিক্সড কিছু উপসর্গ, যার সাথে নির্দিষ্ট রোগের উপসর্গের কোন মিল থাকেনা এবং যেখানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মারাত্বক একটি মানসিক চাপ বা দ্বন্দ্ব উপস্থিত থাকে।


    আমাদের মনের অবচেতন অংশে বাস করে মানব আদিসত্তা বা সহজাত প্রবৃত্তি, যার সঙ্গে বাহ্যিক পরিবেশের সংঘাত হলেই সৃষ্টি হয় মানসিক দ্বন্দ্বের, যা অনেকক্ষেত্রেই সহ্য করা মানুষের পক্ষে অসম্ভব। ফলে মনের অগোচরেই কিছু মানসিক ক্রিয়া এই প্রবৃত্তিগুলোকে অবদমন করে। কিন্তু এই অবদমনকারী শক্তিগুলো যখনই কোনো কারণে দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন সেই অবদমিত কামনাগুলো সচেতন মনে উঠে আসতে চায়, যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে নানা শারীরিক লক্ষণে। একেই বলে হিস্টিরিয়া। রোগীর মানসিক দ্বন্দ্ব শারীরিক উপসর্গ হিসেবে প্রকাশ পাওয়ায় মেডিকেলের ভাষায় বলা হয় “কনভার্সন ডিসঅর্ডার” বা “ফাংশনাল নিউরোলজিক্যাল সিম্পটম ডিসঅর্ডার”।

    আরেকটু সহজ করে যদি বলি, যখন কোন মানসিক চাপ বা দ্বন্দ্ব অতিরিক্ত হয় বা দীর্ঘমেয়াদী হয়, যা সহ্য করা কষ্টকর, কিন্তু কারো কাছে ঠিকভাবে প্রকাশও করা যাচ্ছেনা, তখন সেই মানসিক চাপ বা দ্বন্দ্ব আমাদের শরীর দিয়ে অথবা অন্য কোন ভাবে প্রকাশ পায়। কেউ অজ্ঞান হয়ে যায়, কারো খিঁচুনি হয়, কারো দম আটকিয়ে যায়, কারো হাত-পা অবশ হয়ে যায়, কেউ কথা বলতে পারেনা, চোখে দেখেনা, কেউ অস্বাভাবিক/পাগলের মত আচরন করে, ইত্যাদি নানারকম লক্ষণ প্রকাশ পায়।

    ইতিহাসঃ

    “কনভার্সন ডিসঅর্ডার” এর ইতিহাস খুব মজাদার এবং ব্যাপক। রোগের কারন হিসেবে উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়ানো জরায়ু (Wandering Uterus) থেকে দৈত্য/পিশাচ (Demon), সেখান থেকে অবদমিত মানসিক চাপ বা দ্বন্দ্ব। অনেকবার এর নামও পরিবর্তন করা হয়েছে। ১৯৫২ সালে DSM-I এ একে conversion Reaction বলা হয়, পরবর্তিতে কখনো ডিসোসিয়েটিভ বা সোমাটাইজেশন ডিসঅর্ডার হয়ে বর্তমানে DSM-5 এ “কনভার্সন ডিসঅর্ডার” বা “ফাংশনাল নিউরোলজিক্যাল সিম্পটম ডিসঅর্ডার”।

    কনভার্সন ডিসঅর্ডার প্রথম নথিভূক্ত হয় প্রাচীন মিশরে এবং তা আনুমানিক ১৯০০ খ্রীস্ট পূর্বে Eber Papyrus – এ যা এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে পুরাতন মেডিকেল ডকুমেন্ট। Eber Papyrus – এ লক্ষন হিসেবে খিঁচুনি এবং দম বন্ধ হয়ে যাওয়া ব্যখ্যা করা হয়েছে। মিশরীয়রা বিশ্বাস করতো, এধরনের লক্ষন মহিলাদের প্রকাশ পায়, যাদের জরায়ু উদ্দেশ্যহীনভাবে স্থান পরিবর্তন করে, যার নাম দেয়া হয় “Wandering Uterus”।

    হিস্টিরিয়া শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন গ্রিক চিকিৎসাবিদ হিপোক্রেটাস। এর উৎপত্তি গ্রিক শব্দ ‘হিস্টেরা’ থেকে, যার অর্থ জরায়ু। তার মতে জরায়ু উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরতো স্বাভাবিক যৌন জীবনের অভাবে। তিনি ব্যখ্যা করেন, যে জরায়ুর এই অস্বাভাবিক চলাচলে বেশ কিছু লক্ষন বা উপসর্গ প্রকাশ পায়, যার মধ্যে উদ্বিগ্নতা, দম বন্ধ হয়ে যাওয়া, হাত-পা কাঁপা, প্যারালাইসিস, এবং খিঁচুনি অন্যতম।

    Trota of Salerno একজন গাইনোকলজিস্ট, Trotula নামক বইয়ের লেখক (Trotula হচ্ছে ১২ শতকের মহিলা মেডিসিনের তিন খন্ডের সংকলন) হিস্টেরিয়া রোগের উল্লেখ করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যৌনতা এবং যৌনকার্য থেকে নিবৃত থাকার কারনেই হিস্টেরিয়া হয়। তিনি তার রোগীদেরকে কিভাবে যৌন চাহিদা প্রশমিত করতে হয় তার পরামর্শ দিতেন।

    ১৩ শতকের শেষের দিকে এবং ১৪ শতকের গোরার দিকে হিস্টেরিয়াকে জাদুবিদ্যার সাথে গুলিয়ে ফেলা হত। এর অন্যতম কারন ছিলো, চিকিৎসকরা এই রোগের নির্দিষ্ট কোন কারন বলতে ব্যার্থ হয়েছিলেন এবং এটাকে পাপ ও আশুভ কিছু মনে করা হত। জাদুকররা মনে করতেন, এটা হচ্ছে মহিলাদের সাথে শয়তানের যোগাযোগ এবং চিকিৎসা হিসেবে মন্ত্র পড়ে ভুত বা খারাপ আত্না তাড়াতেন।

    ১৬শ খ্রীস্টাব্দের শেষের দিকে হিস্টেরিয়া নিয়ে এক ইতিবাচক বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে। এসময় বৃটিশ চিকিৎসক থমাস উইলিস প্রথম নজরে আনেন যে, উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়ানো জরায়ুর কারনে হিস্টেরিয়া হয়না, কারন, জরায়ু মহিলাদের পেলভিসে দৃঢ়ভাবে সুরক্ষিত থাকে। এর পরিবর্তে হিস্টেরিয়ার সাথে আমাদের স্নায়ুতন্ত্র এবং ব্রেইনের সম্পর্কের কথা বলেন তিনি।

    ঠিক কাছকাছি সময়ে ইংরেজ হিপোক্রেটস খ্যাত থমাস সিডেনহাম একইরকম মতামত দেন। তিনি বলেন, জরায়ু হিস্টেরিয়া রোগের কারন নয়, বরং এর সাথে Hypochondriasis এর সম্পর্ক রয়েছে। কারন এই রোগ তিনি পুরুষের মাঝেও লক্ষ করেছেন।

    ১৮শ শতকে “মানসিক রোগ” বিজ্ঞানের আলোয় আলকিত হতে থাকে এবং হিস্টেরিয়ার সাথে যে জরায়ুর না, ব্রেইনের সম্পর্ক তা দ্রুত জোড়ালো হতে থাকে। ১৯শ শতকে ফ্রেন্স নিউরোলজিস্ট জিন-মার্টিন চার্কট ব্রেইনের ফাংশনাল ডিসঅর্ডারের উপর বেশি গুরুত্ব দেন। তিনিই প্রথম হিস্টেরিয়ার ক্ষেত্রে Suggestibility (অন্যের মতামত দ্বারা প্রভাবিত হওয়া এবং সে অনুযায়ী আচরন করা)-র কথা উল্লেখ করেন। একই সময়ে ফ্রেন্স সাইকোলজিস্ট পিয়েরে জেনেট হিস্টেরিয়া রোগীদের নিয়ে অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা করেন এবং Dissociation (সংযোগহীনতা)র কথা উল্লেখ করেন। তার মতে হিস্টেরিয়া রোগীরা ব্রেইনের স্বাভাবিক মেন্টাল ফাংশনের যে সমন্বয় তা হারিয়ে ফেলে।

    Anna O নামের এক নারীর মাঝে মাঝে তার হাত-পা অবশ হয়ে যেত, বমিবমি ভাব হতো, এবং কথা বলতে সমস্যা হতো। জার্মান চিকিৎসক জোসেফ ব্রিউয়ার লক্ষ্য করলেন, যে Anna কে যখন হিপনোসিস করা হয়, তখন সে তার অবদমিত মনের গভীর কষ্টের কথা খুব স্বচ্ছন্দে বলতে থাকে।

    পরবর্তিতে সিগমুন্ড ফ্রয়েড এবিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং ব্রিউয়ারের সাথে মিলে অনেক হিস্টেরিয়া রোগীর একই ধরনের পরীক্ষা করেন। ফ্রয়েড বিশ্বাস করতেন, হিস্টেরিয়া রোগীদের এসব লক্ষণ অবদমিত মনের মানসিক চাপের ফলে তৈরি হয়, এবং সেই চাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সাবকনসাসলি তা শারীরিকভাবে প্রকাশ করেন। ফ্রয়েড প্রথম “কনভার্সন ডিসঅর্ডার” টার্মটি ব্যবহার করেন, কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে তা ব্যবহার করা হয় ১৯৮০ সালে DSM-III তে।

    রোগ-বিস্তারঃ

    আমাদের সকল মানুষের মধ্যে এক তৃতীয়াংশ তাদের জীবনের কোন না কোন্ সময়ে অল্প পরিমানে হলেও হিস্টেরিয়া সমস্যায় ভুগে থাকি। এদের মধ্যে ২০-২৫ ভাগের হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। সাধারনত বয়ঃসন্ধি থেকে প্রাপ্ত বয়স্কের প্রথম দিকে হিস্টেরিয়ায় বেশি আক্রান্ত হয়। যদিও যেকোন বয়সেই হতে পারে, কিন্তু ১০ বছরের আগে, এবং ৩৫ বছরের পরে খুব একটা দেখা যায় না। পুরুষের থেকে নারীদের আক্রান্ত হওয়ার হার প্রায় দ্বিগুণ। গ্রামের মানুষের মধ্যে, অল্প শিক্ষিত, অল্প বুদ্ধি সম্পন্ন এবং নিন্ম আয়ের মানুষের মধ্যে এই রোগ বেশি হয়।

    সাধারনত রোগটা হঠাৎ শুরু হয় এবং প্রায় ৯৫% এর ক্ষেত্রে নিজে নিজেই কমে যায়। হাসপাতালে ভর্তি রোগীর ক্ষেত্রে ভালো হতে ২ সপ্তাহ পর্যন্ত লাগতে পারে। যদি রোগের লক্ষণ ৬ মাস বা তার বেশি সময় থাকে, তাহলে রোগ ভালো হওয়ার সম্ভাবনা ৫০% এর নিচে নেমে যায়। একবার এই রোগ হলে এক বছরের মধ্যে পুনরায় হওয়ার সম্ভাবনা শতকরা ২০-২৫ ভাগের।

    যাদের রোগটা হঠাৎ শুরু হয়, অল্প সময় থাকে, সহজেই মানসিক চাপ খুঁজে পাওয়া যায়, পূর্বে খাপ খাইয়ে চলার ইতিহাস থাকে, গড় বুদ্ধির থেকে একটু বেশি বুদ্ধি থাকে, দ্রুত চিকিৎসা পায়, অন্যকোন শারীরিক বা মানসিক রোগ না থাকে, এবং যাদের হাত-অবশ, দেখতে ও শুনতে সমস্যা হওয়ার উপসর্গ থাকে তারা দ্রুত ভালো হয়ে যায়।

    আর যাদের রোগের দীর্ঘ ইতিহাস থাকে, ব্যক্তিত্ত্বের সমস্যা থাকে, এবং হাত-পা কাঁপা বা খিঁচুনির উপসর্গ থাকে তাদের ভালো হতে সময় লাগে।

    চিকিৎসা কী?

    সোহানা নামের ১৬ বছরের কিশোরী যখন অজ্ঞান, তখন হাসপাতালের ইন্টার্ন ডাক্তাররা তাকে পেইন বা কষ্ট দিয়ে জাগানোর চেষ্টা করে, হয়তো সে জেগেও যায়। ডাক্তাররা মনে মনে তাকে আরো মারাত্বক কষ্ট দেয়ার জন্য বড় ইনজেকশন দেয়া, কখনো কখনো চড়-থাপ্পর দেয়ারও ইচ্ছা পোষণ করে। রোগীর স্বজনদের বলে, কিচ্ছু হয়নাই, ভং ধরছে। বেশিরভাগ রোগীই হয়তো এক দুই দিনের মধ্যে ভালো হয়ে বাড়ি ফিরে। কিন্তু এটা চিকিৎসা পদ্ধতি নয়। কারন তার এই রোগটা হয়েছে কোন মানসিক চাপ বা দ্বন্দ্ব থেকে। সেই মানসিক চাপ বা দ্বন্দ্ব যতক্ষন বেড় করে তা কীভাবে মোকাবেলা করবে, তা না শিখিয়ে দেয়া না হয়, তাহলে এই ঘটনার পুনঃরাবৃত্তি ঘটার সম্ভাবনা প্রবল। ডাক্তারদের দ্বারা কষ্ট পাওয়ার ফলে, ভবিষ্যতে হাসপাতালে আসার ভয়ে অন্যকোন মারাত্ত্বক উপসর্গ নিয়ে আসতে পারে, অথবা আত্নহত্যাও করতে পারে।

    তাহলে চিকিৎসা কী? চিকিৎসা হচ্ছে; হঠাৎ যখন রোগী আসবে-

    – রোগীর এবং রোগীর স্বজনদের থেকে শারীরিক ও মানসিক অবস্থার ইতিহাস নেয়া।
    – পরিপূর্ন শারীরিক ও মানসিক অবস্থার পরীক্ষা করা এবং প্রয়জনীয় ইনভেস্টিগেশন করে রোগটা নিশ্চিত হওয়া।
    – রোগীর স্বজনদের আশ্বস্থ করা, যে অবস্থাটা সাময়িক, যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহন করলে রোগী সম্পূর্ন সুস্থ্য হয়ে উঠবে। সাথে সাথে রোগীর
    স্বজনদের ভীড় কমানোর অনুরোধ করা।
    – Reinforcement পরিহার করা, যেমন; রোগীর হাটতে কষ্ট হলে হুইল চেয়ার এগিয়ে দেয়া, বা শ্বাসকষ্ট হলে বারবার অক্সিজেন      দেয়া ইত্যাদি পরিহার করা। এতে উৎসাহ পেয়ে রোগীর উপসর্গ আরো বেড়ে যেতে পারে।
    – রোগীর চলমান কোন সামাজিক বা মানসিক সমস্যা থাকলে সে ব্যাপারে সাহায্য করা।
    – প্রয়োজনে স্বল্প মাত্রার উপসর্গভিত্তিক কিছু ওষুধ, ক্ষেত্র বিশেষ কিছু অ্যাংজিওলাইটিক দিয়ে রোগীকে শান্ত করা।

    এভাবে, প্রথমে প্রাথমিক অবস্থার একটা ব্যবস্থা করে, দ্বিতীয় বা প্রধান চিকিৎসা করা।

    প্রধান চিকিৎসাঃ Exploratory psychotherapy-র মাধ্যমে রোগীর মানসিক চাপ বা দ্বন্দ্ব বেড় করে তা কিভাবে মোকাবেলা করা যায় তা বুঝিয়ে দেয়া। এটা যেকোন পর্যায়ের ডাক্তারই (ইন্টার্নসহ) করতে পারেন। যদি রোগী কোনভাবেই কথা বলতে না চায়, বা রোগীর স্বজনদের থেকে ইতিহাস নিয়েও কোন কারন খুঁজে না পাওয়া যায়, এবং রোগীর অবস্থা অপরিবর্তিত থাকে, তাহলে মানসিক রোগ বিভাগে রেফারড করতে হবে।

    আর যেসকল রোগীর উপসর্গ কমে গিয়ে বাড়ি চলে যেতে চায়, তাদেরকে পরবর্তী চিকিৎসার জন্য মানসিক রোগ বিভাগে যোগাযোগ করার জন্য উপদেশ দিতে হবে।

    উপরের রাজিব নামের ২৫ বছরের রোগীর ক্ষেত্রে, সাইকিয়াট্রিস্ট Exploratory psychotherapy-র মাধ্যমে তার মানসিক দ্বন্দ্ব বেড় করে তা কীভাবে মোকাবেলা করবে তা কাউন্সেলিং করে দেন। রাজিবের বিয়ে হয়েছিলো মাত্র মাস খানেক আগে, বিয়ের পর তার স্ত্রীসহবাসে সমস্যা হয় এবং তার স্ত্রী তাকে ছেড়ে বাপের বারি গিয়ে আর আসতে অস্বীকৃতি জানায়। নিজের এই সমস্যার কথা কাউকে সে বলতেও পারেনি, নিজে কোন সমাধানও পায়নি, অতঃপর তার এই মানসিক চাপ “কনভার্সন ডিসঅর্ডার”-এ পরিনত হয়। সাইকিয়াট্রিস্ট তার সেক্সুয়াল সমস্যার চিকিৎসার ব্যাপারে আশ্বস্থ করেন, এবং পরবর্তীতে তার স্ত্রীসহ আসতে বলেন।

    সোহানা নামের ১৬ বছরের কিশোরীর ক্ষেত্রেও এরকম কোন চাপ বা দ্বন্দ্ব থাকার সম্ভাবনা প্রবল। হতে পারে, পরীক্ষায় খারাপ করা বা সম্পর্কজনিত কোন সমস্যা বা বাবা-মার মধ্যকার কোন জটিলতা বা অন্যকিছু। যেটাই হোক সেটা বেড় করে কাউন্সেলিং না করা পর্যন্ত “কনভার্সন ডিসঅর্ডার”-এর চিকিৎসা সম্পন্ন হবেনা।

    পরিশেষে, কনভার্সন ডিসঅর্ডার বা হিস্টেরিয়া কোন অভিনয় নয়, কোন ভং ধরা নয়। এটা একটা মানসিক চাপজনিত সমস্যা। সরকারি-বেসরকারী হাসপাতালে প্রতিদিন অসংখ্য রোগী এই সমস্যা নিয়ে ভর্তি হয়। আমরা তাদের প্রতি আন্তরিক হবো, সংবেদনশীল হবো এবং যথাযথ চিকিৎসা প্রাপ্তিতে সহায়তা করবো এই প্রত্যাশা রাখি।

     

     

     

     

    ডা. মেজবাউল খাঁন ফরহাদ
    মনোরোগ বিশেষজ্ঞ
    ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

    Facebook Comments

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    আর্কাইভ

    শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
     
    ১০১১১২১৩১৪১৫
    ১৬১৭১৮১৯২০২১২২
    ২৩২৪২৫২৬২৭২৮২৯
    ৩০৩১